সুখে থাক হৃদয়, স্মার্ট ডায়েটে কাছে ঘেঁষবে না হার্টের রোগ

সেডেন্টারি লাইফস্টাইলেও সুস্থ, চনমনে থাকতে ফাস্ট ফুডকে বলতে হবে গুডবাই। জাঙ্ক ফুড বা বাজারচলতি যে কোনও প্যাকেটজাত খাবার, রেডমিট একেবারেই নয়। হার্ট সুস্থ রাখতে ট্রাইগ্লিসারাইড, কোলেস্টেরলকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: রেড ওয়াইনে লম্বা চুমুক দিয়ে কালো বেরি মুখে পোরার মধ্যে কোনও রাজকীয় বিলাসিতা নেই। বরং হার্ট ভাল থাকবে স্মার্ট ফুডেই। স্রেফ শরীরচর্চা বা হাঁটাহাঁটিতেই জব্দ হবে হার্টের রোগ, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। শরীরকে যতই খাটাও, তাকে ঠিকমতো পুষ্টি দিতে না পারলে সব পরিশ্রমই বৃথা। এক ঘণ্টা ঘাম ঝরানো ওয়ার্কআউটের পরে যদি একটা বড় চিজ বার্গারে কামড় বসিয়ে ভাবা যায়, কী আর হবে! ক্যালরি তো ঝরে গেছে, তাহলে বড় ভুল সে ভাবনা। গাদা গাদা ফ্যাট, মাখন-মেয়োনিজ-চিজ চপচপে খাবার, প্রিজারভেটিভ ও অতিরিক্ত চিনি মেশানো সফট ড্রিঙ্কস থেকেই কিন্তু চড়চড়িয়ে বাড়ছে মেদ। আর স্থূলত্ব থেকে হার্টের অসুখ, ফ্যাটি লিভার, ডায়াবেটিস, রোগ হানা দিচ্ছে বয়ঃসন্ধিতেও। তাই শরীরচর্চার পাশাপাশি খাবার পাতেও রাখতে হবে নজর।

সেডেন্টারি লাইফস্টাইলেও সুস্থ, চনমনে থাকতে ফাস্ট ফুডকে বলতে হবে গুডবাই। জাঙ্ক ফুড বা বাজারচলতি যে কোনও প্যাকেটজাত খাবার, রেডমিট একেবারেই নয়। হার্ট সুস্থ রাখতে ট্রাইগ্লিসারাইড, কোলেস্টেরলকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।

হার্টের ক্ষেত্রে প্রধান ছ’টি রিস্ক ফ্যাক্টর হল— ওবেসিটি, ডায়াবিটিস, হাইপার টেনশন বা হাই ব্লাডপ্রেশার, হাই ট্রাইগ্লিসারাইড, ধূমপানের অভ্যেস এবং ক্রনিক হার্টের অসুখ বা বংশগত হার্টের অসুখের ইতিহাস।  এদের মধ্যে ডায়াবিটিস, ব্লাডপ্রেশার এবং ট্রাইগ্লিসারাইড এই তিন রিস্ক ফ্যাক্টরকে বশে রাখতে হলে লাইফস্টাইলে বদল দরকার। তার জন্য চাই সঠিক ডায়েট। তবে ডায়েট মানে কিন্তু কম খাওয়া নয়, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতো মেপে পুষ্টিকর খাবার নিত্যদিতের তালিকায় রাখতে হবে। তার মধ্যে যেমন থাকবে সবুজ শাকসব্জি, তেমনি রাখতে হবে ফল, মাছ, ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার। লাগামছাড়া অ্যালকোহলে রাশ টেনে পরিমাণ মতো রেড ওয়াইন রাখা যেতে পারে। চকোলেট-বিলাসী হলে দুধ-মাখন-বাদামের মুচমুচে ক্যাডবেরি বাদ দিয়ে ডার্ক চকোলেটকেই আপন করে নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হার্ট ভাল রাখা মানেই কোনও বিশাল ডায়েট চার্ট মানতে হবে তা একেবারেই নয়। রোজকার ঘরের খাবারই থাকবে, তার সঙ্গে কিছু বাছা ফল, সব্জি ইত্যাদি নিয়ম মেনে ডায়েটে রাখলে ভাল ফল মিলবে। যেমন চর্বি দেওয়া রেওয়াজি মাংসের বদলে যদি হাল্কা লিন মিট রাখা যায় তাহলে ভাল। আসলে বাঙালির রসনা মানেই ঝালে-ঝোলে-অম্বলে একটা রসালো ব্যাপার। তাতে জিভের স্বাদ পূরণ হবে ঠিকই, কিন্তু হার্ট প্রতিবাদ করতে পারে। তাই হৃদয়কে সুস্থ ও চনমনে রাখতে কিছু নিয়ম মানতেই হবে।

এখন দেখে নেওয়া যাক কী কী খাবারে খুশি হবে হৃদয়—

° প্রথমেই আসা যাক মাছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্যামন, টুনা, ট্রাউট মাছে প্রচুর ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। স্যামন মাছ তো এখানে মেলা কঠিন। তাই যে মাছে মন ভরে, সেই মাছই থাক। তবে একগাদা তেল-মশলা দিয়ে কালিয়া খাওয়ার ঝোঁক কমিয়ে বরং হাল্কা মাছের ঝোলেই মন ভরুক। তাতে পেটও ভাল থাকবে আর হার্টও। সি-ফুড পছন্দ হলে চিংড়ি, কাঁকড়া, স্কুইড খাওয়া যেতেই পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন,  সামুদ্রিক মাছের মধ্যে থাকে প্রচুর পরিমাণ ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। এই উপাদান রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড বা ফ্যাটের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। মস্তিষ্ককেও সজীব রাখে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। মস্তিষ্কে সিরোটোনিন, ডোপামাইন হরমোনের ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে। তাই মাছ খেলে মানসিক স্বাস্থ্যও ভাল থাকে। অবসাদের ঝুঁকি কমে।

° বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাদাম খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি নাকি ৪০ শতাংশ কমে যায়। আমন্ড বা ওয়ালনাট ও আখরোট দু’রকম বাদামই উপকারি। অনেকের ধারণা বাদাম মেদ বাড়ায়। কিন্তু নিউট্রিশনিস্টরা বলেন, নিয়ম করে পরিমাপ মতো বাদাম ও ড্রাই ফ্রুটস খেলে বরং ওজন কমে। হজমশক্তি বাড়ে, লিপিড স্তর নিয়ন্ত্রণে থাকে। বাদাম খারাপ কোলেস্টেরলকে ভাল কোলেস্টেরলে বদলে দেয় ফলে হার্টের অসুখের ঝুঁকি কমে।

° বেরি জাতীয় ফল হার্ট ভাল রাখে তাই নয়, শরীরের জন্য খুব উপকারি। এতে থাকে ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস ও ফাইবার। স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, ব্ল্যাকবেরি নিয়ম করে খেলে উপকার মেলে। বিশেষজ্ঞরা ওজন কমানোর জন্য টক দইয়ের সঙ্গে বেরি জাতীয় ফল খেতে বলেন। এতে কাজ হয় খুব তাড়াতাড়ি। বিশেষত, ব্লুবেরি আর ইয়োগার্ট দুটোই অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর খাবার। অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট থাকার জন্য ব্লুবেরি যেমন শরীরের জন্য উপকারি, তেমনই ইয়োগার্ট ওজন কম রাখতে সাহায্য করে।

° গবেষণায় দেখা গেছে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড যাঁরা কম খান, তাঁদের মুড ডিসঅর্ডারের সম্ভাবনা বেশি। তাই সপ্তাহে অন্তত কয়েকটা দিন সয়াবিন, তিষির বীজ, চিয়া বীজ এগুলো ডায়েটে রাখা ভাল। তিষি বীজে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, ফাইবার, ফাইটোইস্টোজেন থাকে। চিয়া বীজে প্রচুর প্রোটিন ও ফাইবার থাকে।

° করোনা কালে শরীরে রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়ানো সবচেয়ে আগে দরকার। তাই প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেলস সমৃদ্ধ খাবার বেশি খেতে হবে। ওটসে এই সবই একসঙ্গে মেলে। ভিটামিনও থাকে, মিনারেলসের মধ্যে ম্যাঙ্গানিজ, জিঙ্ক, তামা, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রনও থাকে আবার অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট ও ফাইবারও ভরপুর থাকে। নিউট্রিশনিস্টরা ওটসকে পারফেক্ট ডায়েট ফুড বলেন।

° বেশিরভাগ ভারতীয় মহিলাই রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ায় ভোগেন। বিশেষজ্ঞরা তাই আয়রনে ভরপুর খাবার বেশি খেতে বলেন। কিডনি বিনস সেক্ষেত্রে উপকারি। এতে যেমন হার্ট ভাল রাখার রসদ রয়েছে তেমনি রক্তাল্পতা দূর করতেও উপকারি। কিডনি বিনস কোলেস্টেরল নিযন্ত্রণে রাখে। শরীরে আয়রনের ঘাটতি পূরণ করে।

° রেড মিট বা প্রসেসড মিটের বদলে ভরসা থাক লিন মিটে। প্রায় সব ধরনের হোয়াইট মিট পড়ে লিন মিটের পর্যায়ে। এর মধ্যে রয়েছে পোলট্রি ও মাছও। চিকেন ছাড়াও লিন প্রোটিনের অন্যতম উৎস মাছ। প্রোটিনের পাশাপাশি মাছে রয়েছে ভিটামিন ডি ও ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড যা মস্তিষ্ককে তরতাজা রাখতে সাহায্য করে। লিন মিটে কোলেস্টেরল ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণও অনেক কম।

° লাগামছাড়া অ্যালকোহলে ফ্যাটি লিভারকে নিমন্ত্রণ না পাঠিয়ে বরং দিনে এক পেগ রেড ওয়াইনে মন ভরুক। রেড ওয়াইনের গুণাগুণের কথা একবাক্যে স্বীকার করেন চিকিৎসকরাও। তবে অবশ্যই নিয়ম মেনে খেতে হবে। বিলাসিতা নয় বরং শরীরে কথা মাথায় রাখলেই উপকার মিলবে। রেড ওয়াইনে থাকে ফ্ল্যাভোনয়েডস যা সংক্রমণঘটিত রোগ থেকে শরীরকে বাঁচায়। রেসভেরাট্রলের মতো অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট থাকে যা কার্ডিওভাস্কুলার রোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। মানসিক অবসাদ, স্ট্রেস দূর করতেও রেড ওয়াইন উপকারি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও কমায় রেড ওয়াইন।

° প্রচণ্ড খিদের মুখে হাই ক্যালোরি ভাজা বা প্রসেসড ফুডের আসক্তি বাড়ে৷ ভাজাভুজি না খেয়ে মন শক্ত রেখে ডায়েটে থাক পুষ্টিকর খাবার। খাবারের মোট ক্যালোরির ২৫ শতাংশ প্রোটিন থেকে এলে ভুলভাল খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়। শাকসবজি, ফল, ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার থেকেই এই পুষ্টি মেলে।

° এই করোনা কালে সবকিছুকেই কোভিডের সঙ্গে যোগ বিয়োগ করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। সে ডাক্তার হোক বা বিজ্ঞানী, কিসে যাবে করোনা সেটাই এখন মাথাব্যথার কারণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের প্রভাব হার্টেও পড়ছে। তাই ভিটামিন সি সমৃদ্ধ সব্জি বা ফল ডায়েটে রাখলে উপকার পাওয়া যাবে। অ্যাসকরবিক অ্যাসিড বা ভিটামিন সি যে শরীরের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসেবে কাজ করে। লিম্ফোসাইট বা শ্বেতকণিকার সংখ্যা বাড়িয়ে যে কোনও রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

° চকোলেট প্রেমীদের জন্য এটা বিশেষ সতর্কবার্তা। চকোলেট থাক, তবে একগাদা দুধ-মাখনের নয়, ফ্রিজে উঠুক ডার্ক চকোলেট। আসলে চকোলেটে প্রচুর চিনি ও ফ্যাট বাড়ানোর উপাদান থাকে, তাই ডাক্তাররা একটু মানা করেন। কিন্তু ডার্ক চকোলেটে এত ঝামেলা নেই। শরীরের জন্যও কার্যকর। ডার্ক চকোলেট যেমন শরীরে ফ্রি র‍্যাডিকালসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে তেমনি এর অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট রোগ প্রতিরোধেও সাহায্য করে। আবার মানসিক অবসাদ, স্ট্রেস কমাতেও ডার্ক চকোলেটের বিশেষ ভূমিকা আছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More