এই শীতে ভাইরাল হেমোরেজিক জ্বরের ভয়, জানুন কোন কোন লক্ষণ দেখলেই ডাক্তারের কাছে যাবেন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: হেমন্তের হিমেল হাওয়াই জানান দেয় ঋতু বদলাচ্ছে। শীতের ইনিংস শুরু হওয়ার আগেই ঘরে ঘরে হানা দেয় সর্দি-কাশি, জ্বর। ফি বছর আমাদের রাজ্যে ডেঙ্গি ও ভাইরাল ফিভারে মৃত্যু হয় বহু মানুষের। জ্বরের প্রকারভেদে বদলে যায় চিকিৎসার পদ্ধতিও। অনেক সময়েই জ্বরের কারণ ও তার উপসর্গ বিচার করে কী ধরনের জ্বর সেটা বুঝতেই দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ডেঙ্গি জ্বর নাকি ডেঙ্গি হেমোরেজিক ফিভার, টাইফয়েড না ভাইরাল ফিভার, বুঝতে যতটা সময় যায়, সঠিক ওষুধ ও পথ্যের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই জ্বর মহামারীর আকার নেয়। চিকিৎসকরা বলেন, প্রতিটা জ্বরই একে অন্যের চেয়ে আলাদা। তার মধ্যে ভাইরাল ফিভার বহু রকমের, যাদের একত্রিতভাবে বলা হয় ভাইরাল হেমোরজিক ফিভার (Viral Hemorrhagic Fevers (VHFs))। আমাদের দেশ শুধু নয়, ভিএইচএফের দাপটে কাবু গোটা বিশ্ব।

     

    ভাইরাল হেমোরজিক ফিভার (VHF) কী?

    ভাইরাল হেমোরজিক ফিভার আসলে ভাইরাস ঘটিত সংক্রামক রোগ। মানুষের শরীর সরাসরি আক্রান্ত হয় ভাইরাসে অথবা পশুদের শরীর থেকে ভাইরাস হানা দেয় মানুষের শরীরে। সেটা খাদ্য বাহিত হয়ে হতে পারে অথবা কীটপতঙ্গ বা পরজীবী মারফৎ। এই ভাইরাল সংক্রমণের নেপথ্যে রয়েছে পাঁচ ধরনের আরএনএ ভাইরাসের গোষ্ঠী। এরেনাভিরিডি (Arenaviridae), ফিলোভিরিডি (Filoviridae) বুনিয়াভিরিডি (Bunyaviridae), ফ্ল্যাভিভিরিডি (Flaviviridae) ও র‍্যাবডোভিরিডি (Rhabdoviridae)


    উপরে বাঁ দিক থেকে, এরেনাভিরিডি, বুনিয়াভিরিডি, ফ্ল্যাভিভিরিডি ও ফ্ল্যাভিভিরিডি

    বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই আরএনএ ভাইরাসরা খুবই জটিল প্রকৃতির। এদের প্রভাব প্রাণঘাতীও হতে পারে। ভাইরাল জ্বরের সাধারণ উপসর্গ ঘুসঘুসে জ্বর, সর্দি-কাশি, মাথাব্যথা, মাংসপেশির ব্যথা এইসব কিছুকে সঙ্গে নিয়েই ভাইরাল হেমোরজিক ফিভার রক্তপাত, শরীরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল, র‍্যাশ, চোখ-নাক-মুখ থেকে রক্তক্ষরণ, এমনকি ব্রেন ডেডের মতো মারণ ব্যধির জন্ম দেয়। ডেঙ্গি হেমোরজিক ফিভার, ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ, হান্টাভাইরাস অর্থাৎ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান নেফ্রোপ্যাথিয়া এপিডেমিকা, হলুদ জ্বরের মতো রোগের কারণ ভিএইচএফ।

    হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম


    কী কী ভাইরাসের সংক্রমণ হতে পারে?

    এরেনাভিরিডি গোষ্ঠীর মধ্যে প্রাণঘাতী হতে পারে লাসা ফিভার (লাসা ভাইরাস), লুজো ভাইরাস, বলিভিয়ান (মাচুপো ভাইরাস), ভেনেজুয়েলান (গুয়ানারিটো ভাইরাস)।
    বুনিয়াভিরিডি গোষ্ঠীর মধ্যে হান্টাভাইরাস হেমোরজিক ফিভার (HV-HFRS), ক্রিমিয়ান-কঙ্গো হেমোরজিক ফিভার (CCHF)ভয়ের কারণ।
    ফিলোভিরিডি গোষ্ঠীতে ইবোলা ও মারবুর্গ ভাইরাস প্রাণঘাতী।
    ফ্ল্যাভিভিরিডি গোষ্ঠীতে ডেঙ্গি, হলুদ জ্বর, টিক-হর্ন এনসেফেলাইটিস ইত্যাদি।
    র‍্যাবডোভিরিডি গোষ্ঠীর ভাইরাসদের সংক্রমণ হয় মূলত কঙ্গোতে। তা ছাড়া আফ্রিকার নানা অংশে এই ভাইরাসের সংক্রমণে প্রতি বছর বহু মানুষের মৃত্যু হয়।

    ভিএইচএফের জ্বলন্ত উদাহরণ হল ডেঙ্গি হেমোরজিক ফিভার। আরএনএ ভাইরাস এডিস ইজিপ্টাই মশার দ্বারা বাহিত হয়ে মানুষের শরীরে ঢোকে। ভাইরাস প্রথমে মশার লালার মাধ্যমে ত্বকের ভিতরে প্রবেশ করে। পরে শ্বেত রক্তকোষে ঢোকে। সেই কোষ শরীরের সর্বত্র চলাচল করলে সেগুলির ভিতরে এই ভাইরাস প্রজনন চালিয়ে যায়। প্রবল সংক্রমণে শরীরের ভিতরে ভাইরাসের উৎপাদন অত্যধিক বৃদ্ধি পায়। যাদের ক্রনিক অসুখ, যেমন ডায়াবেটিস, অ্যাজমা, অ্যানিমিয়া, টিবি আছে তাদের এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গি প্রাণঘাতী হতে পারে। হেমোরেজিক ডেঙ্গু ফিভার হলে অবস্থাটা আরও জটিল আকার ধারণ করে। এই  জ্বরে শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে যেমন  চামড়ার নিচ, চোখের মধ্যে ও বাইরে, নাক, মুখ, দাঁতের মাড়ি কিংবা কফের সঙ্গে রক্তবমি হতে পারে।

    মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকায় মহামারীর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইবোলা ভাইরাস।  ১৯৭৬ সালে ইবোলা ভাইরাস প্রথম হানা দেয় আফ্রিকায়।ওই বছর মৃত্যু হয়েছিল ২৫১ জনের। আক্রান্ত প্রায় ৩১৮। ২০১৪-২০১৬ পর্যন্ত  শুধু গিনিতেই ইবোলায় আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছিল ২৫ হাজার। কঙ্গো, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, সুদান, গ্যাবন, উগান্ডা, লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওন ও নাইজেরিয়া সহ মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলিতে ইবোলায় মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা লক্ষাধিক। ২০১৪ সালে গিনি, লাইবেরিয়া, নাইজেরিয়া আর সিয়েরা লিওনেই শুধু ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছিলেন দু’হাজারের বেশি মানুষ। মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছিল প্রায় দেড় হাজারের কাছাকাছি।

    আরও পড়ুন: সুখে থাক কিডনি, শরীরের ছাঁকনিকে সুস্থ রাখার সাত টোটকা

    এই ভাইরাসের মূল বাহক এক প্রজাতির ফল-খেকো বাদুড়- টেরোপডিডাই। তারা ভাইরাসটি বহন করে, তবে নিজেরা আক্রান্ত হয় না। পরে ওই বাদুড় থেকে বিভিন্ন প্রাণীর দেহে রোগ সংক্রামিত হয়। আর কোনও ভাবে আক্রান্ত প্রাণীদের মাংস খেয়ে ফেললে বা সংস্পর্শে এলেই ইবোলা ভাইরাসটি চুপিসাড়ে ঢুকে পড়ে মানবদেহে। জ্বর ও রক্তক্ষরণ দিয়ে শুরু হয়। সেই সঙ্গে গায়ে ব্যথা, মাথার যন্ত্রণা, বমি, পেট খারাপ। ক্রমশ বিকল হতে শুরু করে লিভার, কিডনির মতো বিভিন্ন অঙ্গ। শেষে মৃত্যু ঘটে কোষের। হু-র রিপোর্ট অনুযায়ী, ইবোলায় আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর আশঙ্কা ৯০ শতাংশ।

    সতর্ক হবেন কীভাবে?

    ভাইরাল হেমোরজিক ফিভার ‘মান্টি অর্গান সিনড্রোম’-এর জন্য দায়ী। অর্থাৎ হার্ট, কিডনি, ফুসফুসের মতো শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলি আক্রান্ত হয়। শ্বাসজনিত সমস্যা দেখা দেয়, শরীরে রক্তপ্রবাহ বাধা পায়। অনেক সময় রোগী কোমায় চলে যেতে পারে। চিকিৎসকরা বলছেন, শীতে বাতাস ভারী থাকে। সেই কারণে বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস বাতাসের নীচের স্তরে নেমে আসে। এর ফলে মানুষের শরীরে চট করে ভাইরাস ঢুকে যায়। এর জন্য ভাইরাস জনিত রোগ শীতে বেশি হয়। ছোট বা বয়স্করা যাঁদের ইমিউনিটি ক্ষমতা কম তাঁরা সহজে আক্রান্ত হন। শিশুদের এইসময় ভাইরাল ডায়ারিয়াও হয়। টানা চার-পাঁচদিন জ্বর, দুর্বলতা, পেশির ব্যথা, কংজাংটিভাইটিস বা গাঁটে ব্যথা হলে সতর্ক হতে হবে। অনেক সময় ক্রনিক মাথা ব্যথা, পেট খারাপ সঙ্গে বমিও হতে পারে। বাড়াবাড়ি হলে খিঁচুনিও হতে পারে। তখন রক্ত পরীক্ষা করানো একান্ত প্রয়োজন।

    ডাক্তাররা বলছেন, জ্বর হলেই মুঠো মুঠো অ্যান্টিবায়োটিক নয়। আগে রক্ত পরীক্ষা করিযে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যখন-তখন ইচ্ছা মতো অ্যান্টিবায়োটিক নিতে নিতে শরীরে তৈরি হচ্ছে ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ বা ‘অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’ (এএমআর)। ফলে শুধু যে জ্বরের জীবাণুকে মারতে না পেরে তাকে ‘অজানা’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে তাই নয়, অন্যান্য অসুখের ক্ষেত্রেও চিকিৎসায় সমস্যা হচ্ছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More