সোমবার, এপ্রিল ২২

পৃথিবীর ৬০ শতাংশ বন্যপ্রাণ সাবাড় করেছি আমরা! সময় লেগেছে মাত্র ৪৮ বছর

দ্য ওয়াল ব্যুরো: চমকে গেলেন! কিন্তু এটাই মর্মান্তিক সত্য। ১৯৭০ সালে সারা পৃথিবীতে যত স্তন্যপায়ী, পাখি, সরীসৃপ ও মাছ ছিল, ২০১৮ সালে এসে দেখা যাচ্ছে তার ৬০ ভাগই পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে কেবল মাত্র মানুষের জন্য। সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড ফান্ড ( WWF) এই মর্মে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রিপোর্ট পেশ করেছে। এই রিপোর্টটি  বিশ্বের ৫৯ জন প্রথম সারির বিজ্ঞানী তৈরি করেছেন। রিপোর্টে তাঁরা বলেছেন, বন্যপ্রাণের বিলুপ্তি প্রকৃতির ভারসাম্যে বিঘ্ন ঘটায়, যা মানবসভ্যতা বিনাশের অন্যতম কারণ হতে চলেছে।

খাদ্য-খাদক সম্পর্কের যে ভারসাম্য প্রকৃতি নিজেই বেঁধে দিয়েছে তাতে ছেদ বসিয়েছে মানুষ।  অবাধে প্রাণী হত্যা তো রয়েছেই, বিলুপ্তপ্রায়দের নিয়েও কারবারের নেশা মানুষকে অন্ধ করে দিয়েছে। তার উপর রয়েছে সবুজ প্রাণের নির্মম বিনাশ। সব মিলিয়েই পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র ও খাদ্য শৃঙ্খল আজ সঙ্কটের মুখে। যে শৃঙ্খল প্রকৃতি রচনা করেছিল কোটি কোটি বছর ধরে, তাকে সযত্নে, ঠাণ্ডা মাথায় ভেঙে দিয়েছে এবং দিচ্ছে মানুষ। তাই শুধু খাদ্য সঙ্কট নয়, পানীয় জল থেকে শ্বাস নেওয়ার বাতাস সবই আজ কলুষিত। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড ফান্ড-এর বিজ্ঞান ও সংরক্ষণ বিভাগের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মাইক ব্যারেট বলেছেন, “আমরা খাদের কিনারা দিয়ে  ঘুমিয়ে হাঁটছি। ধরুন উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ, চিন, ওশিয়ানিয়া যদি জনশূন্য হতো বা পৃথিবীতে  মানুষের সংখ্যা যদি ৬০% কমে যেতো! কেমন লাগতো আমাদের? হ্যাঁ আমরা এটাই করেছি। ”

জার্মানির পোস্টড্যাম ইনস্টিটিউট অফ ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চ এর বিজ্ঞানী জোহান রকস্টর্ম বলেছেন, “মানুষের অস্তিত্বকেই  সংকটে ফেলে দিলাম আমরা, প্রকৃতি নিছকই কোনও সৌন্দর্য্যের উপাদান নয়, প্রকৃতি আমাদের লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম। এটা আমরা ভুলে গেছিলাম। ইকোসিস্টেম (বাস্তুতন্ত্র) এবং আবহাওয়াই পৃথিবীতে মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। নিজেদের ভুলে আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে শেষ করতে বসেছি। দ্রুত সময় শেষ হয়ে আসছে। ” পৃথিবীর বেশিরভাগ বিজ্ঞানী মনে করেন, সভ্যতার শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত মানুষ, ৮৩% স্তন্যপায়ী এবং ৫০% উদ্ভিদ ধ্বংস করে ফেলেছে। ।    এই ক্ষতি পূরণ করা মানুষের পক্ষে কখনই সম্ভব নয়। কারণ অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণী পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হয়ে গেছে। এবং বাকিদের আগের সংখ্যায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে প্রকৃতির ৭০ লক্ষ বছর সময় লাগবে।

পৃথিবীতে বন্যপ্রাণ হারিয়ে যাওয়ার  বড় কারণ হলো, বন্যপ্রাণীদের প্রাকৃতিক বাসভূমি ধ্বংস করে ফেলা। আর এর পিছনে অন্যতম মূল কারণ হল অরণ্য ধ্বংস করে  কৃষিজমির বিস্তার। বর্তমান পৃথিবীতে চারভাগের তিনভাগ জমিই মানুষ কোনও না কোনও ভাবে ব্যবহার করছে। এছাড়াও, মানুষ প্রায় ৩০০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীকে স্রেফ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে পৃথিবী থেকে মুছে দিয়েছে। পৃথিবীর অর্ধেক কিলার হোয়েলস জাতের তিমি মারা গেছে রাসায়নিক দূষণ জনিত রোগ আর তিমি শিকারিদের লোভের কারণে । উভচররা মারা যাচ্ছে ছত্রাক ঘটিত রোগে। যার পিছনেও রয়েছে মানুষের হাত। এই পৃথিবীতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ অঞ্চল হলো দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা। যারা তাদের বনভূমিতে থাকা ৮৯ % মেরুদন্ডী প্রাণীই হারিয়ে ফেলেছে।

প্রত্যেক দু’মাস অন্তর, বৃহত্তর লন্ডনের আকারে ট্রপিক্যাল সাভানা বনভূমি হারিয়ে যাচ্ছে, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা থেকে। হারিয়ে যাচ্ছে বন্যপ্রাণ। কারণ তাদের রসদ মানুষ নিয়ে নিচ্ছে। কেটে ফেলা সাভানা বনভূমিতে সয়াবিন চাষ হচ্ছে। সেই সোয়াবিন ব্রিটেনে রফতানি হচ্ছে শুয়োর, মুরগীদের খাওয়াবার জন্য। যে প্রাণীগুলিও মানুষের খাবার হতে যাচ্ছে কয়েক মাসের মধ্যে। অপরদিকে জৈববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী দেশের তালিকায় ব্রিটেনের স্থান পৃথিবীতে  ৩০ তম।  মানুষে কারণে নদী আর হ্রদের প্রাকৃতিক গঠন ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার জন্যও হারিয়ে যাচ্ছে জলজ এবং বন্যপ্রাণী। ক্রমবর্ধমান কৃ্ষিজমিতে জলসেচ এবং প্রচুর বাঁধ নির্মাণের জন্যও নদী ও হ্রদের পাশে বসবাসকারী ৮৩% বন্যপ্রাণী শেষ হয়ে গেছে।

মানবসভ্যতা কে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর উপায় কী? ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড ফান্ড ইন্টারন্যাশনাল-এর ডিরেক্টর জেনারেল মার্কো ল্যামবার্টিনি দু’লাইনে উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “মাংস খাওয়া কমাতে হবে,খাদ্যের জন্য দীর্ঘস্থায়ী উৎপাদন ব্যবস্থা করতে হবে। যে কোনও প্রাণ নষ্ট করার জীবনযাত্রা ছাড়তে হবে”।

Shares

Comments are closed.