কোভিড ঝুঁকিতে শিশুরাও, সংক্রমণে নানা অঙ্গে রোগ, কাওয়াসাকির ভয়ও কি আছে, বুঝিয়ে বললেন বিশেষজ্ঞ

সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, প্রবীণরা শুধু নয় কমবয়সী এমনকি শিশুদেরও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কোনও অংশেই কম নয়। এখন শিশুদের শরীরে ভাইরাস সংক্রমণের প্রভাব কেমন এবং কতটা হবে সেটাই গবেষণার বিষয়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সঞ্জীব আচার্য

    কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

    পুরুষ হোক বা নারী, বয়স যাই হোক না কেন, কোভিড সংক্রমণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না কেউই। এই মারণ ভাইরাস তার চরিত্র এমনভাবে বদলাচ্ছে যে রোগের ধরনে যেমন বদল আসছে তেমনি রোগের উপসর্গেও দেখা যাচ্ছে নানা রকমের পরিবর্তন। একসময় গবেষকরা বলেছিলেন, ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ ব্যক্তিদের ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। বিশেষত যদি হাইপারটেনশন, কার্ডিওভাস্কুলার রোগ, কিডনি বা ফুসফুসের ক্রনিক রোগ থাকে, তাহলে সংক্রমণ ধরতে বেশি সময় লাগবে না। তবে যত দিন যাচ্ছে গবেষণার তথ্যেও নতুন নতুন সংযোজন হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণও পাল্টাচ্ছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, প্রবীণরা শুধু নয় কমবয়সী এমনকি শিশুদেরও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কোনও অংশেই কম নয়। এখন শিশুদের শরীরে ভাইরাস সংক্রমণের প্রভাব কেমন এবং কতটা হবে সেটাই গবেষণার বিষয়।

    বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতে দেখা যাচ্ছিল বাচ্চাদের শরীরে ভাইরাস পজিটিভ হলেও সংক্রমণ মৃদু। তবে ইদানীং শিশুদের শরীরেও এমন কিছু উপসর্গ দেখা যাচ্ছে যা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ভাইরাসের সংক্রমণ থেকেই জন্ম নিচ্ছে অন্যান্য রোগ, তার নানা লক্ষণ।

    ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বেশ কিছু কোভিড পজিটিভ শিশুর শারীরিক অবস্থা এমন সঙ্কটজনক পর্যায়ে পৌঁছয় যে তাদের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করতে হয়। গবেষকদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ভাইরাস সংক্রামিত হওয়ার পরে মাল্টি-সিস্টেম ইনফ্ল্যামেটরি সিন্ড্রোমে (Multi-System Inflammatory Syndrome)আক্রান্ত হয়েছে শিশুরা।


    করোনায় কীভাবে মাল্টি-সিস্টেম ইনফ্ল্যামেটরি সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা

    মাল্টি-সিস্টেম মানেই শরীরের নানা অঙ্গ আক্রান্ত হচ্ছে ভাইরাসের সংক্রমণে। ফুসফুসের সংক্রমণ তো বটেই, হার্ট, লিভার, কিডনি, খাদ্যনালীতেও দেখা যাচ্ছে সংক্রমণ। ইনফ্ল্যামেশন মানেই প্রদাহ, আর করোনার সংক্রমণ হলে দেহকোষে সাইটোকাইন প্রোটিনের মাত্রা বেড়ে গিয়ে তীব্র প্রদাহজনিত রোগ তৈরি হচ্ছে শরীরে। যাকে বলে ‘সাইটোকাইন স্টর্ম।’ গবেষকরা বলছেন, প্রাপ্তবয়স্করা যেমন এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তেমনি শিশুরাও। এর নানা কারণ হতে পারে।

    বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মানুষের দেহকোষের বাহক বা রিসেপটর প্রোটিনের (Receptor Protein) সঙ্গে জোট বেঁধে সার্স-কভ-২ ভাইরাল স্ট্রেনের স্পাইক প্রোটিন দেহকোষে ঢুকে পড়ছে। এই ভাইরাল প্রোটিনই শরীরে সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য দায়ী। যে বাহক প্রোটিনকে তারা কোষে ঢোকার রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করছে সেই ACE-2 প্রোটিন নানা অঙ্গের কোষেই থাকতে পারে। সুতরাং শরীরে যেসব অঙ্গের কোষে এই বাহক প্রোটিনকে চিহ্নিত করতে পারবে ভাইরাস, সেখানেই পৌঁছে গিয়ে কোষে ঢুকে সংখ্যায় বাড়তে থাকবে। বিজ্ঞানীদের অনুমান হার্ট, লিভার, কিডনি, খাদ্যনালীর কোষেও এই বাহক প্রোটিনকে খুঁজে পেয়েছে সার্স-কভ-২। তাই শুধু ফুসফুস নয়, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ আক্রান্ত হচ্ছে ভাইরাসের সংক্রমণে।

     

    মাল্টি-সিস্টেম ইনফ্ল্যামেটরি সিন্ড্রোমের কী কী উপসর্গ দেখে সতর্ক হতে হবে?

    ইউরোপ ও আমেরিকার নানা জায়গায় কোভিড পজিটিভ ৩৪৫টি শিশুকে পরীক্ষা করে ডাক্তাররা জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে ২৩% শিশুই ফুসফুসের সংক্রমণ, হাঁপানি ও কার্ডিওভাস্কুলার রোগে আক্রান্ত হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে জ্বর, পেটে ব্যথা, বমিভাব, পেট খারাপের উপসর্গ দেখা গিয়েছে। ধীরে ধীরে তীব্র শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, ঝিমুনি, চোখ ফুলে যাওয়া, ত্বকের রঙে বদল এমনকি হাতে-পায়ে জ্বালাপোড়া ক্ষত, লালচে র‍্যাশও দেখা গেছে অনেকের শরীরে।

    সংক্রমণ গভীরে ছড়িয়ে পড়লে শ্বাসের সমস্যা বেড়েছে। সেই সঙ্গে বুকে চাপ, ব্যথা দেখা দিয়েছে শিশুদের। অনেকের ঠোঁটে নীলচে ছোপ পড়তেও দেখা গেছে, সেই সঙ্গে অসহ্য পেটে যন্ত্রণা। আইসিইউতে ভর্তি করে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দিতে হয়েছ অনেককেই।

    শিশুদের উপর করোনার প্রভাব কতটা এবং কেমন হতে পারে সেই সংক্রান্ত গবেষণার রিপোর্ট প্রকাশিত হয় আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালে।  চিন ও সিঙ্গাপুরের বিজ্ঞানীরা ১০৬৫ জন শিশুর উপর সমীক্ষা চালিয়ে মোট ১৮টি গবেষণার রিপোর্ট সামনে আনেন। সেইসব রিপোর্টে বলা হয়, বেশিরভাগ শিশুদের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে সংক্রমণ মৃদু। হাল্কা জ্বর বা সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ রয়েছে। কারও ক্ষেত্রে আবার মাথা ব্যথা, পেটের সমস্যা, ঝিমুনিভাবও দেখা গেছে। এমন উপসর্গ দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কয়েকটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে শিশু বা কম বয়সীরা কোভিড সংক্রমণের কারণে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। চিন ও ইতালিতে অনেক শিশুর মধ্যেই এমন সংক্রমণ দেখা গেছে। আবার অনেক বাচ্চার কোভিড সংক্রমণ ধরা পড়ার আগে পায়ের ত্বকে ঘা, লালচে-বাদামি র‍্যাশ দেখা গেছে। ডার্মাটোলজিস্টরা বলেছেন, এমন উপসর্গ দেখলেই সতর্ক হতে হবে, কারণ এটাই হল বিপদসঙ্কেত। কারণ এর পরের পর্যায়তেই সংক্রমণ আরও মারাত্মক হয়ে ছড়িয়ে পড়বে শরীরে।

    কাওয়াসাকি নয়তো?

    নিউ ইয়র্কের অনেক শিশুর শরীরেই কাওয়াসাকির মতো উপসর্গ দেখা গেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই শিশুরা সকলেই কোভিড পজিটিভ। কাওয়াসাকি (Kawasaki Disease) হল সিন্ড্রোম যা মূলত শিশু ও কম বয়সীদের শরীরেই হানা দেয়। এই রোগ খুবই বিরল। ডাক্তারদের সমীক্ষা বলে বছরে ১০০ জন শিশুর মধ্যে হয়তো একজনের শরীরে ধরা পড়ে। এই রোগের প্রকৃত কারণ আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। কাওয়াসাকিকে বলা হয় ‘অটোইনফ্লামেটরি ভাসকুলিটিজ’ যেখানে শরীরে তীব্র প্রদাহ শুরু হয়। আক্রান্ত হতে পারে হার্ট। শরীরে রক্ত চলাচল বাধা পায়। কাওয়াসাকি রোগে হার্ট অ্যাটাক সাধারণত হয় না, কিন্তু যদি দীর্ঘসময় এই রোগের চিকিৎসা না হয় তাহলে হার্টের ধমনী ব্লক হয়ে শরীরে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে।

    বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাওয়াসাকিতে শিশুদের মুখ, জিভ ও ত্বকের রঙে বদল দেখা দেয়। চামড়া ফ্যাকাসে হয়ে যায়, না হলে লাল র‍্যাশ দেখা দেয় সারা শরীরে। অনেক শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগের কারণে ত্বকের রঙে নীলচে ছোপ পড়তেও দেখা গেছে। সেই সঙ্গে ঝিমুনি, শরীরে অস্বস্তি, প্রস্রাবের সমস্যাও দেখা দিয়েছে। কাওয়াসাকিতে যদি হার্ট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাহলে বুকে ব্যথা শুরু হয়, হৃদস্পন্দন থেমেও যেতে পারে। এমন উপসর্গ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। শুরুতেই রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসায় সারানো সম্ভব।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More