লিভারে জমছে মেদ, জ্বালা ধরাচ্ছে সিরোসিস, রোগ সারবে নিয়ম মানলেই: ডক্টর প্রদীপ্ত শেঠি

প্রতিদিনের জীবনে লিভারকে ভাল রাখার উপায় কী? জটিল রোগ বাসা বাঁধছে কিনা বুঝবেন কী করে? ঠিক কোন সময় সতর্ক হতে হবে? আমজনতার জন্য সহজ করে লিখলেন সিনিয়র গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট ডাক্তার প্রদীপ্ত কুমার শেঠি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

ডক্টর প্রদীপ্ত কুমার শেঠি

(সিনিয়র গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট)

সেডেন্টারি লাইফস্টাইলে জীবনযাত্রার ধরন পাল্টাচ্ছে। অনবরত ছুটে চলা। এক মুহূর্ত থামার সময় নেই। কম ঘুম, নামমাত্র খাওয়া এবং কম শারীরিক পরিশ্রমে শরীরের যে অঙ্গটির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে তার নাম লিভার বা যকৃত। অথচ শরীরের পুষ্টি থেকে শক্তি সবেরই যোগান দেয় লিভার। মানব শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখার বড় দায়িত্বও রয়েছে এই অঙ্গের। আর মানুষ সবচেয়ে বেশি হেলাফেলা করে লিভারকেই। অনিয়মিত ডায়েট বা অতিরিক্ত তেল মশলাদার খাবারে মন না ভরলে, লাগামছাড়া অ্যালকোহলে লিভারের বারোটা বাজিয়ে দেয়। যার কারণেই নানা রোগ। শরীরে জ্বালাপোড়া প্রদাহ। রোগ প্রতিরোধ তলানিতে গিয়ে ঠেকে এবং ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা প্যাথোজেনের সংক্রমণ সহজেই বাসা বাঁধে শরীরে।

সুস্থ ও নীরোগ জীবনের জন্য লিভারকে ভাল রাখা সবচেয়ে আগে জরুরি। বিশেষত করোনাভাইরাস সংক্রমণের এই জটিল সময়ে যখন মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার ধরনে একটা বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রতিদিনের জীবনে লিভারকে ভাল রাখার উপায় কী?  জটিল রোগ বাসা বাঁধছে কিনা বুঝবেন কী করে? ঠিক কোন সময় সতর্ক হতে হবে? আমজনতার জন্য সহজ করে লিখলেন সিনিয়র গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট ডাক্তার প্রদীপ্ত কুমার শেঠি।

শুরুতেই বলি, লিভারের রোগ নিয়ে নানারকম ধারণা আছে মানুষের। লিভারের অসুখ মানেই অনেকে ভাবেন সব শেষ হয়ে গেল। অথচ সবসময় যে ভয়ের কারণ আছে তেমন নয়। রোগ হলে তাকে সারানো সম্ভব। সতর্ক থাকলে এবং রোজকার জীবনে কিছু নিয়ম মেনে চললে চিন্তার কারণ থাকে না।

লিভার কেন এত ভোগে

প্রধান কারণ সেডেন্টারি লাইফস্টাইল। সঠিক ডায়েট মেনে চলার কোনও ব্যাপার নেই। পুষ্টিকর খাবারের বদলে জাঙ্ক ফুড, তেল-মশলাদার খাবারেই রুচি বেশি। শরীরচর্চায় অনীহা। এবং অনেকের ক্ষেত্রে আরও একটা বড় কারণ হল মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহল। এইসবের কারণেই লিভারের নানা রোগ দেখা দেয় কম বয়স থেকেই। ফুসফুস যেমন শরীরে ছাঁকনির কাজ করে, দূষিত কার্বন ডাই অক্সাইড ছেঁকে বিশুদ্ধ অক্সিজেন পৌঁছে দেয় শরীরের ভেতরে, লিভারের কাজ তেমন শরীরের পুষ্টি ও শক্তি সঞ্চয়ের দিকটা খেয়াল রাখা। আমরা প্রতিদিন যা খাবার খাই তার থেকে পুষ্টিরস বার করে নিয়ে কোষে কোষে পৌঁছে দেওয়ার কাজ লিভারের। এই পুষ্টি থেকেই আসে শক্তি। তাতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। লিভারের আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল টক্সিন বার করে দেওয়া। কিন্তু যদি দেখা যায় খাবার বা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে এই টক্সিনই জমছে লিভারে তাহলেই বিপদের ঘণ্টা বেজে যায়।

লিভারের রোগের নানা কারণ আছে। মূলত চারটি কারণে লিভারের জটিল রোগ হতে পারে। এক, ফ্যাটি লিভার (Fatty Liver) অর্থাৎ লিভারে মেদ জমে যে রোগ হয়। অপুষ্টিকর, মশলাদার খাবার, অতিরিক্ত মদ্যপান সহ নানা কারণ এর জন্য দায়ী। দুই, অ্যালকোহলজনিত কারণ যাকে অ্যালকোহল রিলেটেড লিভার ডিজিজ  (ARLD) বলে। তিন, ভাইরাসের সংক্রমণ। হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের সংক্রমণে যে লিভারের রোগ হয় তাকে বলে ভাইরাল হেপাটাইটিস (Viral Hepatitis)। চার, কনজেনিটাল (Congenital Liver Defects) বা জন্মগত কারণে লিভারের রোগ হয়।

লিভারে যখন জমে মেদ

বর্তমান সময়ে লিভারের মেদ বা ফ্যাটি লিভার নিয়েই বেশি ভুগছেন মানুষ। এই রোগ চুপিসাড়ে আসে। কিন্তু শরীরকে নাজেহাল করে ছাড়ে। ভারত ও বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই ফ্যাটি লিভারের রোগ এখন সবচেয়ে বেশি। লিভারে মেদ জমতে পারে নানা কারণে। আসলে ফ্যাটি লিভার হল ‘লাইফস্টাইল ডিজিজ।’ অপুষ্টিকর তেল-মশলা-চর্বি দেওয়া খাবার খাওয়ার যদি অভ্যাস তৈরি হয়ে যায় তাহলে খাবারের সঙ্গে স্যাচুরেটেড ফ্যাট আর ট্রান্স ফ্যাট ঢুকতে থাকে শরীরে। চর্বির স্তর জমতে থাকে লিভারে। আরও একটা কারণ হল অ্যালকোহল।

মদ্যপান অনেকেই করেন। কিন্তু পরিমিতি বোধটা হারিয়ে গেলে মুশকিল। মাত্রাছাড়া মদ্যপান লিভারে ফ্যাট তৈরি করে। এই মেদের পরিমাণ অনেক বেশি বেড়ে গেলেই সমস্যা তৈরি হয়। লিভার যতটা ফ্যাট তৈরি করেছে আর যতটা খরচ করেছে তার মধ্যে যদি ভারসাম্য না থাকে তাহলে অতিরিক্ত ফ্যাট জাঁকিয়ে বসে লিভারে। রক্তের মাধ্যমে যা পেশীতে গিয়ে পৌঁছয়। এই ফ্যাটি লিভার হল জটিল লিভারের অসুখের প্রথম ধাপ। শুরুতে ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে সারানো সম্ভব। মনে রাখতে হবে, এটাই হল বিপদসঙ্কেত! এর পরবর্তী ধাপ ফাইব্রোসিস এবং অন্তিম পরিণতি সিরোসিস। লিভার ধ্বংসের শুরু হয় এই সিরোসিস থেকেই।

অ্যালকোহল যখন ‘ভিলেন’,  লিভার ‘ভিকটিম’

অ্যালকোহল আর লিভারের রোগের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান লিভারকে একটু একটু করে শেষ করতে থাকে। অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের যা অন্যতম কারণ। লিভার ফুলতে শুরু করে। প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশন হয়। এর পরের ধাপই হল লিভারের কোষে সিস্ট বা ফাইব্রোসিস। অ্যালকোহল জনিত লিভারের রোগ বা এআরএলডি-র আরও একটা পর্যায় হল অ্যাকিউট অ্যালকোহলিক হেপাটাইটিস। এর ফলে লিভারে প্রদাহ হতে থাকে। কোষে সিস্ট জমে ফাইব্রোসিস হয়। অনেক সময় এর থেকে হেপাটোসেলুলার কার্সিনোমা বা লিভারে ক্যানসারও দেখা দেয়।

ফ্যাটি লিভার থেকে সিরোসিস—রোগ জটিল হয় চার ধাপে

জেনে রাখবেন, লিভারের রোগের চারটি পর্যায়। নর্মাল বা সুস্থ লিভার, ফ্যাটি লিভার, ফাইব্রোসিস এবং শেষে সিরোসিস। এই সিরোসিস থেকেই আবার লিভারের ক্যানসারের ঝুঁকি থেকে যায়। ফ্যাটি লিভার দিয়ে রোগের সূচন হয়। ফ্যাটি লিভারও একদিন বা দু’দিনে হয় না। টানা চার থেকে পাঁচ বছর যদি ক্রমাগত লিভারের উপর চাপ পড়তে থাকে তাহলে এই রোগের সূত্রপাত হয়। লিভারে মেদ জমতে জমতে এর কোষে সিস্ট জমতে থাকে। সারা লিভারে দগদগে দাগ দেখা যায়। প্রদাহ শুরু হয়। লিভার দুর্বল হতে থাকে। এরই শেষ পর্যায় হল লিভার সিরোসিস। যাকে আমরা, চিকিৎসকরা বলি ‘অ্যাডভান্সড লিভার ডিজিজ’।

সিরোসিস হলে লিভার শক্ত হয়ে যায়। জল জমতে শুরু করে ফলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। লিভারের ভেতরের রক্তনালীগুলো ফেটে যায়। সিরোসিস হলে খাদ্যনালীর ভেতরেও রক্তপাত শুরু হয়ে যায় রোগীর। রক্তবমি হতে শুরু করে। এ ক্ষেত্রে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করার প্রয়োজন হয়।

এখানে জানিয়ে রাখা ভাল যে, লিভার সিরোসিস মানেই অবধারিত মৃত্যু তা কিন্তু নয়। কিছু লিভার সাপোর্টিং ওষুধ আছে। হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস থেকেও লিভার সিরোসিস হয়। সেক্ষেত্রেও চিকিৎসা আছে। তবে এই রোগ সারাবার সবচেয়ে বড় রাস্তা হল খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অতিরিক্ত মদ্যপান বন্ধ করা। পুষ্টিকর ডায়েট এবং নিয়ম করে শরীরচর্চা করা।

বিপদে লিভার! কখন সতর্ক হতে হবে

লিভারের সব রোগই চুপিচুপি আসে। ফ্যাটি লিভারও আগাম বোঝার তেমন কোনও উপায় নেই। তবে কিছু সাধারণ উপসর্গ আছে যেগুলি দেখে সতর্ক হওয়া যায়। হঠাৎ করে খিদে কমে যাওয়া, বমিভাব, ঝিমুনি আসা, দুর্বলভাব যদি একটানা চলতেই থাকে তাহলে সতর্ক হতে হবে। লিভারের ক্ষত বাড়লে বা সিরোসিসের পর্যায়ে চলে এলে জ্বালাপোড়ার মতো ব্যথা হয়, রক্তবমি হতে পারে। তাছাড়া জন্ডিস, ডায়ারিয়া, ঘুমের সমস্যা এগুলোও লক্ষণ হতে পারে। ইউএসজি করাতে গিয়ে অনেকেরই ফ্যাটি লিভার ধরা পড়ে। সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ফ্যাটি লিভারে বিপদের সম্ভাবনা তেমন থাকে না। কিন্তু এই রোগকে পুষে রাখলেই বিপদ। কারণ আগেই বলেছি, ফ্যাটি লিভারেরই বাড়বাড়ন্ত হয়ে ফাইব্রোসিস ও সিরোসিসের পর্যায় চলে যায়। তখন বিপদের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়। তাই শুরু থেকেই যদি ট্রিটমেন্ট করা যায় তাহলে লিভারের রোগ সারানো সম্ভব। তাছাড়া লাইফস্টাইলে বদল আনাও দরকার।

হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস থেকে সাবধান

অ্যালকোহল না খেলেও লিভারের রোগ হতে পারে। যাকে ‘নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’ (NAFLD) বলে। এক্ষেত্রে বংশগত কোনও ক্রনিক রোগ, কিডনির রোগ, ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, থাইরয়েড, উচ্চরক্তচাপ নানা রকম কারণ দায়ী। ওবেসিটি বা স্থূলত্বও নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের অন্যতম কারণ। এক্ষেত্রে চোখ ও ত্বকের রঙ হলদেটে হয়ে যেতে পারে, জন্ডিস হতে পারে রোগীর, ডায়ারিয়া, পেটে যন্ত্রণা, হাত-পায়ের পেশীতে ব্যথা এই রোগের কিছু সাধারণ উপসর্গ।

তা ছাড়া চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিভিন্ন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকেও লিভারের রোগ হয়। জন্মগত অসুখের কারণেও লিভারের সমস্যা হতে পারে। যেমন বিলিয়ারি আর্টেসিয়া (Biliary Artesia), বিলিয়ারি সিস্ট (Biliary Cyst)ইত্যাদি । এক্ষেত্রে জন্মের পরেই শিশুর পিত্তথলি পরিপুষ্টি হয় না। ফলে রোগ বাসা বাঁধে শৈশবেই।

করোনা কালেও ভাল থাক লিভার

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ লিভারেও ছড়াচ্ছে। এর কারণ সেই একই, দুর্বল লিভার। ভাইরাসের সংক্রমণ যেমন রোগের কারণ তেমনি বিভিন্ন অ্যান্টি-ভাইরাল বা অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও লিভারের রোগ হচ্ছে। তবে এই রোগ সারিয়ে তোলা সম্ভব।

লিভারকে সুস্থ ও তরতাজা রাখার প্রধান ও প্রাথমিক শর্তগুলোই হল সঠিক ডায়েট, অ্যালকোহল থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকা, নিয়মিত এক্সারসাইজ করা এবং স্ট্রেস-ফ্রি থাকার চেষ্টা করা। ভাজা-তেলমশলা-ফাস্টফুড বন্ধ করে ঘরে তৈরি খাবার খেলে সবচেয়ে ভাল। ফ্যাটি লিভার ঠেকাতে লো ক্যালরি ডায়েট দরকার। বেশি করে শাকসব্জি, ফল রাখতে হবে ডায়েটে। ভিটামিন, মিনারেলস সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। ওজন কমানো দরকার। ফ্যাটি লিভারে রোগীর বিএমআই (বডি-মাস-ইনডেক্স) বেশি থাকলে বিপদ। স্থূলত্ব কমানোর জন্য নিয়মিত এক্সারসাইজ দরকার। সহজ করে বলতে গেলে মোদ্দা কথা হল, শরীরকে খাটাতে হবে। পরিশ্রম না করলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে না শরীর। তখন নানানটা রোগ এসে ধরা দেবে। লিভারই হবে তাদের প্রথম টার্গেট।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More