হার্ট ভাল রাখতে চাই স্মার্ট ডায়েট, বিশেষজ্ঞরা বলছেন হৃদরোগের এ টু জেড

হার্ট ভাল রাখতে নজর দিতে হবে স্বাস্থ্যকর ডায়েটে। নিয়মিত চেকআপও জরুরি। বলছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    ড. বিশ্বজিৎ বটব্যাল

    (মাইক্রোবায়োলজিস্ট, এস সেরাম অ্যানালাইসিস সেন্টার)

    আমাদের হৃদযন্ত্রের মতিগতি বোঝা শক্ত। কখনও সে দিব্যি চলছে, আবার কখনও বুকের উপর কয়েক মণ ভারী পাথর চেপে বসার মতো ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, দৌড় এমার্জেন্সির দিকে। হৃদয়ের যত্নে কার্পণ্য করতে চান না অতি বড় কৃপণও। তবু হৃদযন্ত্র কতটা বিপজ্জনক অবস্থায় আছে সেটা নিয়মিত পরীক্ষা করার ইচ্ছা বা অভ্যাস এখনও তৈরি হয়নি মানুষের মনে। অনেকেই মনে করেন স্রেফ শরীরচর্চা বা হাঁটাহাঁটিতেই জব্দ হবে হার্টের যাবতীয় অসুখ। কিন্তু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীরচর্চার পাশাপাশি খাবার পাতেও রাখতে হবে নজর। তবেই হার্টের অসুখের সঙ্গে লড়াই করার সম্পূর্ণ বর্ম তৈরি করা সম্ভব হবে।

    হার্টের ক্ষেত্রে প্রধান ছ’টি রিস্ক ফ্যাক্টর হল— ওবেসিটি, ডায়াবিটিস, হাইপার টেনশন বা হাই ব্লাডপ্রেশার, হাই ট্রাইগ্লিসারাইড, ধূমপানের অভ্যেস এবং ক্রনিক হার্টের অসুখ বা বংশগত হার্টের অসুখের ইতিহাস। ধূমপান থেকে নিজেকে একেবারে সরিয়ে রাখলে হার্টের অসুখের আশঙ্কা অনেকটা কমানো যায়। ডায়াবিটিস, ব্লাডপ্রেশার এবং ট্রাইগ্লিসারাইড— এই তিন ভিলেনকে বশে রাখতে হলে লাইফস্টাইলে বদল দরকার। তার জন্য বিশেষ করে নজর দিতে হবে ডায়েটে।

    হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, খাবারের মধ্যে দিয়ে শরীরে যে প্রতিরোধ ক্ষমতা আমরা অর্জন করি, তাকে অবহেলা করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বিশেষ করে হার্টের যত্নে খাবারদাবার নিয়ে সব সময় সচেতন থাকতে হয়। খুব বেশি তেল-মশলা যেমন এই অসুখে বারণ, তেমনই হার্টের কার্যকারিতা বাড়াতে ও হৃদস্পন্দন ঠিক রাখতে কিছু কিছু খাবার অবশ্যই নিত্য ডায়েটে রাখা উচিত।

     

    পুষ্টিকর খাবারে থাক নজর, দূরে রাখুন হার্টের ভিলেনদের

    হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, খাবারের মধ্যে দিয়ে শরীরে যে প্রতিরোধ ক্ষমতা আমরা অর্জন করি, তাকে অবহেলা করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বিশেষ করে হার্টের যত্নে খাবারদাবার নিয়ে সব সময় সচেতন থাকতে হয়। মন মানতে না চাইলেও খাদ্যাভাসে লাগাম টানা দরকার। তেল-ঘি-মশলাদার খাবারকে বলতে হবে গুডবাই। জাঙ্ক ফুড বা বাজারচলতি যে কোনও প্যাকেটজাত খাবার, রেডমিট একেবারেই নয়। হার্ট সুস্থ রাখতে ট্রাইগ্লিসারাইড, কোলেস্টেরলকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।

    এক জন সুস্থ সবল মানুষের রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা হওয়া উচিত প্রতি ডেসিলিটারে ১৬০ মিলিগ্রামেরও কম। চর্বি জাতীয় মাংস, পাম তেল, ডালডা, নারকেল, ডিমের কুসুম, মাখন, ঘি, কাজু বাদাম, প্রসেসড মিট, প্যাকেটজাত খাবার, কেক-পেস্ট্রি বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার বাদ দিলে খারাপ কোলেস্টেরল শরীরে বাসা বাঁধতে পারে না। কম তেল-মশলা হার্টের পক্ষে যেমন ভাল, তেমনই তা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। কতটা ফ্যাট শুধু তা দেখলেই হবে না, কতটা ট্রান্স ফ্যাট তা-ও দেখতে হবে। ট্রান্স ফ্যাট থেকেও শরীরে জমে খারাপ কোলেস্টেরল।

    খারাপ কোলেস্টেরলকে বশে রাখতে ডায়েটে রাখতে হবে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ও ফাইভার সমৃদ্ধ খাবার। শাক-সব্জি, তরিতরকারি, ফল তো বটেই, তার সঙ্গে অত্যাবশ্যক ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবারও। ফলের মধ্যে অবশ্যই দরকারি, আপেল, বেদানা, মুসম্বি লেবু, খেজুর। ডার্ক চকোলেট হার্ট ভাল রাখে, ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। হার্টে রক্ত চলাচলের ভারসাম্য বজায় রাখতে ও হৃদস্পন্দনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ সাহায্য করে ডিমের সাদা অংশ। ভিটামিন কে সমৃদ্ধ পালং শাক ধমনীকে সুরক্ষিত রাখে ও রক্তের চাপ কম রাখতে সাহায্য করে।

    স্মুদি বা ফ্রুট স্যালাডের স্বাদ বাড়াতে বেরি জাতীয় ফলকে পাতে রাখতে পারেন। ১৫০ গ্রাম ব্লু বেরি হার্টের ভাস্কুলার ফাংশনকে ঠিক রাখে। এর মধ্যে থাকা অ্যান্থোসিয়ানিন নামক অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হার্টের কার্যকারিতা বাড়িয়ে কার্ডিওভাস্কুলার রোগকে দূরে রাখে।

    কী কী লক্ষণ দেখে বুঝবেন হানা দিতে পারে হার্ট অ্যাটাক

    • হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, গড়পড়তা হার্ট অ্যাটাকের রোগীদের মধ্যে ৩০ শতাংশেরই প্রথম বার অ্যাটাক হয়। তাই অভিজ্ঞতা না থাকায় লক্ষণ টের পান না তাঁরা। ডায়াবিটিকরাও অনেক সময় বুঝতে পারেন না হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ।

    • হার্ট অ্যাটাকের আগে বুকে ব্যথার চেয়েও চাপ বেশি অনুভব করেন মানুষ। যদি দেখা যায়, বুক, ঘাড়, চোয়াল বা তলপেটের কোনও অংশে চাপ বেশি হচ্ছে তৎক্ষণাৎ সতর্ক হতে হবে। শুধু বুক নয়, বাম ও ডান হাতেও একটানা ব্যথা হতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

    • হাঁটতে গেলে হাঁপ লাগছে, দাঁড়িয়ে বা বসে পড়লে শ্বাসকষ্ট চলে যাচ্ছে মানেও বিপদ ধারেকাছেই ওঁত পেতে আছে।

    • ব্যথার সঙ্গে ঘাম হওয়াটাও হার্ট অ্যাটাকের আগাম লক্ষণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদপিণ্ডের উপর চাপ বেশি পড়লে রক্ত সঞ্চালনের জন্য অনেকটা বেশি পরিশ্রম করতে হয়, ফলে ঘাম তৈরি হয়। ব্যথা, চাপের সঙ্গে ঘাম হলে সঙ্গে সঙ্গে ঘাড়ে, মাথায় জল দিতে হবে।


    সাইলেন্ট কিলারকে ঠেকাতে নিয়মিত চেকআপ দরকার

    হৃদসংবহন তন্ত্র, মস্তিষ্ক, বুক ও ধমনীর সম্পর্কিত রোগকে হৃদরোগ বলা হয়। করোনারি হৃদরোগ, কার্ডিও মায়োপ্যাথি, উচ্চ রক্তচাপ জনিত হৃদরোগ, হার্ট ফেলিওর, হৃদপিণ্ডের ডান পাশ অচল হয়ে যাওয়া, শ্বাস প্রশ্বাস ব্যহত হওয়া, হার্টের রোগের নানান ধরন। অতিরিক্ত তেল-মশলাদার খাবার, ডায়াবিটিস, স্থূলতা হার্টের রোগের রিস্ক ফ্যাক্টরগুলোকে আরও বাড়িয়ে দেয়। মানসিক চাপ বা স্ট্রেস, রক্তে এল ডি এল (খারাপ) কোলেস্ট্রেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং এইচ ডি এলের (ভালো)মাত্রা কমে গেলেও হার্ট অ্যাটাক হয়। এরজন্য কম করেও প্রতি তিনমাস অন্তর হার্টের চেকআপ দরকার।

    কী কী পরীক্ষা করানো যেতে পারে—

    • রক্তচাপ পরীক্ষা করানো (বিপি)
    • পালস টেস্ট
    • ইসিজি, চেস্ট এক্স-রে
    • নন-ইনভেসিভ টেস্ট যেমন ট্রেডমিল টেস্টের মাধ্যমে হার্টে ব্লকেজ আছে কি না বোঝা যায়
    • ইকোকার্ডিওগ্রাম যার মাধ্যমে মাধ্যমে হৃদপিন্ডের অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন ধরা পড়ে। যারা ধূমপান করেন, ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি যাদের, যাদের হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস আছে তাদেরকে এই পরীক্ষাটি করার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা।

     

    প্যাথোলজিকাল টেস্ট

    যেহেতু হার্টের, তাই আগে থেকে সতর্ক হতে হবে। বুকে ব্যথা হলে সঙ্গে সঙ্গেই কার্ডিয়োলজিস্টের পরামর্শ নিতে হবে। কিছু রুটিন রক্ত পরীক্ষা আছে যেগুলি ডাক্তারের পরামর্শ মতো করালে আগে থেকেই সাবধান হওয়া যায়।

    • কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (CBC)- রক্তের সব উপাদান স্বাভাবিক রয়েছে কি না বুঝতে এই পরীক্ষাগুলি করাতে বলেন চিকিৎসকরা। কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট টেস্ট করালে বোঝা যায়, রক্তে যে পরিমাণে হিমাটোক্রিট, হিমোগ্লোবিন, আরবিসি, ডব্লিউবিসি, প্লেটলেটস থাকার কথা, তা রয়েছে কি না। ওই রক্তকণিকাগুলির পরিমাণে কমা-বাড়া বুঝলেই যে কোনও আগাম রোগের চিকিৎসা সম্ভব।
    • শরীরে সোডিয়াম-পটাসিয়ামের ভারসাম্য পরীক্ষার জন্য ইলেকট্রোলাইটস টেস্ট। পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম মিলেই তৈরি হয় মানবদেহের ইলেকট্রোলাইটস পরিবার। এ সব উপাদানের পরিমাণ কম-বেশি হলেই নানা রোগ বাসা বাঁধে।
    • হার্টের রোগের আগাম খবর পেতে প্লাজমা গ্লুকোজ টেস্টও গুরুত্বপূর্ণ
    • লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT) নানারকম হয় যেমন টোটাল প্রোটিন, অ্যালবুমিন, বিলিরুবিন ইত্যাদি।
    • থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট যেমন টি৩, টি৪ এবং টিএসএইচ।

     

    কার্ডিওভাস্কুলার রোগের পূর্বাভাস জানার জন্য আরও কিছু রক্ত পরীক্ষার কথা বলেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা, যেমন—

    • ট্রোপোনিন আই/টি টেস্ট—হৃদপেশীর কাজ করার ক্ষমতা কমতে থাকলে রক্তে ট্রোপোনিন নাম প্রোটিন নিঃসৃত হয়। রক্ত পরীক্ষায় এই প্রোটিনের উপস্থিতি ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসা শুরু করেন ডাক্তাররা। ট্রোপোনিন আই/টি টেস্ট (হাই সেনসিটিভিটি ব্লাড টেস্ট ফর ট্রোপোনিন টি) মাধ্যমে ট্রোপোনিন প্রোটিনের সামান্য উপস্থিতিও নির্ণয় করা যায় এবং হার্ট অ্যাটাক আসার আগেই রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে পারেন ডাক্তাররা।
    • লিপিড প্রোফাইল—রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের (এলডিএল) মাত্রা বাড়তে থাকলে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটাই বাড়ে। ট্রাইগ্লিসারাইড মাত্রার তারতম্য ঘটতে শুরু করে। তাই বছরে অন্তত দু’বার সম্পূর্ণ লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করিয়ে নেওয়ার কথা বলেন ডাক্তাররা।
    • ন্যাট্রিইউরেটিক পেপটাইডস টেস্ট (NT-PRO BNP)—বিএনপি হরমোন যা মস্তিষ্ক ও হৃদপিণ্ডে নিঃসৃত হয়। কার্ডিওভাস্কুলার স্ট্রেসের জন্য এই হরমোন ক্ষরণ বাড়লে হৃদপেশী ঠিকমতো সঙ্কুচিত-প্রসারিত হতে পারে না। একে ডায়াস্টোলিক ডিসফাংশন ও বলে। যার ফল হল হার্ট ফেলিওর।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More