চোখ-কান দিয়ে কি ঢুকতে পারে করোনা! চোখের জলেও নাকি ছড়াচ্ছে ভাইরাস, কীভাবে বললেন বিশেষজ্ঞ

এই ভাইরাস শরীরে ঢুকবে কেমন করে? নাক, কান, গলা, চোখ, মুখ, ত্বক—মানুষের শরীরে আপাতভাবে এই কয়েকটা সহজ এন্ট্রি পয়েন্ট রয়েছে। তবে ভাইরাস কিন্তু সব পথে শরীরে ঢুকতে স্বচ্ছন্দ নয়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সঞ্জীব আচার্য

    কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

    করোনা এমন এক ছোঁয়াচে ভাইরাস যার ধারেকাছে গেলেই খপাৎ করে শরীরে ঢুকে পড়বে। বিজ্ঞানীরা তাই পই পই করে বলছেন, রেসপিরেটারি ড্রপলেট থেকে সাবধান। অর্থাৎ করোনা রোগীর থুতু, হাঁচি বা লালাকে আধার বানিয়ে তার মধ্যে চেপেই ভাইরাস এক শরীর থেকে অন্য শরীরে চলে যেতে পারে। এই রেসপিরেটারি ড্রপলেট হল ভাইরাসের চলাফেরা করার সহজ রুট। এখন প্রশ্ন হল, এই ভাইরাস শরীরে ঢুকবে কেমন করে? নাক, কান, গলা, চোখ, মুখ, ত্বক—মানুষের শরীরে আপাতভাবে এই কয়েকটা সহজ এন্ট্রি পয়েন্ট রয়েছে। তবে ভাইরাস কিন্তু সব পথে শরীরে ঢুকতে স্বচ্ছন্দ নয়। তাদের বেছে নেওয়া কয়েকটা নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে যেখান দিয়েই তারা মানুষের শরীরে ঢোকার রাস্তা খুঁজে পেয়েছে।

    প্রথমেই বলতে হয় নাক। ভাইরাসের বিশেষ পছন্দের জায়গা যেখান দিয়ে নিমেষে তারা শরীরে ঢুকে পড়তে পারে। এরপরে রয়েছে মুখ। এটাও ভাইরাসের অত্যন্ত সহজ এক এন্ট্রি-পয়েন্ট। মুখ বা নাকের কোষ, শ্লেষ্মা মানেই সড়সড়িয়ে ভাইরাস ঢুকে যেতে পারবে শরীরে। তাদের বাধা দেওয়ার কেউ থাকবে না। এখন যে প্রশ্নটা ঘুরুপাক খাচ্ছে সেটা হল চোখ আর কানের মধ্যে দিয়েও কি ভাইরাস ঢুকতে পারে?

    গবেষকরা বলছেন চোখের মধ্যে দিয়ে ভাইরাল স্ট্রেন ঢুকতে পারে তবে কানের মধ্যে দিয়ে একেবারেই নয়। এই ব্যাপারে মার্কিন সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর বিশেষজ্ঞদের একটা মতামত রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, মানুষের বহিঃকর্ণের কোষ ত্বকের কোষের মতোই। স্কিন বা ত্বকের মধ্যে দিয়ে যেমন ভাইরাস ঢুকতে পারে না, তেমনি কানের মধ্যে দিয়েও ভাইরাসের ঢোকার  কোনও পথ নেই। তবে চোখের মধ্যে দিয়ে ভাইরাস ঢুকতে পারে, প্রত্যক্ষভাবে নয় তবে পরোক্ষভাবে।

     

    চোখের জলে ছড়াতে পারে করোনা?

    বস্টনের ম্যাসাচুসেটস আই অ্যান্ড ইয়ার-এর ডাক্তার বেঞ্জামিন ব্লেয়ারের মতে, চোখেতে ভাইরাস ঢুকতে পারে পরোক্ষভাবে। সেটা কী করে? ধরা যাক, রেসপিরেটারি ড্রপলেট জমে আছে এমন কোনও পদার্থ বা সারফেসে হাত লেগেছে এবার সেই হাত না ধুয়েই বার বার চোখে, মুখে ঘষলে, ভাইরাস সহজেই ঢুকে পড়বে শরীরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হাত না ধুয়ে চোখ ঘষা বা বারে বারে চোখে হাত দেওয়ার অভ্যাস অনেকেরই আছে। এভাবেই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।

    আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব অপথ্যালমোলজি-র বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চোখের জলের মাধ্যমেও ভাইরাস ছড়াতে পারে। চোখের জলও ড্রপলেট হিসেবে কাজ করতে পারে যাকে আধার বানিয়ে ভাইরাস এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেই কারণেই করোনা রোগীদের চিকিৎসা করছেন বা দেখাশোনা করছেন এমন ডাক্তার, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীরা ফেস-শিল্ড বা ফেস-গিয়ার পরে নেন, যাতে মুখ, নাক আর চোখের সবটা একটা আবরণের আড়ালে থাকে। কোনওভাবেই রেসপিরেটারি ড্রপলেট সরাসরি মুখের সংস্পর্শে আসতে না পারে। ফেস-শিল্ড না থাকলে আই-গ্লাস হল বিকল্প উপায়। কোভিড টেস্টিং করেন যে স্বাস্থ্যকর্মীরা তাঁদের নাক, মুখ বা গলা থেকেই নমুনা সংগ্রহ করতে হয়। তার জন্য রোগীর কাছাকাছি যাওয়ার প্রয়োজন হয়। তাই সংক্রমণ এড়াতে সকলেই আই-গ্লাস পরে থাকেন।

    এখন প্রশ্ন হল তাহলে ভাইরাস নাক বা মুখ দিয়ে কীভাবে ঢুকে পড়ছে শরীরে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ২০ রকম কোষের বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীদের ধারণা হয়েছে, নাকের কোষকেই প্রথম টার্গেট বানায় আরএনএ সার্স-কভ-২। শ্বাসনালীর দু’রকমের কোষ বিশেষ পছন্দ এই ভাইরাসের। কারণ এই দুই কোষেই থাকে সেই বিশেষ রিসেপটর প্রোটিন যার সাহায্যে তারা শরীরে ঢোকার রাস্তা খুঁজে পায়।

    ভাইরাসের শরীরে ঢোকার সহজ পথ

    ব্রিটেনের ওয়েলকাম স্যাঙ্গার ইনস্টিটিউট এবং ইউনিভার্সিটি অব মেডিক্যাল সেন্টার গ্রনিনজেনের বিজ্ঞানী এই বিষয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। তাঁদের মতে, গবলেট কোষ ও সিলিয়েটেড কোষকেই প্রথম নিশানা বানায় এই ভাইরাস। গবলেট কোষ মূলত থাকে শ্বাসপথে, অন্ত্রে অর্থাৎ ক্ষুদ্রান্ত ও বৃহদন্ত্রে। মিউকাস তৈরি করে এই কোষ। সিলিয়েটড কোষ থাকে বিভিন্ন অঙ্গে। ছোট ছোট চুলের মতো অংশ থাকে এই কোষে যাকে বলে সিলিয়া। এর কাজ শরীরে ঢুকে পড়া ক্ষতিকর জীবাণুগুলিকে ছেঁকে বার করে দেওয়া। বিজ্ঞানীরা বলছেন, নাক ও গলায় থাকা এই গবলেট ও সিলিয়েটেড কোষকেই প্রবেশপথ হিসেবে বেছে নিয়েছে করোনা। এই দুই কোষেই থাকে ACE2 ও TMPRSS2 রিসেপটর প্রোটিন যার সঙ্গে করোনার স্পাইক গ্লাইকোপ্রোটিন যুক্ত হতে পারে।

    করোনা স্পাইক প্রোটিন হল তাদের চাবি, আর মানুষের দেহকোষের ওই রিসেপটর প্রোটিন হল তালার মতো। এই দুই মিলে গেলে প্রবেশপথ আপনিই তৈরি হয়ে যায়। আর একবার নাক, মুখ বা গলা গিয়ে ঢুকে পড়তে পারলেই প্রতিলিপি তৈরি করে সংখ্যায় বাড়তে শুরু করে দেয় ভাইরাস। ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে।

    গবেষকরা বলছেন, নাক, গলা, ফুসফুস, হার্ট, কিডনি, লিভার, চোখ-সহ দেহের নানা অঙ্গেই রয়েছে ওই দুই রিসেপটর প্রোটিন। তাই শুধু ফুসফুস নয়, হার্ট, কিডনি, লিভার এমনকি অন্ত্রেও সংক্রমণ ছড়াতে পারছে ভাইরাস। এমনও দেখা গেছে সার্স-কভ-২ ভাইরাসের কারণে খাদ্যনালীতে সংক্রমণ ছড়িয়েছে। কোভিড রোগীর দেহের নানা অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়ার প্রমাণও মিলেছে। ফুসফুসের কোষকে এমনভাবে সংক্রমিত করছে যে শ্বাসপ্রশ্বাসের প্রক্রিয়াটাই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছনোর রাস্তাও বন্ধ হচ্ছে। যার ফলে আচমকাই কোভিড রোগীর নাকের গন্ধ চলে যাওয়া অ্যানোসমিয়া (Anosmia)  বা মুখের স্বাদ চলে যাওয়া অ্যাগিউসিয়া (Ageusia) মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। শুধু তাই নয় হার্ট ও মস্তিষ্কে ব্লাট ক্লট বা রক্ত জমাট বাঁধতেও দেখা যাচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, এর কারণে কোভিড রোগীর আচমকাই হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেন ড্যামেজ হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More