মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৩

গীতবিতানের শতাধিক গানে আমিই সুর দিয়েছি, বিতর্কের তোয়াক্কা করি না

ইচ্ছে থাকলেই অনেক দুঃসাধ্য কাজও করা যায়। ভয় পেলে চলে না। বিপ্লবকুমার ঘোষকে বললেন স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

মাত্র কয়েকদিন আগেই পূর্ণ হলো আপনার সঙ্গীত জীবনের ৫০ বছর। গানের জগতে কান পাতলেই শোনা যায় আপনার নাম। বিতর্কও। কারণ রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানে আছে, অথচ স্বরবিতানে নেই, এমন শতাধিক গান গেয়ে আপনি তো দুঃসাহসিক কাজ করেছেন।

অন্যেরা যা পারেননি, আমি তাই করেছি। আজ অবধি কেউ যা ভাবেননি, তাই ভেবেছি। গানের জগতে প্রথম থেকেই ‘ব্যতিক্রমী’ হতে চেয়েছি। রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে সেই স্বপ্ন কিছুটা হলেও পূরণ করতে পেরেছি।

আপনার এই কাজ ব্যতিক্রমী কেন?

অবশ্যই তার কারণ আছে। গীতবিতানে আছে অথচ স্বরবিতানে প্রায় ১৯১টি গানের সুরলিপি নেই। শিল্পী হিসেবে আমারও কর্তব্য ও দায়িত্ব ভুলতে পারি না। তাই সেই সব গানে প্রাণ জাগাতে রাত-দিন, মাসের পর মাস চর্চা ও পরিশ্রম করে নতুন করে সুর বেঁধেছি। ‘একলা বিতানে’ শীর্ষক অ্যালবামে ১৯১টি গানের মধ্যে ১৫০টি গান সম্পূর্ণ করেছি। আমিই গেয়েছি। এটাও দেখুন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানগুলি লিখেছিলেন, কিন্তু সুর দিয়েছিলেন কিনা আমরা কেউ জানি না। এমনও হতে পারে, তিনি সুরও দিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলি হারিয়ে গিয়েছে। বা আদৌ সুর দেননি।

যাই বলুন না কেন, শুধু সাহস নয়, হিমালয় ডিঙনোর মতো কঠিন কাজ। আপনি কীভাবে তা সম্ভব করলেন?

হিমালয় ডিঙনো নয়, পর্বত শিখরে কোনও গভীর অরন্যে ধ্যান করার মতোই কঠিন কাজ। যেহেতু ছোটবেলা থেকেই আমি গান পিপাসু, অনন্ত সাগরের মতো সঙ্গীতের তলে একজন ডুবুরি হয়ে খুঁজে বেড়াতে চেয়েছি গানের অজানা সম্পদ। আমি তো শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী নই, এখনও অবধি ৯টি ভাষায় গান করেছি। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতেও সাফল্য দেখিয়েছি প্রচুর গজল গেয়ে। বিদেশেও তা সমাদৃত হয়েছে শ্রোতাদের কাছে। দুঃসাহসিক কাজ সেই করে, যার সাহস আছে। সু-শিক্ষিত শিল্পী হয়ে তাই রবীন্দ্রনাথের গানগুলিতে এখনও মণি-মুক্তো খুঁজে বেড়াই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানগুলি নিয়ে কীভাবে ‘এক্সপেরিমেন্ট’ করতেন, সেটাই জীবনের শুরু থেকে ধরতে চেয়েছি।

রবীন্দ্রনাথের গানে সুর দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু কী করে বুঝলেন আপনার সেই উদ্দেশ্য সফল?

রবীন্দ্রগানের পূর্বসূরিরা উৎসাহ দিয়েছেন। প্রশংসা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের সুর না দেওয়া সব গানের মধ্যে প্রথমেই ১৫০টি গান পূর্বসূরিদের বাড়ি গিয়ে শুনিয়ে এসেছি। আমি তাঁদের সামনেই গেয়েছি আমার দেওয়া সুরে। সবচেয়ে বড় কথা সুপ্রিয় ঠাকুর সব শুনে আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি এতটাই প্রশংসা করেছেন যে আমার অন্তরে সৃষ্টির নেশা কখন যেন জেদ-এ পরিণত হয়েছিল।

সুপ্রিয় ঠাকুরের প্রশংসা ও আশীর্বাদ পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু রবীন্দ্রগানের অন্য পূর্বসূরিদের কথা তো কিছু বলছেন না?

সেই তালিকা অনেক দীর্ঘ। পূর্বা দাম, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, পূরবী মুখোপাধ্যায় দিনের পর দিন সেই গানগুলি মন দিয়ে শুনেছেন। দ্বিজেনদা একদিন ডেকে বললেন, “হ্যাঁ রে, তুই কী করেছিস? তাল ও ছন্দে রবীন্দ্রনাথের লেখাগুলি যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। শিল্পীর দৃঢ়তা ও অভিজ্ঞতায় প্রতিটি গানই মনে ধরে যায়।” শুধু দ্বিজেনদা কেন, পূর্বাদি, পূরবীদিরাও আমাকে প্রশংসা করলেন, উৎসাহও দিলেন।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের এই জগতের বাইরে অন্য গানের ঘরানায় প্রবাদপ্রতীম শিল্পী পূর্ণদাস বাউল। তিনি তো শুধু অবাকই হননি, সংস্কৃতি জগতের বহু মানুষকে ডেকে ডেকে আমার প্রশংসা করেছে। অন্য গানের জগতে থাকলেও অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন, “নিখুঁত সুরারোপে প্রাণ ফিরেছে প্রতিটি গানে।”

কবি শঙ্খ ঘোষ নাকি আপনার সুরারোপিত গানগুলি শুনে বেশ বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন?

আপনারা শুনলে অবাক হবেন, আমার একটি গান তিনি তিন-তিনবার শুনেছেন। ‘অন্ধকারের মাঝে, আমায় ধরেছো দুই হাতে’ আমি তিনবার গেয়েছি।

আচ্ছা, আপনি যখন মঞ্চে গান শোনান, তখন শ্রোতাদের এই গানগুলি সম্পর্কে কখনও অবহিত করেন কি?

পাগল হয়েছেন নাকি? এত ঔদ্ধত্য আমার নেই। যখন পরিবেশন করি, তখন রবীন্দ্রসঙ্গীত বলেই গেয়ে থাকি।

ইতিমধ্যেই তো বেশ কিছু গান জনপ্রিয় হয়েছে শ্রোতাদের কাছে। তাই না?

হ্যাঁ। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো নিয়ে রবীন্দ্রনাথ একটি গান লিখেছিলেন। কিন্তু তার কোনও সুর ছিল না। গানটি হলো- ‘গভীর রাতে ভক্তি ভরে, কে জাগে আজ কে জাগে।’ এখন তো মাঝেমধ্যেই মঞ্চে সেই গান শোনাবার অনুরোধ পাই।

‘রাজা’ নাটকের একটি গান- ‘আমার হারিয়ে যাওয়া দিন’ আবারও নতুন করে প্রাণ পেয়েছে শ্রোতাদের কাছে। মনে পড়ে গেল সেই গানটির কথা, যে গানটি একবার একই মঞ্চে দু’বার গাইতে হয়েছিল। ‘ঝাঁকড়া চুলের মেয়ের কথা কাউকে বলিনি।’

দেড়শো বছর পিছিয়ে সেই সময়কে ধরা এবং সেই সব গানে তাল-মাত্রা নির্ধারণ করা, সত্যিই বড় কঠিন কাজ।

কঠিন তো বটেই। কিন্তু তখন সত্যি সত্যিই এক অলৌকিক কাণ্ড ঘটেছিল। প্রথম যখন ৭৫টি গান নিয়ে বাড়িতে রেকর্ডিং করি, সেই মুহূর্তগুলোতে মনে হতো সুবিনয় রায়, সুচিত্রা মিত্র, মায়া সেন, জর্জ বিশ্বাসরা আমায় আশীর্বাদ করছেন। সেই সব মুহূর্তে মনে ভীষন জোর পেতাম।

১৯১টি গানের মধ্যে এখনও তো ৪০টি গানের সুর বাকি। আপনিই গাইবেন? না অন্যরা?

বাকিগুলি নতুন প্রজন্মের উপর ছেড়ে দিতে চাই। আমার ছাত্র-ছাত্রীরাও এখন আমাকে প্রচুর সাহায্য করে। তবে ইচ্ছে আছে শান্তিনিকেতন ও বাংলাদেশের কয়েকজন শিল্পীকে দিয়ে এই গানগুলি গাওয়াবো।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের এখন তো আর কোনও মর্যাদা থাকল না। যে যা খুশি গাইছে।

যে যা খুশি গাইছে তাই নয়, মুড়ি-মুড়কির মতো শিল্পীর দল সেটা নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। একটু নজর দিন, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে দেখুন, অসংখ্য নাম যেন গিজগিজ করছে। মঞ্চে উঠছে। নিজের মতো গাইছে। আরে বাবা, তারা নিজেরা কী গাইল, ভালো না মন্দ, তার কোনও তোয়াক্কাই করছে না। কী ভয়ানক ব্যাপার রে বাবা।

পরিণাম তো খুব খারাপ দিকেই এগোচ্ছে, তাই না?

এই কথাটা শুনলেই খুব হাসি পায়। কিছু বললেই বিতর্ক হবে। শুধু এটুকুই বলব, “তুমি কাছে নাই বলে………আমি বড় বড় বলিছে সবাই।”

আপনার প্রতিভা রবীন্দ্রগানে নিশ্চয়ই প্রভাব ফেলবে। কিন্তু এই উদ্যোগ বাণিজ্যিক চাপে অন্য চেহারা নেবে না তো?

প্রত্যয় নিয়ে বলতে পারি, একদম না।

Shares

Comments are closed.