তিমির গান! নেচে-গেয়ে বুদবুদের জাল ছড়িয়ে শিকার ধরে, হাম্পব্যাকদের সংসারে আড়ি পাতলেন বিজ্ঞানীরা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: শিকার ধরার আগে জলের নীচে এক পাক ঘুরে ফিরে নেচে নেয় এই তিমিরা। নাচতে নাচতেই ছোট ছোট বুদবুদ তৈরি করে জলে। এই বুদবুদের চক্র চারদিক দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে শিকারকে। ঠিক যেন জলে বিছানো মাছধরা জাল। পাখনা (Flipper) নাচিয়ে শিকারকে খেলিয়ে কব্জা করে নেয়। তারপর গিলে ফেলে খপাত করে। অভিনব কায়দায় শিকার ধরার পদ্ধতিতে অনেক প্রাণীই চমকে দিয়েছে।  তবে এই তিমিদের কায়দাই আলাদা। বছরের পর বছর উপকূলে ঘাপটি মেরে বসে, ড্রোন উড়িয়ে এই তিমিদের সংসারে চোখ রেখেছেন প্রাণীবিজ্ঞানীরা। হাতে এসেছে নিত্যনতুন তথ্য।

    হাম্পব্যাক তিমি (Megaptera novaeangliae), উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর, আটলান্টিক, ভারত মহাসাগরে দেখা মেলে এই তিমিদের। পূর্ণবয়স্ক পুরুষ হাম্পব্যাকরা দৈর্ঘ্যে ৪৩-৪৬ ফুট হয়। স্ত্রী হাম্পব্যাকদের দৈর্ঘ্য পুরুষদের থেকে কিছুটা বেশি। প্রায় ৫২ ফুট। এদের শিকার ধরার অভিনব কায়দা নিয়ে বিজ্ঞানীমহলে চর্চা বহুদিনের। আলাস্কার উপকূলে গত তিন বছর ধরে ড্রোন উড়িয়ে হাম্পব্যাকদের শিকার ধরার কায়দা দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। আজ, ১৬ অক্টোবর রয়্যাল সোসাইটি অব ওপেন সায়েন্সে হাম্পব্যাঙ্ক তিমিদের জীবনচক্রের নানা পর্যায় নিয়ে প্রতিবেদন লেখেন বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা। সেখানেই এই বুদবুদের জালের কথা লেখা হয়।


    স্যামন মাছদের পাখনার শব্দ শুনলেই বুদবুদের জাল বানায় হাম্পব্যাকরা

    ইউনিভার্সিটি অব আলাস্কা ফেয়ারব্যাঙ্কসের জীববিজ্ঞানী ম্যাডিসন কসমা বলেছেন, স্যামন খেতে খুবই পছন্দ করে হাম্পব্যাকরা। স্যামনের সাঁতারের শব্দও চেনে তারা। শিকারের খোঁজ পেলেই একটা নয় বরং একজোড়া হাম্পব্যাক ছুটে আসে তাকে গিলতে। এই জোড়া তিমিদের বেশিরভাগই দম্পতি। একে অপরের পাখনা জুড়ে এরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা চালায়। স্যামনের ঝাঁক দেখলেই পরস্পরের পাখনা ছড়িয়ে জলের মধ্যে নেচে নেচে, ঘুরে-ফিরে বুদবুদের জাল তৈরি করে। তার মধ্যে আটকে পড়ে শিকারের হাঁসফাঁস দশা হয়। কসমার কথায়, ‘‘২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত আলাস্কার উপকূলে এই তিমিদের ধরাই ছিল আমাদের কাজ। স্যামন ছড়িয়ে ডেকে আনা হত হাম্পব্যাকদের। তারপর তাদের শিকার ধরার কায়দা ভিডিওবন্দি করা হয়। বুদবুদের এই জাল অত্যন্ত পোক্ত। এটা ছাড়িয়ে পালিয়ে যাওয়ার কোনও রাস্তাই থাকে না শিকারের। কেউ বেশি চালাকি করতে গেলে তাকে পাখনার ভাঁজে আটকে ফেলে হাম্পব্যাকরা। তারপরেই খপাত।’’

    শিকার ধরছে হাম্পব্যাক তিমিরা

    পেনসিলভানিয়ার ওয়েস্ট চেসটার ইউনিভার্সিটির প্রাণীবিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্ক ফিশ জানিয়েছেন, এর থেকেই অনুমান করা যায়, এই পাখনা বা ফ্লিপার শুধু হাম্পব্যাকদের কথোপকথনের মাধ্যমই নয়। তাদের শিকার ধরার উপকরণও। তাঁর মতে, হাম্পব্যাকদের ফ্লিপার নিয়ে গবেষণা বহুদিনের। মনে করা হয় তিমিদের দুনিয়ায় হাম্পব্যাকদের ফ্লিপারই সবচেয়ে ক্রিয়াশীল। সঙ্গী বা সঙ্গিনীকে মনের ভাব জানানোর মাধ্যমও এই পাখনা। পাশাপাশি, জলের ভিতরে ও বাইরে তাপমাত্রার মধ্যে ভারসাম্যও বজায় রাখে এই ফ্লিপার। আবার শক্রুর উপস্থিতি টের পেলে এরাই হয়ে ওঠে হাম্পব্যাকদের মোক্ষম অস্ত্র।

    বুদবুদের জাল। এরই ফাঁদে আটকে পড়ে শিকার।

    একই পদ্ধতি কিন্তু বারবার ব্যবহার করে না হাম্পব্যাকরা, এমনটাই জানিয়েছেন ব্রিটিশ কলম্বিয়ার মেরিন এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ সোসাইটির তিমি-বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টি ম্যাকমিলান। তাঁর মতে, বুদবুদের জালের মধ্যেও বিশেষত্ব রয়েছে। একইরকম জাল প্রতিবার ফেলে না হাম্পব্যাকরা। তাদের প্রযুক্তির মধ্যেও রয়েছে নতুনত্ব। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, শিকারের চালচলন, হাবভাব দেখেই নিমেষের মধ্যে পদ্ধতিতে বদল ঘটায় এই তিমিরা। প্রাণীবিজ্ঞানীদের দাবি, হাম্পব্যাকরা অতিশয় ধূর্ত, বুদ্ধিতেও তুখোড়। বন্ধুত্ব পাতাতে খুবই ভালোবাসে। বটলনোজ ডলফিন এবং রাইট হোয়েলসরা এদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

    বুদবুদের জাল ছড়িয়ে শিকার ধরা:

    শিকারি তিমিরা কিন্তু রোম্যান্টিকও, সুরেলা গলায় গান গায় পুরুষ হাম্পব্যাকরা

    সঙ্গিনীদের প্রেম নিবেদনের সময় উঁচু গলায় গেয়ে ওঠে পুরুষ হাম্পব্যাকরা। বুদবুদের জাল ছড়িয়ে শিকার ধরার সময়েও গান গাইতে দেখা গেছে এই তিমিদের। প্রাণীবিজ্ঞানীদের ধারণা, মনের আনন্দে জীবন কাটাতেই ভালোবাসে এই তিমিরা। সে প্রেম হোক বা শিকার ধরার মুহূর্ত।

    এই গানের মধ্যেও বিশেষত্ব আছে। পুরুষরা গান গায় উঁচু স্কেলে। একেবারে গলা ফাটিয়ে। স্ত্রী হাম্পব্যাকরাও গায়। তবে এরা একটু লাজুক। ধীর লয়ে গাইতে ভালোবাসে। এক একটা গান প্রায় ২০ মিনিট ধরে চলে। একটা গান শেষ হলে ফের অন্য গান। প্রেমের সময় অথবা তিমি পরিবারে কোনও উৎসব থাকলে, ২৪ ঘণ্টাই একসঙ্গে ‘ডুয়েট’ গায় পুরুষ আর স্ত্রী হাম্পব্যাকরা।

    শুনুন তিমির গান:

    গানের লিরিক্স কিন্তু বদলায় না। প্রাণীবিদরা দেখেছেন, এক একটা বিশেষ এলাকার হাম্পব্যাকদের গান একইরকম। যেমন উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের হাম্পব্যাকরা সকলেই একই গান গায়। আবার উত্তর আটলান্টিকের হাম্পব্যাকদের গান আলাদা। বছর বছর গান পাল্টায়। সুরও বদলায়। নাচের ধরনেও নতুনত্ব আসে।

    নাচ করছে তিমি-দম্পতি। দেখুন ভিডিও।

    ভিডিও সৌজন্য: বিবিসি।

    ১৯৪৬ সাল থেকেই হাম্পব্যাকদের শিকারের উপর বিধিনিষেধ চাপায় ইন্টারন্যাশনাল হোয়েলিং কমিশন (IWC)। তারপরেও তিমি-বধ চলেছিল ব্যাপক হারে। ১৯৬৬ সাল থেকে আইন করে হাম্পব্যাকদের হত্যা বন্ধ করা হয়। পরিসংখ্যান বলছে, একসময় লাগাতার শিকারিদের হামলা, তিমি-শিকারের পরবে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরেই প্রায় ২৮ হাজার হাম্পব্যাককে খুঁচিয়ে মারা হয়েছিল। সোভিয়েতে ইউনিয়নে তিমি-বধ হয়েছিল ৪৮ হাজারের কাছাকাছি। ফলে বিরলের তালিকায় চলে যাচ্ছিল হাম্পব্যাকরা। তবে বর্তমানে এদের সংরক্ষণে বিশ্বজুড়েই নানা ব্যবস্থা নিচ্ছেন প্রাণীবিদরা। বিশেষত জাপানে এই তিমিদের স্পার্ম (শুক্রাণু) সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে। ড্রোন উড়িয়ে সমুদ্রের উপকূলবর্তী এলাকায় ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালানো হয়।

    পড়ুন, দ্য ওয়ালের পুজোসংখ্যার বিশেষ লেখা…

     

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More