“প্রথমবার ফাঁসি দিয়ে আনন্দ পেয়েছি, মেয়েটা শান্তি পাবে,” চোখে জল, মুখে প্রশান্তি, কে এই পবন জল্লাদ

ফাঁসিকাঠে চার চারটি দেহকে একসঙ্গে ঝুলতে দেখে শরীরে কোনও শিহরণ অনুভব করেননি পবন জল্লাদ। বরং প্রথমবার স্বস্তি অনুভব করেছিলেন মনে মনে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: “জীবনে প্রথমবার ফাঁসি দিয়ে আনন্দ পেলাম। বিটিয়া এবার শান্তি পাবে,” গলায় ফাঁস পরিয়ে, হাতল টানার পরে মুখে কষ্টের কোনও ছাপ ছিল না পবন জল্লাদের। যত বড় অপরাধীই হোক না কেন, পেশার প্রতি যতই কর্তব্য থাক না কেন, নিজের হাতে হাতল টেনে কোনও মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সেই মুহূর্তটাতে কোথাও একটা চিনচিনে যন্ত্রণা টের পান ফাঁসুড়েরা। শুক্রবার কাঁটায় কাঁটায় ভোর সাড়ে পাঁচটায় সবুজ সঙ্কেত মেলার পরেই হাতল টেনে দিয়েছিলেন পবন জল্লাদ। এবারের ফাঁসি কিছুটা ব্যতিক্রম। অপরাধীরা বিরলের মধ্যে বিরলতম অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত। ফাঁসিও হয়েছে একসঙ্গে চারজনের, স্বাধীনতার পরে যা মাত্র একবারই হয়েছিল দেশে। ১৯৮৭ সালের ২৫ অক্টোবর। পুণের ইয়েরওয়াড়া জেলে।

ফাঁসিকাঠে চার চারটি দেহকে একসঙ্গে ঝুলতে দেখে শরীরে কোনও শিহরণ অনুভব করেননি পবন জল্লাদ। বরং প্রথমবার স্বস্তি অনুভব করেছিলেন মনে মনে। “এই দিনটারই অপেক্ষা করছিলাম। ধৈর্য্য ধরতে পারছিলাম না আর। চার দোষীকে নিজের হাতে ফাঁসি দিতে পেরে খুব খুশি। মেয়েটাও এবার শান্তি পাবে,” দৃঢ় কণ্ঠে কথাগুলো বলেছিলেন পবন। নির্ভয়ার যন্ত্রণার কথা ভেবেই হয়তো চোখ ভিজে উঠেছিল।

 

এর আগে দুবার তিহাড়ে এসে ফিরে গেছি, এতদিনে আইনের জয় হল

 

ফাঁসির দিন বদলেছে বারে বারেই। আইনি জটিলতায় ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙেছে দেশের। নির্ভয়ার দোষীরা সাজা পাবে তো? তিহাড় জেলকর্তৃপক্ষ শুধু নয়, এমন চিন্তা পবনের মনেও এসেছিল কয়েকবার। বলেছেন, নির্ভয়ার দোষীদের মৃত্যুদণ্ডের দিন ঠিক হওয়ার পরেই ডাক পড়ে তাঁর। মেরঠ থেকে সোজা চলে আসেন দিল্লির তিহাড়ে। উত্তরপ্রদেশ সরকারের সার্টিফিকেট পাওয়া ফাঁসুড়েকেই নির্ভয়ার দোষীদের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল। তিহাড় জেলের তিন নম্বর সেলের কাছেই এতদিন ছিলেন পবন জল্লাদ। ফাঁসির আগে বেশ কয়েকবার বালি ও পাথরবোঝাই বস্তা নিয়ে ‘ডামি মহড়া’ দিয়েছেন।

পবনের কথায়, “এর আগে দু’বার দিল্লি এসে ফিরে গিয়েছিলাম। নানারকম আইনি জটিলতায় ফাঁসি পিছিয়ে যাচ্ছিল। এদিকে ঝুটো ফাঁসির মহড়া দেওয়া, বিহারের বকসর জেল থেকে ম্যানিলা রোপ আনানো, সব প্রস্তুতিই সারা হয়েছিল তিহাড় জেলে।” আটটা এমন ম্যানিলা রোপ বিহার থেকে আনানো হয়েছিল। পবন বলেছেন, চারজনকে একসঙ্গে ঝোলানোর জন্য বিশেষভাবে তৈরি হয়েছিল ফাঁসিকাঠ। সাধারণত ফাঁসি দেওয়ার আগে দড়ি ভাল করে মোম ঘষে নরম ও মোলায়েম করে নিতে হয়। কারণ দোষীদের গলায় ক্ষতের চিহ্ন থাকা চলবে না। ফাঁসির আগের কয়েকটা দিন অপরাধীদের সম ওজনের বালির বস্তা ঝুলিয়ে বারে বারেই দেখে নেওয়া হয়েছিল দড়ি ঠিকঠাক আছে কিনা।

 

বাবা-ঠাকুর্দাও ফাঁসুড়ে, ছোট থেকেই হাতেকলমে কাজ শিখেছেন পবন জল্লাদ

 

“আমাদের পরিবার ৫০ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত, বাবা-ঠাকুর্দা অনেক কুখ্যাত অপরাধীদের ফাঁসি দিয়েছে,” বলেছেন পবন। ৫৮ বছরের টানটান চেহারা। শান্ত প্রকৃতির নিরীহ মানুষটার চোখ দু’টো বড় উজ্জ্বল। ১৯৬২ সালে মেরঠে জন্ম। অভাবের সংসার। পবন জল্লাদের ঠাকুর্দার ঠাকুর্দা লক্ষ্মণ জল্লাদ পরিবারের প্রথম ফাঁসুড়ে। তাঁর হাত ধরেই এই পেশাকে বেছে নিয়েছিলেন পবনের দাদু কালুরাম ওরফে কাল্লু জল্লাদ। ইন্দিরা গান্ধীর দুই খুনিকে ফাঁসি দিয়ে খবরের শিরোনামে এসেছিলেন কাল্লু জল্লাদ। পবনের বাবারও নাম আছে। মাম্মু জল্লাদ কুখ্যাত খুনি, অপরাধী রঙ্গা ও বিল্লাকে ফাঁসি দিয়েছিলেন। বাবা ও ঠাকুর্দার কাছে ছোট থেকেই এই পেশার তালিম নিয়েছিলেন পবন। নিঠারি হত্যাকাণ্ডে দোষী সুরেন্দ্র কোলিকে তাঁর ফাঁসি দেওয়ার কথা ছিল, তবে শেষ মুহূর্তে ফাঁসি বাতিল হয়ে যায়।

পবন বলেছেন, এমন জঘন্য ধর্ষককে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়েছিলেন তাঁর দাদু কাল্লু জল্লাদ। সেটা ১৯৯২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করে নৃশংসভাবে খুন করার জন্য মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়েছিল জুম্মান নামে এক অপরাধীর। তাকে ফাঁসি দিয়েছিলেন কাল্লু জল্লাদ। সেই ফাঁসির আগে জামি মহড়ার সময় ঠাকুর্দার পাশেই ছিলেন পবন।

 

নির্ভয়ার চার দোষীকে সাজা দিয়ে আয় হয়েছে ৬০ হাজার টাকা, তবে শান্তি হয়েছে বেশি

 

প্রতিজনের জন্য ১৫ হাজার টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা নিয়ে মেরঠে ফিরে গেছেন পবন জল্লাদ। উত্তরপ্রদেশ সরকারের এই খাস ফাঁসুড়ের আয় যদিও বেশি নয়। মাসে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা রোজগার তাঁর। মাথায় সাত সন্তানের চিন্তা। পাঁচ মেয়ে ও দুই ছেলে। ছেলেরা কেউ এই পেশায় আসতে চায় না। তারা সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করছে। পবন জানিয়েছেন, এই টাকায় সংসারের হাল কিছুটা হলেও ফিরবে। তবে টাকার থেকেও যে স্বস্তি ও মনের শান্তি নিয়ে ফিরেছেন, সেটাই তাঁর কাছে অনেক।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More