মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১
TheWall
TheWall

পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে তৈরি নৌকা! যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় নতুন করে বাঁচছেন যুবক, পথ দেখিয়েছে ইউটিউব

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

দ্য ওয়াল ব্যুরো: গাজা উপত্যকা। যে নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা ছবি। অভাবে, আক্রমণে দুর্বিষহ সাধারণ মানুষের জীবন। কাজ নেই, পরিত্রাণ নেই। রোজ সকালে আতঙ্ক এই বুঝি নতুন কোনও হামলা হল। রোজ রাতে আশঙ্কা, এই বুঝি উড়ে গেল মাথার ওপরের চালটুকু। প্রতি মুহূর্তে চলছে বেঁচে থাকার লড়াই। এ লড়াইয়ে শত্রু শুধু দেশ দখলের যুদ্ধ নয়, শত্রু পেট ভরা খিদেও।

ফসলের মাঠে বারুদের গন্ধ

এই অবস্থায় গাজার সাধারণ মানুষের রোজগারের উপায় প্রায় নেই। ফসলের মাঠে মিশে গেছে বারুদের পোড়া গন্ধ। এসবের মধ্যে খানিক নিরাপদে রোজগার করার একমাত্র পথ, সমুদ্রে মাছ ধরা। কিন্তু সে পথ সকলের জন্য নয়। কারণ উত্তাল সমুদ্রে মাছ ধরার জন্য যে শক্তপোক্ত নৌকা দরকার, তা বানানো বা কেনার খরচ খুব কম নয়।

তাই বহু মৎস্যজীবীই ইচ্ছে থাকলেও গাজার সাগরে ভাসাতে পারেন না নৌকা। ৩৫ বছরের মোয়াদ আবু জায়েদও ছিলেন এমনই এক মৎস্যজীবী। পেশায় এক জন দক্ষ ও অভিজ্ঞ জেলে হলেও, নিজের নৌকা ছিল না তাঁর। ঘর রং করার কাজ করে কোনও রকমে দিন কাটাতেন শরণার্থী পরিবারের এই যুবক।

পথ দেখাল ইউটিউব

মা, বাবা, ভাই, বোন, স্ত্রী, সন্তান—সকলকে নিয়ে দিন কাটানোর রসদ ক্রমেই ফুরিয়ে আসছিল। উপার্জনের কোনও উৎসও নেই। যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকায় কে আর বাড়ি বানায়, কে আর রং করে! এমন সময় দিন বদলে দেয় একটি ইউটিউব ভিডিও।

সেই ভিডিওয় মোয়াদ দেখেছিলেন, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে বানানো সম্ভব নৌকা। এবং সেই ভিডিওতেই দাবি করা হয়েছিল, শত ঝড়েও এই নৌকা উল্টোবে না। হাল্কা হওয়ার কারণে, উল্টে গেলেও সহজেই ফের সোজা করা যাবে। নৌকা বানানোর পদ্ধতিও ওই ভিডিওতেই দেখেন তিনি। এত সহজে এত মজবুত নৌকা বানানো সম্ভব, তা যেন বিশ্বাস হয় না মোয়াদের।

বোতল কুড়োনোর পালা

কিন্তু চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী? এই ভেবে গাজা উপত্যকার দক্ষিণে রাফা সমুদ্রতীরে যে শত শত প্লাস্টিকের বোতল পড়ে থাকে আবর্জনা হিসেবে, সেখানে গিয়ে অসংখ্য খালি বোতল কুড়িয়ে আনেন তিনি। পদ্ধতি অনুযায়ী সমস্ত বোতল ভাল করে পরীক্ষা করে, নিয়মমতো বাঁধাছাঁদা করে বানিয়েও ফেলেন আস্ত একটা নৌকা! বোতলগুলি কুড়িয়ে আনলেও, আঠা, নাইলন দড়ি—এসব আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র কিনতে কিছু খরচ হয়। কিন্তু তা নতুন নৌকার দামের তুলনায় একেবারেই সামান্য।

এত সহজে ভাসল নৌকা!

নৌকা তো বানানো হল। কিন্তু এ নৌকা সত্যিই সমুদ্রে ভাসবে তো? এক বুক দ্বন্দ্ব ও আশঙ্কা নিয়ে একাই বেরিয়ে পড়েন প্রথমে। সমুদ্রে নামতেই বেড়ে যায় আত্মবিশ্বাস। নৌকা তো দিব্যি চলছে ঢেউয়ের তালে তালে! বড় ঢেউ এলেও দিব্যি সামাল দেওয়া যাচ্ছে, তেমন টালমাটাল ছাড়াই। এতই হাল্কা আর এতই সহজ যে ডুবে যাওয়ার বা খারাপ হয়ে যাওয়ার ভয় প্রায় নেই বললেই চলে।

আর থামেননি মোয়াদ। স্বপ্নের পাল তুলে, ইচ্ছের ডানা মেলে নৌকা হাঁকান মাঝদরিয়ায়। ছোট জাল দিয়েই মাছ ধরতে শুরু করেন। রোজগার বাড়লে কেনেন বড় জালও। এখন এক জন সম্ভ্রান্ত মৎস্যজীবী তিনি। ৭০০টি পুরনো বোতল দিয়ে তৈরি তাঁর এই অভিনব নৌযানটি এখন আট জন যাত্রী নিয়েও বুক ফুলিয়ে ভেসে থাকতে পারে সমুদ্রে। ছুটতে পারে ঢেউয়ের আগে।

মাছের ব্যবসা জমজমাট

বসার জন্য বোতলের উপরে কাঠের বড় পাটাতন বসিয়েছেন মোয়াদ। সেখানে বসেই বৈঠা টানেন তিনি। সহজেই চলে যান তীর থেকে কয়েকশো মিটার দূরে, বা আরও গভীরে। ভোর থেকে বেরিয়ে, সারাদিন ৭-৮ ঘণ্টা সমুদ্রে ভেসে থেকে, ৫-৭ কেজি সার্ডিন, স্যামন ইত্যাদি নানা ধরনের সামুদ্রিক মাছ ধরে ঘরে ফেরেন বেলাবেলি।

ফেরার পথে সমুদ্রের কাছেই রাস্তার ধারে বিক্রি করেন মাছ। প্রতিদিন ২০-৪০ শেকেল (গাজার মুদ্রা) অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা আয় হয়। মোয়াদের বছর কুড়ির দুই ভাইও এই কাজেই যোগ দিয়েছেন তাঁর সঙ্গে।

বুদ্ধি আর চেষ্টা দিয়েই বাজিমাত

মোয়াদের অভিনব এই কীর্তি এখন গাজার বহু মানুষের অনুপ্রেরণা। কোনও পুঁজি ছাড়াই, শুধুমাত্র বুদ্ধি ও প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে, শুধু চেষ্টার জোরে যে আস্ত একটা নৌকা বানিয়ে সমুদ্র তোলপাড় করে ফেলা যায়, তা তাঁকে দেকেই জেনেছেন অনেকে। ফিলিস্তাইনের বহু মাঝি বা জেলে এখন এরকম পরিত্যক্ত বোতল দিয়ে তৈরি নৌকা বানাতে শুরু করেছেন। কিন্তু মোয়াদের নৌকা আদি ও অকৃত্রিম।

Share.

Comments are closed.