বাতের ব্যথা মহামারী হয়ে উঠছে, গাঁটে-গাঁটে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলবে কীভাবে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: অফিসে একটানা কম্পিউটারে বসে কাজ। চেয়ার ছাড়লেই গোটা মেরুদণ্ড বেয়ে যেন বিদ্যুতের ঝলক খেয়ে যায় রুমার। বাসের সিঁড়িতে পা টা ফেলতে গেলেই টনটনিয়ে ওঠে ব্যথা। বয়স ত্রিশ ছুঁয়েছে।

    সুমিত্রাদেবীর বয়স ৫০। ইদানীং হাঁটাচলায় বড় সমস্যা। উঠতে-বসতে হাঁটুতে অসহ্য যন্ত্রণা। মনে হয় কে যেন বেতের ঘা বসিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে পায়ের পাতাও ফুলেফেঁপে একসার, চলতে গেলেই যেন কারেন্ট লাগে।

    কুড়ির তরুণী হোক বা পঞ্চাশের প্রৌঢ়া—বাতের ব্যথা বা গাঁটে-গাঁটে যন্ত্রণা এখন আর বয়স বিচার করে আসে না। টানা ৭-৮ ঘণ্টা কম্পিউটারে বসে কাজ করেন যাঁরা, তাঁরা তো ভুগছেনই, রেহাই নেই ঘরোয়া কাজ করতে অভ্যস্ত গৃহবধূদেরও। হয়তো জোরে হাঁটতে গেলেন বা পা মুড়ে মাটিতে বসতে গেলেন, এমনি যন্ত্রণায় হাঁটুটা অবশ হয়ে গেল। লিফটে চেপে ওঠানামায় অভ্যস্ত শরীর সিঁড়ি দিয়ে কয়েক পা উঠলেই কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত একটা চিনচিনে ব্যথা যেন সাপের মতো ছোবল মারে। ঘর গোছাতে গেলে বা লেখালিখি করতে গেলে আঙুলে-আঙুলে টনটনিয়ে ওঠে যন্ত্রণা। এমন লক্ষণ যদি ধরা দেয় তাহলে বলতেই হয় আপনি অস্টিওআর্থ্রাইটিস বাঁধিয়ে বসেছেন। আঙুলে ব্যথাটাও আর্থ্রাইটিস তবে সেটা অন্যরকম। একে বলে রিউমাটয়েড আর্থাইট্রিস।

    এই বাতের ব্যথা কখনওই সম্পূর্ণ নিরাময় হয় না। ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খেয়ে বা ফিজিওথেরাপি করিয়ে ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। তবে জীবনযাত্রার মানে কিছু প্রয়োজনীয় বদল আনলে এবং দৈনন্দিন অভ্যাসগুলিতে নিয়ন্ত্রণ রাখলে গাঁটে-গাঁটে ব্যথা বশে রাখা সম্ভব।

    আরও পড়ুন: লিভার সিরোসিস জব্দ হবে, ভিলেন প্রোটিনদের শায়েস্তা করতে নতুন খোঁজ বিজ্ঞানীদের


    জল্লাদের মতো খাঁড়া ঝুলিয়ে রেখেছে বাতের ব্যথা, কোপ বসাচ্ছে যখন তখন

    বাড়িতে মা, ঠাকুমাদের সবসময় বলতে শোনা যায়, হাঁটু ‘লক’ হয়ে গেছে। হাঁটাচলা বা কাজকর্ম করলে অস্টিওআর্থারাইটিস বাড়ে। সাধারণত মাঝবয়সে হানা দেয়, তবে এটা অল্পবয়সেও হতে পারে। ডাক্তাররা বলেন, বিভিন্ন হাড়ের সংযোগস্থল যাকে বলা হয় অস্থিসন্ধি, ক্ষতিগ্রস্ত হলেই বাতের ব্যথা জেগে ওঠে। অস্থিসন্ধি বা দু’টি হাড়ের সংযোগস্থলে অর্থাৎ হাড়ের আগায় সাদা রঙের রবারের মতো দু’টি তন্তুর মতো বস্তু থাকে। এদের কাজ অস্থিসন্ধির দু’টি হাড়ের মধ্যে ঘর্ষণ কমানো। তা ছাড়া কোনও আঘাত লাগলে এগুলি ‘শক অ্যাবজরভার’ হিসাবে কাজ করে। এই সাদা তন্তুর মতো বস্তুকে বলে কার্টিলেজ (Cartilage)। এই কার্টিলেজগুলি ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে শুরু করলে বাতের সমস্যা শুরু হয়। ঠিকমতো শরীরচর্চা না করা, শারীরিক পরিশ্রমে অনীহা, একটানা দাঁড়িয়ে বা বসে কাজ, অনিয়ন্ত্রিত খাওয়াদাওয়া এই রোগকে নিমন্ত্রণ করে ডেকে আনে।

    ব্যথা প্রথম শুরু হয় অস্থিসন্ধিতে। ফলে অস্থিসন্ধির সচলতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তখন সিঁড়ি দিয়ে উঠতে বা হাঁটু মুড়ে বসতে কিংবা দ্রুত চলাফেরা করতে সমস্যা হয়। অনেকক্ষণ একটানা হাঁটলেও পায়ের ব্যথা শুরু হয়।

    আরও পড়ুন: স্তনবৃন্তে অস্বস্তি, লালচে দাগ! ব্রেস্ট ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ছে পুরুষদের! অজ্ঞতা ডেকে আনছে মৃত্যু

    কখনও হাঁটু, কখনও আঙুল, বাতের ব্যথার রকমফের

    চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিভিন্ন রকম বাতের ব্যথার উল্লেখ আছে। তবে আমাদের দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি কাবু অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে। অস্থিসন্ধির কার্টিলেজ ক্ষয়ে গিয়ে অস্টিওআর্থ্রাইটিসের সমস্যা শুরু হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে আবার অস্থিসন্ধির হাড়গুলো হালকা বেঁকেও যেতা পারে। সাধারণত মাঝবয়সী মহিলারা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বাতের ব্যথা প্রায় মহামারীর আকার নিয়েছে। চল্লিশ পেরিয়ে হাঁটুর ব্যথায় ভুগছেন এমন মহিলার দেখা পাওয়া যাবে প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই।

    রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস

    রিউমাটয়েড (Rheumatoid Arthritis)আর্থ্রাইটিস হানা দেয় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অতিসক্রিয় হয়ে উঠলে। এই অতিসক্রিয়তা অস্থিসন্ধির কার্টিলেজে প্রভাব ফেলে। কার্টিলেজ ক্ষয়ে বাতের ব্যথা শুরু হয়। রিউমাটয়েড আরর্থ্রাইটিস সাধারণত দেখা দেয় আঙুলের গাঁটে-গাঁটে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময় মনে হয় আঙুল অবশ হয়ে আছে। বেশিক্ষণ কাজ করলেও ব্যথা টনটনিয়ে ওঠে।

    আরও পড়ুন: 

    সুস্থ থাক নারীগর্ভ, পিছু হটো হিসটেরেকটমি, জানুন মেয়েরা কীভাবে সতর্ক থাকবেন

    এই শীতে ভাইরাল হেমোরেজিক জ্বরের ভয়, জানুন কোন কোন লক্ষণ দেখলেই ডাক্তারের কাছে যাবেন

    সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস

    সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস অনেকটা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো। হাঁটু এবং আঙুলের গাঁটে গাঁটে অসহ্য যন্ত্রণা, ব্যথার জায়গা ফুলে গরম হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। ব্যথার জায়গার চামড়ায় চুলকানি, র‍্যাশের মতো হতেও দেখা যায় অনেকের।

    সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিসের ব্যথা বেশি হয় গোড়ালির পিছন দিকে (Achilles tendinitis), পায়ের পাতায় (plantar fasciitis) । ডাক্তাররা বলেন, সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিসে গাঁটের ব্যথার পাশাপাশি পিঠে ও কোমড়ের নীচে ব্যথা হতেও দেখা যায়। স্পন্ডিলাইটিসের (spondylitis) ব্যথা শুরু হয় অনেকের ক্ষেত্রে।

    বিশেষজ্ঞরা বলেন, সোরিয়াসিস যাঁদের আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি অনেকটাই থাকে।  ক্ষয়ে যাওয়া নখ, হাতে সোরিয়াসিস থাকলে গাঁটে-গাঁটে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। ৩০ বছর থেকে ৫০ বছর বয়সীরা এই ধরনের আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত হন।

    আরও পড়ুন: সুখে থাক কিডনি, শরীরের ছাঁকনিকে সুস্থ রাখার সাত টোটকা

    বাতের ব্যথা দূর হটো— রেহাই মিলবে কীভাবে

    • বাতের ব্যথা একবার ধরে গেলে কিছু নিয়ম মানার জরুরি। যেমন বেশি সময় ধরে মাটিতে বসে না থাকা, ঘুম থেকে ওঠার সময় সটান সোজা হযে না উঠে সামান্য কাত হয়ে উঠলে ব্যথার ঝাপটা খেতে হয় না। ঝুঁকে বা দাঁড়িয়ে স্নান না করে টুলে বসে স্নান করা। একটানা কম্পিউটারে কাজ বা টিভি দেখা নৈব নৈব চ। কমোড ব্যবহার এবং অবশ্যই সরু ও উঁচু হিলের জুতো না পরা।

    • বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাড়ের সঠিক পুষ্টির অভাব ও জীবনযাত্রায় অনিয়ম এই ব্যথা আরও বেশি বাড়িয়ে তোলে। সুস্থ্য ও নিয়মমাফিক জীবনযাপনের বদলে অনেকেই হাঁটুতে অস্ত্রোপচার করিয়ে নিতে বেশি আগ্রহী। সবসময় যে অস্ত্রোপচারে দারুণ সাড়া মেলে এমনটাও নয়। রোজকার চলাফেরা, ওঠাবসায় কিছু বিধি-নিষেধ মানলেই ৯০% ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয় না।

    • ওষুধ খেয়ে বাতের ব্যথা থেকে রেহাই মেলে ঠিকই, তবে এর প্রভাব সাময়িক।  ওষুধের পাশাপাশি নিয়মিত ফিজিওথেরাপি করাতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম (অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের দেখানো) ও ফিজিওথেরাপি করলে অস্থিসন্ধি সচল থাকবে। ব্যথাও অনেকটা কমবে। তা ছাড়া ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখাটা খুবই জরুরি। ওজন বশে থাকলে অস্থিসন্ধির উপরে চাপ অনেকটাই কমে যাবে। ফলে অস্থিসন্ধির ভিতরে থাকা কার্টিলেজের আরও ক্ষয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কমে এবং ব্যথাও কমে যায়।

    • হাতের আঙুলে টান ধরলে বা ব্যথা থাকলে বিশেষজ্ঞরা অনেক সময়েই বললেন নিজের হাতে বাসন ধুতে। এতে হাতের আঙুল সচল থাকে। উষ্ণ গরম জলে এই কাজ করলে ফল আরও তাড়াতাড়ি মেলে।

    • চটজলদি ব্যথা থেকে আরাম পেতে ‘হট অ্যান্ড কোল্ড ওয়াটার ট্রিটমেন্ট’ খুবই কাজে দেয়। দুটো পাত্রের একটিতে বরফ দেওয়া ঠাণ্ডা জল ও অন্যটিতে গরম জল নিতে হবে। প্রথমে ব্যথার জায়গা ঠাণ্ডা জলে এক মিনিট ডুবিয়ে রেখে, পরে ৩০ সেকেন্ড গরম জলে ডুবিয়ে রাখতে হবে। এইভাবে ১৫-২০ মিনিট পর্যায়ক্রমে এই প্রক্রিয়া চালালে অনেকটাই আরাম মেলে।

    • কম্পিউটারে বসে কাজ করতে যাঁদের, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রতি একঘণ্টা অন্তর সিট ছেড়ে ওঠা উচিত। কখনও একটি পা, অন্যটির উপর চুলে রাখুন বা হাতের হালকা ব্যায়াম করে নিন সিটে বসেই। সারাক্ষণ অফিসের বন্ধ করে বন্দি না থেকে কিছুক্ষণ রোদে হেঁটে আসাও দরকার। তাতে গাঁটে বাত গ্যাঁট হয়ে বসতে পারে না।

    • খাবারের তালিকায় ওমেগা-থ্রি-ফ্যাটি অ্যাসিড থাকাটা খুবই জরুরি। জাঙ্ক ফুড, ভাজামশলা কম খান, তবে ওমেগা-থ্রি-ফ্যাটি অ্যাসিড যেন বাদ না যায়। ভিটামিন সি ডায়েটে রাখা দরকার আর বাদাম। আমন্ড, আখরোট, পেস্তা, বাদামে থাকে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিঙ্ক, ভিটামিন ই ও ফাইবার। অস্টিও ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি কমায়।

    • সাঁতার কাটাও ব্যথা কমাবার মোক্ষম উপায়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলের মধ্যে ভারশূন্য অবস্থায় পেশির ব্যথা অনেকটাই কমে।

    আরও পড়ুন: গলব্লাডারে স্টোন ঠেকানোর টোটকা, জানুন অপারেশনের পরে কী কী নিয়ম মানলে দ্রুত সেরে উঠবেন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More