শুক্রবার, অক্টোবর ১৮

রাত নামছে চাঁদের আঁধার পিঠে, এখনও ঘুমিয়ে ‘বিক্রম?’ ডেকেই চলেছে চন্দ্রযানের অরবিটার

দ্য ওয়াল ব্যুরো: হাতে আর মাত্র একদিন। ২১ সেপ্টেম্বর। ধীরে ধীরে আঁধার ঘনাচ্ছে চাঁদের দক্ষিণ পিঠে। হাড়হিম করা ঠাণ্ডায় আর কি ‘বিক্রম’ সাড়া দেবে?

২২ জুলাই শ্রীহরিকোটার সতীশ ধবন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের দ্বিতীয় লঞ্চ প্যাড থেকে উৎক্ষেপণের পরে ৬ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ল্যান্ড করার কথা ছিল চন্দ্রযান ২-এর ল্যান্ডার বিক্রমের। ঠিকঠাক সফট ল্যান্ডিং হলে  ওই দিনই ভোর রাতে বিক্রমের পেট থেকে বেরিয়ে আসত রোভার ‘প্রজ্ঞান।’ টানা ১৪ দিন ধরে চাঁদের দক্ষিণ পিঠে ঘুরে ঘুরে নিজের কাজ করত সে। পৃথিবীর হিসেবে চাঁদের এক পক্ষকাল অর্থাৎ এই ১৪ দিনই চাঁদের দক্ষিণ পিঠে দিন। অর্থাৎ সূর্যের আলো সোজাসুজি পড়বে ওই পিঠে। এই হিসেবেই চন্দ্রযানের উৎক্ষেপণ এবং ল্যান্ডিং প্রোগ্রাম করেছিল ইসরো। হিসাব ছিল, সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করবে রোভারের সোলার প্যানেল।  এই শক্তিতেই রোভারের নেভিগেশন ক্যামেরা কাজ করবে। ছবি ও ডেটা তুলে পাঠাবে পৃথিবীর গ্রাউন্ড স্টেশনে। অন্যদিকে সূর্যের আলোয় শক্তি পাবে বিক্রমের ট্রান্সমিটারও। তার অ্যান্টেনা সঙ্কেত পাঠাবে চাঁদের কক্ষপথে ঘুরতে থাকা চন্দ্রযানের অরবিটারকে।

এই সব হিসাবই গুলিয়ে যায় ৬ সেপ্টেম্বর রাত ১টা ৫৩ মিনিটের পর থেকে। ইসরো সরাসরি না বললেও, অনেক বিজ্ঞানীরই দাবি ওই দিন অবতরণের সময় গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি বিক্রম। ৩৫*১০১ কিলোমিটার কক্ষপথ ধরে সোজা চাঁদের মাটিতে নেমে আসার কথা ছিল ল্যান্ডার বিক্রমের। এই ৩৫ কিলোমিটার দূরত্ব পার করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোগ্রামিং ল্যান্ডারের মধ্যে করে রেখেছিলেন বিজ্ঞানীরা। সোজা নামতে নামতে শেষ ৫ কিলোমিটারে মুখ ৯০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে (Vertical) চাঁদের পিঠে নামার কথা ছিল বিক্রমের। এই পর্যায়ে গতি এমন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কথা যাতে ভার্টিকালি ঘুরে গিয়ে পালকের মতো চাঁদের মাটিতে নামতে পারে ল্যান্ডার। যাকে বলে সফট ল্যান্ডিং (Soft Landing)। এই ৯০ ডিগ্রি রোটেশন হয়নি। বরং ২.১ কিলোমিটার থেকে পুরোপুরি উল্টে গিয়ে সজোরে চাঁদের মাটিতে ধাক্কা খেয়েছে সে। এই হার্ড ল্যান্ড বা ক্র্যাশ ল্যান্ডের কারণে বিক্রমের অ্যান্টেনা অকেজো হয়ে গেছে, যার কারণে রেডিও যোগাযোগের ক্ষমতা হারিয়েছে সে।

ইসরো সম্প্রতি তাদের টুইটে জানিয়েছে, হাল চাড়েনি অরবিটার। ন্যাশনাল কমিটি অব অ্যাকাডেমিক্সের বিজ্ঞানীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তাঁদের আশঙ্কা চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে রাত নেমে গেলে, বিক্রমকে আর জাগানো সম্ভব হবে না। হাড়হিম করা ঠাণ্ডায় ল্যান্ডার বিক্রমের ট্রান্সমিটার আর সাড়া নাও দিতে পারে।

ইসরোর পাশাপাশি বিক্রমের খোঁজ পেতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসাও। চন্দ্রযানের অরবিটারের আগেই নাসার লুনার অরবিটার Lunar Reconnaissance Orbiter (LRO) পৌঁছে গেছে দক্ষিণ মেরুর উপর। গত ১০ বছর ধরে চাঁদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে নাসার লুনার অরবিটার এলআরও। গত মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর চাঁদের দক্ষিণ মেরুর উপর দিয়ে পাক খেয়েছে সে। দক্ষিণ পৃষ্ঠের একাধিক ছবিও তুলে পাঠিয়েছে গ্রাউন্ড স্টেশনে। এলআরও ডেপুটি প্রজেক্ট হেড জন কেলার জানিয়েছেন, দক্ষিণ মেরুর এক অংশ ছায়ায় ঢেকেছে। তাই চন্দ্রযানের ‘বিক্রম’ যদি সেখানে ল্যান্ড করে থাকে, তাহলে তার সঠিক অবস্থান বার করা এই মুহূর্তে অসম্ভব। একটা সম্ভাবনাও প্রবল হচ্ছে। সেটা হলো, অপটিক্যাল ইমেজে দক্ষিণ মেরুর কিছু জায়গায় স্পট দেখা গেছে। সেটা চাঁদের পিঠের ছায়ার জন্য। হতে পারে সেই ছায়াতেই লুকিয়ে ল্যান্ডার ‘বিক্রম?’ তবে সবই সম্ভাবনা।

নাসার প্ল্যানেটারি সায়েন্স ডিভিসনের অফিসার জোসুয়া এ হ্যান্ডেল অবশ্য দাবি করেছেন, ‘‘এলআরও মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। এখনও অবধি চন্দ্রযানের ল্যান্ডারের খোঁজ মেলেনি। লুনার অরবিটারের সমস্ত ইমেজের চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে। তবে ক্যামেরার ফিল্ড ভিউ তেমন কিছু জানাতে পারেনি।’’

আরও পড়ুন:

চাঁদের পিঠে ওই ‘ছায়া’ কি চন্দ্রযানের ‘বিক্রম?’ পাগলের মতো খুঁজছে নাসার লুনার অরবিটার

Comments are closed.