মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১
TheWall
TheWall

রাগী পিঁপড়ের মুখ দেখেছেন কখনও, কৃমির ডিম কিংবা মৌমাছির নাকের ডগায় পরাগরেণু

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

দ্য ওয়াল ব্যুরো:  আমাদের চেনা পরিচিতির বাইরেও একটা জগৎ আছে। খালি চোখে যা ধরা দেয় না। বা ধরা দিলেও সেই জগতের অন্দরমহলে আমরা চোখ রাখি না। একটা ছোট্ট মৌমাছির নাকের ডগায় লেগে থাকা রেণু দেখেছেন কখনও? অথবা আপনারই দিকে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে থাকা কোনও পিঁপড়েকে? কৃমি দেখে যতই নাক সিঁটকান না কেন, কৃমির ডিম দেখতে মন চেয়েছে কখনও! আপনারই শরীরে তাদের জীবনচক্র কীভাবে শুরু থেকে শেষ হচ্ছে খোঁজ নিয়েছেন কি?  আপনারই চাঁটি খেয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া কোনও মশার মুখ খুঁটিয়ে দেখেছেন কখনও?

এতগুলো প্রশ্নের উত্তর যদি না হয়, তাহলে আপনাকে নিয়ে যাওয়া হবে এমনই এক লুকোনো বিশ্বে যেখানে এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবেরা শতগুণ বড় হয়ে ধরা দেবে আপনার চোখে। পিঁপড়ে থেকে প্রজাপতি, কীটপতঙ্গের সংসারে উঁকিঝুঁকি দিতে তৈরি তো!

যে কোনও সূক্ষ্ম বস্তুকে দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে শতগুণ বাড়িয়ে তোলার ক্ষমতা আছে যে যন্ত্রের তার নাম ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ। আগে সাধারণ মাইক্রোস্কোপের তলায় ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস দেখা যেত না। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ বা ইলেকট্রন অনুবীক্ষণ যন্ত্রে এক নতুন জগতের রহস্যের পর্দা উন্মোচিত হল। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের (ইলেকট্রনের সাহায্যে কাজ করে যে অণুবীক্ষণ যন্ত্র) তার গভীরে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা আছে। আগে বিশ্বাস করা হত অপটিক্যাল মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে ০.২ মাইক্রোমিটারের পরে কিছু দেখা যাবে না। কিন্তু এই সীমা অতিক্রম করে গেছে ইলেকট্রন অনুবীক্ষণ যন্ত্র।

নিজের গবেষণাগারে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে পরীক্ষা চালাচ্ছেন জ্যানিক উইক নিয়েলসন

এই ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের সাহায্যেই কীটপতঙ্কের রহস্যময় দুনিয়ায় চোখ রেখেছেন জ্যানিক উইক নিয়েলসন। নরওয়েজিয়ান ভেটেরিনারি ইনস্টিটিউটের গবেষক উইক তাঁর ‘হিডেন ওয়ার্ল্ড’-এ এমন কিছু ছবি দেখিয়েছেন যা চমকে দিয়েছে বিশ্বকে। ব্রিটেনের রয়্যাল ফোটোগ্রাফি সোসাইটি উইককে এই জন্য বিশেষ সম্মানও দিয়েছে। চলতি বছর ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ডের নানা জায়গায় তাঁর লুকোনো বিশ্বকে তুলে ধরেছেন উইক। খালি চোখে যা দেয় না ধরা, তাই ফুটে উঠেছে উইকের হাতের জাদুতে।

উইক নিয়েলসনের লুকোনো বিশ্বে…

উইক বলেছেন স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি পদ্ধতিতে কীটপতঙ্কের দেহের নানা অংশের ছবি শত গুণে বা হাজার গুণে বাড়িয়ে তার পরিষ্কার ছবি সামনে এনেছেন তিনি। তাঁর কথায়, “ভেটেরিনারি ইনস্টিটিউটে নানা গবেষণার সঙ্গে আমি যুক্ত। এখানে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে মূলত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাকের বিশ্লেষণ করা হয়। নানারকম ওষুধ তৈরির গবেষণায়, মানুষ বা পশুর কোনও ভাইরাসজনিত রোগের ক্ষেত্রে বা ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশনে লাগে এই মাইক্রোস্কোপ। আমি একেই কাজে লাগিয়েছি এক বিশ্ব গড়ে তুলতে। যা আমাদের কাছেই আছে, অথচ আমরা ছুঁতে পারি না।”

উইক জানিয়েছেন, ইলেকট্রন অনুবীক্ষণ যন্ত্রে জীবিত কোনও কিছুকে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। সেই বস্তুর কাটা অংশ বা বিশেষ কোনও অঙ্গ নিতে হয়। ছোট জীব হলে পুরোটাই ধরা দেয় মাইক্রোস্কোপে। স্ক্যানিং করার জন্য সেই বস্তুকে (Object)নিতে হয় এমন একটা চেম্বারে যেখানে বাতাস বা জলীয় বাষ্প প্রবেশ করতে পারবে না। এবার সেই বস্তু বা স্যাম্পেলকে একটি রাসায়নিক তরলে রেখে দিতে হয় যাতে তার আকার কোনওভাবে বিকৃত না হয়ে যায়। এবার ভাল করে শুকিয়ে সেটিকে মেটাল কোটিং করতে হয়। এই কোটিং স্পষ্ট ছবি তুলতে সাহায্য করে। উইক জানিয়েছেন গ্রে-স্কেলে তোলা ছবি স্পষ্ট বোঝার জন্য অনেক সময়েই ফোটোশপে রাঙিয়ে নেওয়া হয়।

উইকের ভাষায় সেসব ছবি ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’, একঝলক দেখলে শিউরে উঠতে হয়। আবার একই সঙ্গে বিস্ময় জাগে।

উইক নিয়েলসনের ব্রোকোলির বাগানে ঘুরে বেড়ানো একটা নিরীহ পিঁপড়ে। দেখুন কেমন চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে।

আমাদের অতি পরিচিত মৌমাছি। ৪০ বার ম্যাগনিফাই করে এমন বিকট আকার নিয়েছে। এমন রাগী মৌমাছি দেখেছেন কখনও?

“একবার মাছের ডিম কয়েক হাজার বার ম্যাগনিফাই করে দেখেছিলাম। চমকে উঠতে হয়,”উইক বলেছেন কৃমির ডিম প্রায় হাজার গুণ বাড়িয়ে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ দেখিয়েছে। কী অদ্ভুত না!

মৌমাছির নাকের ডগা থেকে গড়িয়ে পড়ছে রেণু, এমন ছবি কল্পনাতেও এসেছে কখনও! প্রায় ১২০০ বার ম্যাগনিফাই করা হয়েছে।

দুই কৃমির লড়াই। উইকের তোলা সেরা ছবি, নাম দিয়েছিলেন ‘লাভ অ্যান্ড হেট।’

১৫০০ বিভিন্ন প্রজাতির কীটপতঙ্গের ছবি তুলেছেন উইক। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে স্ক্যান করে তাদের আসল চেহারা সামনে এনেছেন।

উইক নিয়েলসনের মতোই জীববিজ্ঞানী ডেভিড এম ফিলিপ্সের কিছু ছবি বিখ্যাত হয়ে গেছে এন্টোমোলজির দুনিয়ায়। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে স্ক্যান করা ডেভিডের ছবির সংগ্রহ ‘আর্ট অ্যান্ড আর্কিটেকচার অব ইনসেক্টস’ বেশ জনপ্রিয়। দেখে নিন ডেভিডের ছবির চমক।

শুঁড়ের মাঝে খাড়া দুটো শিং। আমাদের অতি পরিচিত পোকা কিন্তু।

পিঠে শক্ত খোলস। এরা আত্মরক্ষার জন্য লড়াই করতে পারে।

বোলতা। এইভাবে দেখেছেন কখনও!

তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

Share.

Comments are closed.