ইমা কেইথেল: নগ্ন প্রতিবাদ থেকে শর্মিলা চানুর অনশন আন্দোলন, বিপ্লবের ভাষা শিখিয়েছিলেন মায়েরাই

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    চৈতালী চক্রবর্তী

    ২০১৬ সালের ৪ জানুয়ারি। বিরাট একটা ঝাঁকুনি। কেঁপে উঠল ইম্ফল। ৬.৮ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পে ইম্ফলের রাস্তায় ফাটল। ভেঙেচুরে তছনছ হল শহরের কেন্দ্রে ইতিহাসপ্রসিদ্ধ সেই বাজার। মুখ থুবড়ে পড়ল ছোট ছোট দোকান। বুক কেঁপে উঠল মণিপুরের। প্রমাদ গুনল দেশ। এই বাজার মণিপুরের আত্মা। দেশের ঐতিহ্য। মাথায় পসরা নিয়ে মায়েদের কান্নায় নড়েচড়ে বসল প্রশাসন। বাজার সেজে উঠল কিছুদিনেই। গোধূলির মিইয়ে যাওয়া আলোয় হাসি ফুটল বলিরেখা মাখা মুখগুলোতে। ইমা কেইথেল। মেয়েদের বাজার। মায়েদের বাজার। মণিপুরের রক্তক্ষয়ী প্রতিটা সংগ্রামের ইতিহাস লিখেছে এই বাজার। অসম রাইফেলসের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা মায়েদের নগ্ন প্রতিবাদই হোক বা ইরম শর্মিলা চানুর ১৬ বছরের অনশন আন্দোলন— ইমা কেইথেল জন্ম দিয়েছে শত শত বিপ্লবের। এই বাজারের বুকেই নগ্ন, ছিন্নভিন্ন দেহে ধর্ষণের প্রমাণ লিখে গেছে কত শত নারী, আবার এই বাজারই নারী মুক্তির কথা বলেছে নিঃশব্দে।

    ইমা বাজারের বয়স ৫০০ বছর পেরিয়েছে। একটা গোটা বাজার শুধুই মহিলাদের। মণিপুরি ভাষায় ইমা-র অর্থ মা। স্থানীয়দের কাছে তাই মেয়েদের বাজার নয়, বরং মায়েদের বাজার। এশিয়ার বৃহত্তম মহিলা পরিচালিত এই বাজারের খ্যাতি রয়েছে বিশ্বের নানা দেশে। শুধু বিকিকিনি নয়, মণিপুর পর্যটনের সেরা আকর্ষণও ইমা কেইথেল। ইমা বাজার নিয়ে গবেষণা বিস্তর। মণিপুরকে সঠিক ভাবে চিনতে গেলে, তার আত্মা অর্থাৎ ইমা কেইথেলের সঙ্গে আগে পরিচিত হতে হবে। এটাই সেই শিকড়, যা একসূত্রে গেঁথে রেখেছে একটা গোটা রাজ্য ও রাজ্যের বাসিন্দাদের।

    খোয়ারিমবান্ধ বাজারে পসরা সাজিয়ে মায়েরা


    দিনের আলোয় শুঁটকি বেচেন যে ইমা
    , সন্ধে গড়ালে তিনিই বিপ্লবী

    খোয়ারিমবান্ধ, মইনুর, ইম্ফলের সবচেয়ে বড় বাজার। এদের সমষ্টিই ইমা কেইথেল। ভোর হতেই হাজার পাঁচেক মহিলা পসরা সাজিয়ে বসে পড়েন। বাসিখউ, জিরিবাম, আন্দ্রোর মতো গ্রাম থেকে কাঁচা আনাজ, মাছ-মাংস, শুঁটকি, মাটির হাঁড়ি-কলসি, জামাকাপড় বড় বড় জিপে বা অটো রিকশায় চাপিয়ে বাজারে এনে পসরা সাজান ইমারা। গরুর গাড়ি বোঝাই করেও পণ্যসামগ্রী আসে বাজারে। নিত্যদিনের দরকার ছাড়াও ঘর সাজানোর জিনিস, হালে বেতের আসবাব সবই পাওয়া যায় মায়েদের কাছে। ইমাদের অধিকাংশই প্রৌঢ়া বা বৃদ্ধা। কপালে বড় করে চন্দনের টিপ, পরনে ফানেক (সারং) আর ইনাফি (শাল)

    এশিয়ার সবচেয়ে বড় মহিলা পরিচালিত বাজার— ইমা কেইথেল

    এই বাজারে কান পাতলে ইমারা বলেন, মণিপুরে আলাদা করে মাতৃতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দরকার পড়েনি। অধিকারের বীজ নিজেরাই বুনে নিয়েছিলেন ইমারা। এই বাজারই ছিল সেই স্বতন্ত্র চিন্তার আশ্রয়। সমাজ, অর্থনীতির বুনিয়াদ তো বটেই, রাজনীতির শিকড়ও গ্রথিত এই বাজারেই। সমাজ ব্যবস্থার সামান্যতম অবক্ষয়ের মুখে মাতৃ-শৃঙ্খল তৈরি করে দাঁড়ান এই ইমারাই।

     ইমা বাজারের দায়িত্ব সামলান ৫০০০ পসারিনি

    মণিপুর তখন প্রায় পুরুষশূন্য, নতুন সমাজ গড়ে তুললেন নারীরাই, জন্ম হল ইমা কেইথেলের

    ১৫৫৩ খ্রিষ্টাব্দ। মণিপুরে তখন রাজার শাসন। গায়েগতরে খাটা শ্রমিকদের জন্য ভিন্ন নীতি চালু করলেন স্বৈরতন্ত্রী রাজা। তাদের অর্ধেককে পাঠানো হল যুদ্ধক্ষেত্রে। বাকিদের ভিন্ রাজ্যে কায়িক পরিশ্রমের জন্য। মণিপুর হল পুরুষশূন্য। খাবারের বিনিময়ে রাজার সৈন্যরা ইচ্ছামতো দাসী করে নিতে শুরু করল মহিলাদের। নির্বিচারে চলল ধর্ষণ, যৌনদাসী তৈরির প্রক্রিয়া। একদিন গর্জে উঠলেন মহিলারা। বিক্রি হয়ে যাওয়ার থেকে মুক্তির উপায় নিজেদের স্বাবলম্বী করে তোলা।

    জমি চাষ থেকে বাজারে বিকিকিনি, সমাজের হাল ধরেছিলেন নারীরাই

    সন্তান কোলে মাঠে নেমে হাল ধরলেন মায়েরা। মোটা কাপড় তৈরি হতে লাগল ঘরেই। সেগুলো বেচাকেনা হত বিনিময় প্রথায়। তৈরি হল মহিলাদের গোষ্ঠী। বিকিকিনি চলত খোলা বাজারেই, ক্রেতা-বিক্রেতা দুইই মহিলা। জিনিস কেনাবেচার আড়ালে খবর আদানপ্রদানও চলতে লাগল সমান তালে। একের বিপদে অন্যজন ঝাঁপিয়ে পড়েন। একজনের রক্ত ঝরলে, অস্ত্র তুলে প্রতিবাদ করেন আর একজন। জন্ম হল ইমা কেইথেলের।

    নারীদের শক্তি দেখে ভয় পেলেন রাজাও। শাসন ব্যবস্থায় বদল এল। রাজার আদেশে বিচারসভা বসতে লাগত বাজারের ভিতরেই। রাজার কোনও নির্দেশ পছন্দ না হলে জোট বেঁধে বিরোধিতা করতেন ইমারা। রাজতন্ত্রের আড়ালে নিঃশব্দে তৈরি হল গণতন্ত্র। জন্ম দিলেন মায়েরাই। ইমাদের এই প্রতিবাদকে তখন বলা হত ‘কেইথেল কেইবা’।

    সন্তান কোলে পসরা সাজিয়ে বসতেন মায়েরা। বেচাকেনার পাশাপাশি চলত খবর আদানপ্রদান


    ব্রিটিশ সেনার কামানের সামনে নির্ভয়ে দাঁড়ালেন মায়েরা
    , ‘প্রথম নুপিলান অপশাসনের বিরুদ্ধে মেয়েদের যুদ্ধ

    ইংরেজদের বিরুদ্ধে ইমাদের সংগ্রাম— নুপিলান

    ১৮৯১ সালে ইংরেজরা মণিপুর দখল করে নেয়। ব্রিটিশ সেনার কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য হন মণিপুরের মহারাজ কুলরাজ সিংহ। যুদ্ধবন্দি করে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ব্রিটিশ রাজত্বে শাসন আর শোষণ চরমে ওঠে। ১৯০৪ সালে ব্রিটিশ পলিটিক্যাল এজেন্ট মেজর ম্যাক্রয়ালের সরকারি বাসভবনটি পুড়িয়ে দেন সরকার বিরোধী কয়েকজন বিপ্লবী। এই বাসভবনটি নতুন করে তৈরির কাজে মণিপুরিদের বিনা পারিশ্রমিকে বাধ্যতামূলক শ্রমদানের নির্দেশ দেন ম্যাক্রয়াল। হাজার-হাজার মহিলা সমবেত হয়ে ওই নির্দেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জানান। ব্রিটিশ ফৌজ দিয়ে মহিলাদের দমন করার চেষ্টা হয়। কামানের মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় মণিপুরি মায়েদের। ছিন্নভিন্ন হয়েও সরকারের আদেশ মানতে অমান্য করেন মহিলারা। শেষ পর্যন্ত ম্যাক্রয়ালকে ওই নির্দেশ প্রত্যাহার করতে হয়। মণিপুরি মহিলাদের সে দিনের সংগ্রাম ছিল ‘প্রথম নুপিলান’ (First Nupi Lan)। মেয়েদের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ইমা কেইথেলে।

    ইমা কেইথেলে ইংরেজদের রুখতে সমাবেশ। ইমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন মণিপুরি পুরুষরাও।

    দুর্ভিক্ষের মণিপুরে ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে ফের গর্জে উঠলেন মহিলারাদ্বিতীয় নুপিলান রক্ত ঝরিয়েছিল অনেক মায়ের

    ১৯৩৯ সালে মণিপুরে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সেই সময় ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি ছিলেন জিম্পসন। তিনি নির্দেশ দেন ইমা বাজার থেকে চাল রফতানি করা হবে ভিন্ রাজ্যে। মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী মারফত সেই চাল পাচার করা শুরু হয় অন্যত্র। তীব্র হয়ে ওঠে খাদ্য সংকট। জিম্পসনের কাছে গিয়ে বিক্ষোভ দেখান ইমারা। চাল রফতানির নির্দেশ রদ না হওয়া পর্যন্ত মহিলারা চতুর্থ রাইফেলসের কমান্ডান্টকে আটকে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। সেনা নামায় সরকার। গুলিতে জখম হন ২১ জন ইমা। শোনা গিয়েছিল, চাল-বোঝাই লরির রাস্তা আটকাতে রাতের পর রাত মহিলারা রাস্তায় শুয়ে থাকতেন। কত শত ইমার শরীর ছিন্ন করে চলে গিয়েছিল লরির চাকা, সেটা লিখে রাখেনি ইতিহাস। তবে মণিপুরি মহিলাদের দেড় বছরের আন্দোলনের কাছে নতি শিকার করে নির্দেশ রদ করতে বাধ্য হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার।

    ভারতীয় সেনাএসোআমাদের ধর্ষণ করো, মায়েদের নগ্ন প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিল ইমা কেইথেল

    সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন (আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ারস অ্যাক্ট বা আফস্পা) এবং উপদ্রুত এলাকা আইন (ডিস্টার্বড এরিয়া অ্যাক্ট) রদের দাবিতে তখন উথালপাথাল মণিপুর। ১৯৫৮ সাল থেকেই মণিপুরে বলবৎ রয়েছে আফস্পা। সন্ত্রাসবাদীদের মোকাবিলায় যে আইন আনা হয়েছিল, সেই আইনের শিকার আমজনতা। ভুয়ো সংঘর্ষ, বলপূর্বক অপহরণ, ধর্ষণ–মণিপুরে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ভূরি ভূরি। আফস্পা-র মতো ভয়ঙ্কর আইন প্রত্যাহারের জন্য আবারও গর্জে উঠলেন ইমারা। তাঁদের সঙ্গে তাল মেলাল গোটা মণিপুর।

    শরীর উন্মুক্ত করে গর্জে উঠেছিলেন জননীরা। কেঁপে গিয়েছিল দেশ

    ২০০৪-এর ১১ জুলাই। বাড়ি থেকে এক প্রতিবাদী ইমাকে তুলে নিয়ে গেল অসম রাইফেলসের একদল জওয়ান। নাম থাংজাম মনোরমা। পরদিন বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে তাঁর বুলেটবিদ্ধ, ক্ষতবিক্ষত দেহ পড়ে থাকতে দেখা গেল। অভিযোগ উঠল, প্রবল অত্যাচার করে ধর্ষণের পর গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছে মনোরোমাকে। ঝড় উঠল মণিপুরে। ওই বছরেরই ১৫ জুলাই মণিপুরের কাংলা দুর্গে অসম রাইফেলসের সদর দফতরের সামনে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে প্রতিবাদ জানালেন সেখানকার মায়েরা। তাঁদের দু’হাতে তুলে ধরা ফেস্টুনে লেখা ছিল: ‘‘ভারতীয় সেনা, এসো, আমাদের ধর্ষণ করো (Indian army, rape us.)। আমরাও মনোরমার মা।’’ 

    মণিপুরের মায়েদের প্রতিবাদ বুক চিরে দিয়েছিল কোটি কোটি ভারতবাসীর। মণিপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সংশোধন করে আফস্পাকে আরও মানবিক রূপ দেওয়া হবে। শুধু তা-ই নয়, শান্তি ফিরলে এই আইন পাকাপাকি ভাবে তুলে দেওয়ার কথাও বলেছিলেন তিনি। তার পরে ১৫ বছর কেটে গিয়েছে। এক জন অভিযুক্তকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়নি।


    এই
     অগণতান্ত্রিক’ আইনের বিরুদ্ধেই ইরম শর্মিলা চানুর অনশন আন্দোলন, আড়ালে নেতৃত্ব দিয়েছিল ইমা কেইথেল

    অগণতান্ত্রিক আইনের বিরুদ্ধে চানু আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছিলেন অহিংস পদ্ধতিতে

    ২০০০ সালের ২ নভেম্বর। ভুয়ো সংঘর্ষে মৃত্যুর অভিযোগে উত্তাল হয় মণিপুর। ইম্ফলের মালোম শহরে অসম রাইফেল দশ জন সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। মৃতদের মধ্যে ৬২ বছরের বৃদ্ধা ও ১৮ বছরের তরুণীও ছিলেন। সেই খবর পেয়ে ইরম শর্মিলা চানু প্রায় ৩০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে নিজের গ্রাম লেইকেই কংখাম থেকে কেইথেলে পৌঁছে যান। ইমাদের সঙ্গে কথা বলেন। আমরণ অনশনের সেই বৃহত্তর সিদ্ধান্ত নিতে ইরমকে উৎসাহিত করেছিলেন ইমারাই। ১৬ বছর ধরে পৃথিবীর দীর্ঘতম অনশন আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ইরম শর্মিলার আগে মণিপুরে মায়েদের সংগ্রাম ছিল সহিংস পদ্ধতিতে। সেই পথে না হেঁটে, অহিংস এবং গণতান্ত্রিক পথে আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ইরম। আর এই পথ বেছে নিতে নীরবে, নিঃশব্দে তাঁকে পরিচালনা করে গিয়েছিলেন কেইথেলের শত শত ইমারা।

    পর্যবেক্ষকরা বলেন, ইমা বাজার নাকি এখন ভগ্নপ্রায়। পরিকাঠামোর অভাবে নয়, সেই যোদ্ধা ইমাদের অভাবেই। পরবর্তী প্রজন্ম পসারিনি হতে রাজি নয়। মায়েদের হাতের খাবার, পোশাকের জায়গা দখল করছে বিদেশি পণ্য। তা ছাড়া রাজনীতির রঙও লেগেছে কেইথেলের আনাচেকানাচে। শ্রেণিবৈষম্যের ছাপও স্পষ্ট। ঘন ঘন জঙ্গি হানা, কার্ফুর মুখে ইমারাও ছত্রভঙ্গ। তবুও কিছু ঘটনা নজরের অন্তরালেই থাকে। গনগনে লাভা স্রোতকে ঢেকে রাখে পৃথিবীর চাদর। বাইরে থেকে তার উত্তাপ আঁচ করা যায় না। আবার যে দিন অশনি সঙ্কেতের আভাস পাবে মণিপুর, সে দিন হয়তো আরও একবার মাতৃ-আন্দোলনের তেজ দেখবে গোটা দেশ।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More