শনিবার, আগস্ট ১৭

কাঠুয়ার রায় কি স্বস্তি দিল? না আজও চোখে ভাসে সেই বেগুনি সালোয়ার, থ্যাঁতলানো মাথা, রক্তে ভাসা ঠোঁট

চৈতালী চক্রবর্তী

ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে সরু পথ। তারই পাশে ঘাসের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে রয়েছে একটা বাচ্চা মেয়ে। পরনে ঘন বেগুনি রঙের সালোয়ার কামিজ, পায়ে জুতো। ঘাসের একদিকে ফেরানো মুখটা দেখলেই বোঝা যায় কী সুন্দর, নিষ্পাপ, ফুটফুটে সে মেয়ে। না, ফুটফুটে ছিল একসময়। সে মুখের দিকে এখন আর চোখ মেলে তাকানো যায় না। ফর্সা রঙের উপর লাল আভা লেগেছিল যে গালে সেখানে এখন শুকিয়ে যাওয়া রক্তের কালচে দাগ। তার উপর দিয়েই আড়াআড়ি চলে গেছে কাটা-ছেঁড়া ক্ষত। মাথাটা পাথর দিয়ে থ্যাঁতলানো, সেখানে মাছি ভন ভন করছে।

২০১৮ সালের ১৭ জানুয়ারি। নির্মমতার সংজ্ঞা বলে যদি কিছু থাকে, সেটা সে দিন টের পেয়েছিলেন দেহ উদ্ধারে আসা পুলিশ কর্মীরা। খুনের বীভৎসতা সম্পর্কে গ্রামবাসীদের মনে যাতে বিন্দুমাত্র ধন্দ না থাকে, খুনিরা যেন তারই বন্দোবস্ত করে গেছে। আটের মেয়ের নাম আসিফা। আঁচড়ে-কামড়ে ফালাফালা তার দেহটা আইনের রক্ষকদের মুখে যেন সপাটে এক চড়।

ঘটনাস্থল জম্মু শহর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে কাঠুয়া। ঘটনার ভয়াবহতা তত দিনে নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা দেশকে। নির্ভয়া-কাণ্ডের পরে ফের কাঠুয়া! এ বার নারকীয় অত্যাচারের বলি এক শিশু। জোরদার তদন্ত শুরু করলো জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ। পুলিশ জানাল, কাঠুয়ার রাসানা গ্রামের হত দরিদ্র বাকারওয়াল সম্প্রদায়ের সেই মেয়ে রোজ জঙ্গলে যেত। একদিন সে নিখোঁজ হলো। লাগাতার সাত দিন ধরে চেনা-পরিচিত মহল্লা চষে ফেলে অবশেষে কাঠুয়ার ঘন জঙ্গলে মিলল তার লাশ। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট জানাল, গণধর্ষণ করে হত্যা হয়েছে শিশুটিকে। তদন্তকারীরা জানালেন, মেয়েটিকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে একটি ধর্মস্থানে আটকে রেখে রোজ নৃশংস অত্যাচার চালানো হয়েছে। ধর্ষকদের লালসা মিটলে সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত করে মাথা থেঁতলে খুন করে জঙ্গলের পথে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছে।

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮। পুলিশ আট জন অভিযুক্তকে সনাক্ত করল যার মধ্যে রয়েছেন ওই ধর্মস্থানের প্রধান পুরোহিতও। দু’জন আবার পুলিশ অফিসার। প্রায় পাঁচশো পাতার চার্জশিট বানানো হলো। মামলা শুরু হল দায়রা আদালতে।

২২ ফেব্রুয়ারি। জম্মুতে তখন আগুন জ্বলছে। গর্জে উঠেছে বাকারওয়াল গোষ্ঠী। দেশজুড়েও তখন বিক্ষোভের আগুন। পুলিশি গাফিলতির অভিযোগে উত্তাল উপত্যকা। পাশাপাশি, অভিযুক্তদের হুমকিতে আতঙ্কে শিশুটির পরিবার-সহ গোটা বাকারওয়াল গোষ্ঠী। মামলা তুলে নেওয়া হবে কি না চলছে তার জল্পনাও। নির্যাতিতার পরিবারকে আশ্বাস দিয়ে পাশে এসে দাঁড়ালেন দীপিকা সিং রাজওয়াত। জম্মু-কাশ্মীর হাইকোর্টের আইনজীবী দীপিকা গুজ্জর-বাকারওয়াল সম্প্রদায়ের ওই শিশুর পরিবারের হয়ে দাঁড়ালেন। আসিফার উপর নৃশংস অত্যাচার ও তাকে খুনের সুবিচার চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হলেন তিনি।

দীপিকা সিং রাজওয়াত

মার্চ ২১। ধর্ষণে অভিযুক্ত আট জনকে গ্রেফতার করল পুলিশ। তাদের মধ্যে চার জন পুলিশ অফিসার। অভিযোগ, তদন্তের গোপন নথি নষ্ট করে দিয়েছিলেন এই অফিসাররা।

এপ্রিল ৪-১০। জম্মু-কাশ্মীর হাইকোর্টের বার অ্যাসোসিয়েশন বিরোধ করল দীপিকার। উঠল তার সততা নিয়ে প্রশ্ন। ‘হিন্দু একতা মঞ্চ’-এর নেতৃত্বে আন্দোলন তুঙ্গে উঠল। পুলিশের যে বিশেষ তদন্তকারী দলকে (সিট)মামলার চার্জশিট পেশ করতে বাধা দিল আইনজীবীরা। রাজ্য জুড়ে শুরু হলো অবরোধ। শিশু ধর্ষণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজন মাথা তুলে দাঁড়াল। ছোট্ট ক্ষতবিক্ষত নিথর শরীরটায় যেন ধর্মের প্রলেপ পড়ল। কারণ আসিফা কাশ্মীরী? নাকি আসিফা সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বী? নাকি আসিফা দরিদ্র, যাযাবর শ্রেণির মুখ?

প্রতিবাদে গর্জে উঠল দেশ

১৬ এপ্রিল। অভিযুক্তদের শাস্তির প্রক্রিয়া তখন স্তিমিত। উল্টে জম্মু-কাশ্মীর জুড়ে চলছে ধর্না, অবরোধ। ফের দীপিকাকে কাঠুয়া জেলা আদালতে মামলার চার্জশিট পেশ করতে বাধা দিলেন আইনজীবীরা। অভিযুক্তদের সমর্থনে রাস্তায় নামলেন রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী চন্দ্রপ্রকাশ গঙ্গা এবং বনমন্ত্রী লাল সিংহ। অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা নিয়ে উঠল বিরোধ। সাম্প্রদায়িক তরজা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কড়া বিবৃতি দিতেই তড়িঘড়ি পদত্যাগ করলেন দু’জনে।

৭ মে। নিরপেক্ষ বিচারের আশায় সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি জম্মু-কাশ্মীর থেকে পঞ্জাবের পঠানকোটে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিল। নতুন করে শুরু হলো মামলার শুনানি।

কাঠুয়া ধর্ষণের মূল পাণ্ডা পুরোহিত সঞ্ঝীরাম

এর পরেই এল সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কাঠুয়ায়  নৃশংস ঘটনার ফলে শিশু-ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে অপরাধমূলক আইন (সংশোধনী) অর্ডিন্যান্স জারি করল কেন্দ্র। ভারতীয় দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি, সাক্ষ্যপ্রমাণ আইন এবং শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ আইন ২০১২ (পকসো) পরিবর্তনের জন্য অর্ডিন্যান্স আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। নতুন বিধান হলো,  মহিলাদের ধর্ষণের ঘটনায় ন্যূনতম সাজা ৭ বছর থেকে বাড়িয়ে হবে ১০ বছর। ১২ বছরের কমবয়সি মেয়েকে ধর্ষণ করলে ন্যূনতম সাজা ২০ বছরের জেল, সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। ১২ বছরের কমবয়সিকে গণধর্ষণ করলে সাজা যাবজ্জীবন কারাবাস বা  মৃত্যুদণ্ড। ১৬ বছরের কমবয়সিদের ধর্ষণ করলেও ন্যূনতম সাজা ১০ বছরের বদলে ২০ বছরের কারাদণ্ড। সর্বোচ্চ শাস্তি আমৃত্যু কারাবাস।

এর পরেও কাঠুয়া গণধর্ষণের মামলা নিয়ে জল গড়িয়েছে বহুদূর। কেটে গেছে ১৭ মাস। ১০ জুন, ২০১৯। চূড়ান্ত রায় দিল পাঠানকোটের বিশেষ আদালত। শিশু ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্ত সেই আট জনের পাঁচ জনকে দোষী সাব্যস্ত করল আদালত। দোষীদের মধ্যে রয়েছে, পুলিশ অফিসার দীপক খাজুরিয়া, প্রবেশ কুমার এবং মন্দিরের পুরোহিত সঞ্ঝীরামএই সঞ্ঝীরামই ছিল কাঠুয়ার নৃশংস ঘটনার অন্যতম পাণ্ডা। এ ছাড়াও রয়েছে সাব ইনস্পেকটর আনন্দ দত্ত, হেড কনস্টেবল তিলক রাজ, সঞ্ঝীরামের ছেলে বিশাল এবং তার নাবালক ভাইপো।

জম্মুর দু’টি লোকসভা আসনের একটি কাঠুয়া। যেখানে একদিকে থাকেন ব্যবসায়ী, পুজারী, শ্রমিক, সরকারি কর্মচারী শ্রেণিভুক্ত হিন্দুরা। সেখানেই একটি পাকা বাড়িতে থাকেন সঞ্ঝীরামের স্ত্রী। দিনভর পুজোআচ্চা নিযে থাকা, ধর্মভীরু সঞ্ঝীরাম ধর্ষণ করতে পারেন সে কথা এখনও মানতে নারাজ তাঁর পরিবার। অন্যদিকে, কাঁটাবনে ঘেরা জঙ্গলে খুপরি ঘর বানিয়ে থাকেন দরিদ্র বাকারওয়াল সম্প্রদায়ের মুসলিমরা। গ্রামের লোকালয়ে যাদের অস্তিত্ব ব্রাত্য। অনেক প্রতিবাদ, অনেক মোমবাতি, অনেক হ্যাশট্যাগ দেখেছে কাঠুয়া। অনুতাপের চিহ্নহীন পাথরকঠিন সঞ্ঝীরামের মুখ দেখে এখনও ভয় পায় কাঠুয়ার দরিদ্র যাযাবর গোষ্ঠী

আজকের রায় তাই কতটা স্বস্তি দিল সন্তান হারানো শুকিয়ে যাওয়া সেই মুখগুলিতে? নির্যাতিতা মেষপালিকার ছোট্ট খুপরি ঘরে আজ কি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন তার মা-বাবা? নাকি শীতের কুয়াশা মাখা দুপুরে জঙ্গলের ঘাসের উপর পড়ে থাকা সেই থ্যাঁতলানো নিথর দেহটা এখনও প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিচ্ছে সে দিনের বীভৎসতার কথা? ফুরিয়ে যাওয়ার বসন্তের আকাশে এখনও যে লেগে রয়েছে রক্তের দাগ।

আরও পড়ুন:

#Breaking: কাঠুয়াকাণ্ডে ৮ অভিযুক্তের মধ্যে দোষী সাব্যস্ত ৬

Comments are closed.