‘ওয়ার্ক ফ্রম বেড!’ বিছানায় গড়িয়ে কাজ মানেই বিপদ, শরীর-মনে কী প্রভাব পড়ছে বললেন বিশেষজ্ঞরা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তত ৫৬% মানুষজন চেয়ার-টেবিলের বদলে বিছানাকেই কাজের জায়গা বানিয়ে নিয়েছেন। কেউ কুঁজো হয়ে বসে কাজ করছেন, তো কেউ একেবারে সটান শুয়ে পড়ে ট্যাব বা মোবাইল চোখের সামনে তুলে একটানা কাজ করে যাচ্ছেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘নিউ নর্মাল’-এ নয়া ট্রাডিশন ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’। বাড়ি বসে কাজ মানেই একরাশ আলস্য। সোফা না হলে বিছানাই এই সময় পরম বন্ধু। ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল নিয়ে বিছানায় কয়েক রাউন্ড গড়াগড়ি না দিলে ঠিক হয় না। ফিটফাট সাজে অফিসের চেয়ার-টেবিলে বসের কড়া চোখের সামনে ঘাড় সোজা করে বসে কাজ করতে তো আর হচ্ছে না!  অতএব বিছানায় একটু গড়িয়ে নাও। কাজও হবে, আবার হাল্কা ঝিমুনিও হবে। অন্দরবাসে কাজের সঙ্গে আলসেমিকে মিলিয়ে দেওয়ার এই যে চেষ্টা, তা কিন্তু মোটেও ভাল কথা নয়। বিছানার সঙ্গে সখ্য পাতালে মনের তুষ্টি কতটা হবে জানা নেই, কিন্তু শরীর নিশ্চিতভাবেই প্রতিবাদ করবে। ঘুমের দফারফা হবে, গাঁটে গাঁটে ব্যথা এসে জমিয়ে বসবে, কাজেরও ক্ষতি হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তত ৫৬% মানুষজন চেয়ার-টেবিলের বদলে বিছানাকেই কাজের জায়গা বানিয়ে নিয়েছেন। কেউ কুঁজো হয়ে বসে কাজ করছেন, তো কেউ একেবারে সটান শুয়ে পড়ে ট্যাব বা মোবাইল চোখের সামনে তুলে একটানা কাজ করে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার এক কাঠি উপরে। বালিশে মাথা রেখে পাশে ল্যাপটপ, ট্যাব সাজিয়ে কাজ করার চেষ্টা চালচ্ছেন। এর ফলও হচ্ছে মারাত্মক। চোখের বারোটা তো বাজছেই, ঘাড়, মাথা, পিঠ, হাতের কনুই সবাই মিলে বিদ্রোহ ঘোষণা করছে।

আজ ঘাড়ে ব্যথা, তো কাল পিঠ টনটন। পরশু হাতের কনুই নাড়ানোই যাচ্ছে না। ঘাড় থেকে শিরদাঁড়া বেয়ে সবসময় একটা ঝিনঝিনে ব্যথা। মাথা যেন কয়েকমণ ভারী। দপদপ করছে। রাতে বিছানায় শুলে ঘুম আসে না। ওয়ার্ক ফ্রম হোমে এই ধরনের উপসর্গ কমবেশি সকলেরই দেখা যাচ্ছে। অনেকেই আবার নিরীহ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন, ‘বাড়িতে বসে আরামেই তো কাজ করছি, তাহলে কেন এত ব্যথা-বেদনা?’ এর উত্তর একটাই, এই অতিরিক্ত আরামই সর্বনাশটি ঘটাচ্ছে।

আরও পড়ুন: ঘুম আসে না! রোগ শুধু শরীরে নয় মনেও, অনিদ্রা ভাগানোর উপায় বললেন বিশেষজ্ঞরা

বিছানায় গড়াগড়ি মানেই পিঠ টনটন, কাঁধ ঝনঝন

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীরেরও একটা বোধশক্তি আছে। সেও বোঝে কখন কাজের সময়, আর কোন সময়টা বিশ্রামের। অফিসে কাজ করার সময় চেয়ার টানটান হয়ে বসে কাজ করতেই হয়। শরীরও চনমনে থাকে। পেশী সক্রিয় হয়। রক্ত চলাচল ঠিকমতো হয়। শরীরে অন্যান্য অঙ্গও একেবারে চাঙ্গা থাকে। হাত দ্রুত কাজ করে। এখন সেই অভ্যাস বদলে হঠাৎ করে যদি ল্যাপটপ নিয়ে সোজা বিছানায় গড়াগড়ি দেয় মানুষ, তাহলে শরীরও ভিরমি খেয়ে যাবে। কাজের সময় আর বিশ্রামের সময় গুলিয়ে ফেলবে। পেশি সঞ্চালন ঠিকমতো হবে না, হাত দ্রুত কাজ করবে না মোটেও, স্নায়ুরা ভাববে এখন আরামের সময়, এতএব বেশি সঙ্কেত পাঠানোর দরকার নেই। ফলে শরীর ঝিমিয়ে পড়বে। এই অবস্থায় ল্যাপটপ বুকের উপর বা কোলের উপর বসিয়ে মাথা, চোখকে জোর করে জাগিয়ে তুলে কাজ করার চেষ্টা মানেই একটা চাপ তৈরি হওয়া। তাতেই বাড়বে নানা রকম ব্যথা। ঘাড়, কাঁধের পুরনো ব্যথারাও ফিরে আসতে পারে। শরীর নানা ভঙ্গিমায় বাঁকিয়ে আধশোয়া হয়ে কাজ করলে শিরদাঁড়ায় চাপ পড়তে বাধ্য। তাই আজ ঘাড়ে ব্যথা, তো কাল কাঁধ টনটন। একটা না একটা লেগেই থাকবে।

এত গড়ালে আর ঘুম আসবে কী করে!

মা-ঠাকুমারা প্রায়ই এই কথা বলেন। ঘুমনোর সময়ই বিছানায় যাও, তার আগে বেশি গড়ালে আর রাতে ঘুম আসবে না। এই কথাই এখন অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে। দিবারাত্র বিছানায় শুয়ে কাজ মানেই ঘুমের দফারফা। ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ যদি ‘ওয়ার্ক ফ্রম বেড’ হয়ে যায়, তাহলে স্লিপিং ডিসঅর্ডার আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরবে, এ কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরাই।

অন্দরবাসে কাজ যবে থেকে শুরু হয়েছে বেশিরভাগ মানুষই ল্যাপটন নিয়ে সোজা বিছানায় গিয়ে সেঁধিয়েছেন। ডাক্তাররা বলছেন, কাজের জায়গা আর বিশ্রামের জায়গা সব সময় আলাদা রাখা উচিত। বাড়ি বসে কাজ হলেও পরিবেশ তৈরি করতে হবে। চেয়ার-টেবিলে বসে বা সোফায় বসলেও পিঠ সোজা করে কাজ করা জরুরি। বেডরুম কাজের উপযুক্ত পরিবেশ নয়। এতে কাজের গতি কমবে। মানও খারাপ হবে। সুবিধা থাকলে জানলার পাশে কাজের পরিবেশ তৈরি করে নেওয়া যেতে পারে। গবেষণাই বলছে, যেখানে আলো-হাওয়া বেশি এমন জায়গায় ওয়ার্কপ্লেস হলে কাজের গতি অন্তত ৫০% বেড়ে যায়। সেখানে বদ্ধ বেডরুমে বিছানায় বসে কাজ করলে সেই গতি আসে না।

শরীর যদি সবসময় ঝিমিয়েই থাকে তাহলে সঠিক সময় ঘুম কিছুতেই আসবে না। বিছানায় শুয়ে ল্যাপটপ বা মোবাইল দেখলে মস্তিষ্কেও তার ধাক্কা লাগে। দিনের পর দিন এমনভাবে কাজ করলে ইনসমনিয়াও ধরে যেতে পারে।

 

বিছানা ছাড়া উপায় নেই? তাহলে নিয়ম মানতে হবে

বিছানা ছাড়া আর গতি নেই। এমন দাবি অনেকেরই। যদি তাই হয় তাহলে কিছু নিয়ম মানতেই হবে। শুয়ে নয় বরং বসে কাজ করতে হবে। পিঠ কুঁজো করে নয়, টানটান করে রাখতে হবে। দরকার হলে শক্ত কিছুতে হেলান দিয়ে বসাই ভাল। তাহলে ঘাড় সোজা থাকবে। মাথা, ঘাড় আর শিরদাঁড়া সোজা এক সরলরেখায় থাকলে উটকো ব্যথা-বেদনা চট করে ধরবে না।

দুই পা বেশিক্ষণ ভাঁজ করে না রেখে ছড়িয়ে দেওয়া ভাল। একইভাবে দীর্ঘসময় বসে থাকলে হাতে, পায়ে ও পিঠে ব্যথা হবে। বসার ধরন বদলানো দরকার। মাঝে মাঝে বিরতিও জরুরি। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে এসে ফের কাজে বসা যেতে পারে। এতে শরীর ঝিমিয়ে পড়বে না, রক্ত চলাচল ঠিকমতো হবে। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট শরীরচর্চা দরকার। পারলে কাজে বসার আগে ওয়ার্কআউট করে নেওয়া ভাল। তাতে শরীর ওয়ার্মআপ থাকবে। কাজেও গতি আসবে। ঘুম ঘুম ভাব চলে যাবে। যদি বিছানায় শুয়েই কাজ করতে হয় তাহলে ঘাড়ের নীচে হাল্কা বালিশ রাখলে ভাল। তবে বেশিক্ষণ শুয়ে কাজ করলে ঘাড়, মাথায় ব্যথা হতে বাধ্য। রাতে ঘুমেরও বারোটা বাজবে। কাজেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিছানার প্রতি যতই মোহ-মায়া থাক না কেন, কাজের সময় বিছানাকে একটু এড়িয়ে চলাই ভাল। ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ যদি  ‘ওয়ার্ক ফ্রম বেড’ হয়ে যায় তাহলেই মুশকিল।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More