রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৫

‘কয়লা মাফিয়া, পর্ন ছবির ব্যবসা, নিকষ অন্ধকারের মধ্যে আলোর সন্ধানে মৃণাল’, ওয়েব দুনিয়ায় হইচই ফেলল ‘ধানবাদ ব্লুজ’

সোহিনী চক্রবর্তী

 ‘ইয়ে ঝরিয়া হ্যায় সাব, ইসকে সিনে মে আগ হামেশা জ্বলতা হ্যায়’।

ঝরিয়া। যেদিকে তাকানো যায়, শুধুই কয়লা। কয়লার মতোই কালো এখানকার মাফিয়ারাজ। মুখের কথা খসার আগে এখানে বন্দুকের গুলি চলে। জোর যার, ঝরিয়া তার। সামান্য ভুলের শাস্তি এখানে মৃত্যু। অন্য প্রান্তে দাঁড়ানো মানুষটির খুলি ওড়াতে দু’মিনিট লাগে না ঝরিয়ার কোল মাফিয়াদের। বিপক্ষের চোখের দিকে তাকিয়ে অনায়াসে বন্দুক তাক করতে পারেন তাঁরা। তাও আবার একদম সঠিক নিশানায়।

এই ঝরিয়ারই দুই কুখ্যাত মাফিয়া মামু এবং তিওয়ারি। মামু এলাকার সাংসদও বটে। অন্যদিকে তিওয়ারির ব্যবসা ‘পর্ন ছবি’ বানানোর। ব্যবসায় ক্ষতি করতে পারেন এমন কেউ রাস্তার কাঁটা হলেই, তাঁকে উপড়ানোর আগে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেন না এই দু’জন। চোখের পলক ফেলার আগেই কাজ শেষ। সাংসদ হওয়ায় জনসমক্ষে সভা করে মামু অবশ্য সমাজের উন্নতির বুলি আওড়ান। তবে আসল উদ্দেশ্য একটাই। পকেটে গোছা গোছা নোট গোঁজা।

মামুর পথের একমাত্র কাঁটা তিওয়ারি। যাঁর ব্যবসার পুঁজি কয়লা নয়, ‘নীল ছবি’। গোটা ঝরিয়া জুড়ে চলে তাঁর রাজ। নির্দিষ্ট জায়গায় তাঁর দলবল শ্যুটিং করে পর্ন ফিল্মের। ঝরিয়া জুড়ে রয়েছে তাঁর প্রচুর হল। সেখানে লাইন দিয়ে লোকে সেই ছবি দেখে। আবার সেই সিডি বিক্রিও হয় খোলাবাজারে। ঝরিয়া ছাড়া বাইরের বাজারেও বিশাল চাহিদা এইসব সিডির। আম জনতার এই চাহিদাই তিওয়ারির আসল পুঁজি। কিন্তু তিওয়ারির ব্যবসায় মন্দা আনতে উঠে পড়ে লেগেছেন মামু। নইলে যে তাঁর গদির যায় যায় অবস্থা। আর নিজের জমি এক ইঞ্চিও ছাড়তে রাজি নন তিওয়ারি। তাই ঝরিয়া এখন মেতেছে রক্তের খেলায়। দুই ক্ষমতাবানের দলবলের সংঘর্ষ এখন ঝরিয়ার অলিগলির পরিচিত দৃশ্য। রোজই দু’চারটে লাশ পড়া কোনও ব্যাপারই না। এই দু’জন ছাড়াও অবশ্য আরও একজন আছেন। শাকিরা। যৌনকর্মীর দালাল। শাকিরা-তিওয়ারির সম্পর্ক আবার সাপে-নেউলে। আর তিওয়ারিকে ব্যাকফুটে পাঠাতে শাকিরার সঙ্গে হাত মেলাতে চেয়েছেন মামু।

ব্যবসায় খানিক মন্দা দেখে এ বার নড়েচড়ে বসেছেন তিওয়ারি। ‘পর্ন ফিল্ম ফেসটিভ্যাল’-এ ছবি পাঠাবেন। কিন্তু মামুর হাতে ছবির হিরোইন আর তাঁর নিজের শাগরেদের গুলিতেই পরিচালক খুন হয়েছেন। তাই অনেক খুঁজে কলকাতা থেকে তুলে এনেছেন পরিচালক মৃণাল সেনকে।

কে এই মৃণাল? আর হঠাৎ মৃণালই কেন? কারণ তিনি ছবির ব্যাপারে প্যাশনেট। সত্যজিৎ আর ঋত্বিক রয়েছেন তাঁর মজ্জায়। ভালো ছবি বানানোটাই মৃণালের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। যদিও তাঁর অ্যাসিসটেন্ট ঋদ্ধিমার কথায় “ছবি তো ভালো হয় না। ছবিটা ভালো করে বানাতে হয়।” অগত্যা ফ্রম গড়িয়া টু ঝরিয়া।

এ দিকে মৃণাল এখনও পর্যন্ত যে ছবির কাজেই হাত দিয়েছেন তা আর হল অবধি পৌঁছায়নি। মাঝপথেই দম ফেলেছে ধারাবাহিকও। বাড়ির মর্টগেজ দিয়েছেন। লোন শোধের টাকা নেই। ভাড়াটে থেকে ছেড়ে যাওয়া স্ত্রী—-সবার থেকে মৃণালের একটাই পাওনা, চারটে বাঁকা কথা। যদিও মৃণালের একজন ইন্সপিরেশনও রয়েছে। তাঁর মেয়ে মিঠি। যে বিশ্বাস করে তার বাবা ঠিক একদিন ভালো ছবি বানাবে। সমস্যায় জর্জরিত মৃণাল তাই টাকা পেয়েই রাজি হয়ে যান তিওয়ারির ছবি বানানোর প্রস্তাবে। যদিও ঝরিয়া যাওয়ার আগে মৃণাল বা ঋদ্ধিমা কেউই জানতেন না, যে ছবি বানাতে যাচ্ছেন তা ‘পর্ন ফিল্ম’। তবে ঝরিয়া পৌঁছে সব জানার পরে মৃণাল এটা ভালো ভাবেই বুঝতে পারেন পালানোর পথ বন্ধ।

তামাম জনতাকে কয়লার থেকেও কালো ঝরিয়ার সমাজের সঙ্গে পরিচয় করাতেই হাজির ‘হইচইয়ে’-এর ওয়েব সিরিজ ‘ধানবাদ ব্লুজ’। পরিচালনায় সৌরভ চক্রবর্তী। প্রযোজনায় ‘ট্রিকস্টার অ্যান্ড স্প্যান’। এখনও অবধি রিলিজ হয়েছে মাত্র চারটে এপিসোড। আর তাতেই ছক্কা হেঁকেছেন সৌরভ। জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে ‘ধানবাদ ব্লুজ’। এমনিতেই ট্রিকস্টারের ‘জাপানী টয়’-এর পর দর্শকদের আকাঙ্খার পারদ ছিল তুঙ্গে। আর ‘ধানবাদ ব্লুজ’ তা পূরণে সফল। অন্তত জেন ওয়াইয়ের রিঅ্যাকশন তাই বলছে। দুরন্ত ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, ঝকঝকে পরিচালনা ছাড়াও এই ওয়েব সিরিজ থেকে অন্যতম প্রাপ্তি রজতাভ দত্তর (মৃণাল) অসামান্য অভিনয়। প্রতিটি এক্সপ্রেশনে রজতাভ নিখুঁত। সঙ্গে রয়েছেন সাবলীল সোলাঙ্কি (ঋদ্ধিমা)। মেগা সিরিয়ালের বাধ্য বউয়ের পরে এমন বোল্ড অভিনয়ে সত্যিই তাক লাগিয়েছেন সোলাঙ্কি।

বহুদিন পর পর্দায় ফিরেছেন রূপাঞ্জনা মিত্র। হোক না ওয়েব সিরিজ, হোক না মুঠো ফোন—–রূপাঞ্জনার দৃপ্ত অভিনয়ে কিন্তু একটুও খামতি নেই। ঝরিয়ার যৌনকর্মীদের দালাল শাকিরার চরিত্রে এই ওয়েব সিরিজে রয়েছেন তিনি। মৃণালের স্ত্রীর চরিত্রে রয়েছেন অপরাজিতা আঢ্য। মামুর ভূমিকায় বি-টাউনের পরিচিত মুখ ইমরান হাসনি। তবে বাজার কিন্তু একাই কাঁপাচ্ছেন তিওয়ারি। আর এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন, পোড়খাওয়া অভিনেতা দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য।

অনুরাগ কাশ্যপের ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’ দেখে ইতিমধ্যেই আম বাঙালি কোল মাফিয়াদের নৃশংসতার সঙ্গে পরিচিত। তবে ওয়াসিপুরের মনোজ বাজপেয়ী ( সর্দার খান ) কিংবা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকির ( ফয়জল খান ) তুলনায় কিন্তু কোনও অংশে কম নন তিওয়ারি বা মামু।

তবে অনুরাগের ছবির মতো রক্তের বন্যা হয়তো নেই। বরং কিছুটা মাফিয়াদের চিন্তা নিয়ে খেলা। বাইরে থেকে সাধারণ, ভেতর থেকে কঠিন। চরিত্রদের শরীরী ভাষা আর চাউনি দিয়ে বাজিমাত করতে চেয়েছেন পরিচালক। প্রথম চার এপিসোডে সফল তিনি।

এরপরেই অবশ্য আসল খেলা। পর্ন ছবির জন্য তিওয়ারি তুলে এনেছে শত্রু শাকিরার সবথেকে পছন্দের যৌনকর্মী জন্নতকে। সে আবার বাঙালিও। বদলা নিতে মরিয়া শাকিরা। এ দিকে এই পরিস্থিতিতেই নিজের সেরা ছবিটা বানানোর চেষ্টায় নেমেছেন মৃণাল। দু চোখে স্বপ্ন এবং একরোখা জেদ—-এই নিয়েই ময়দানে নেমেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত কী হয় সেটাই এখন দেখার।

Comments are closed.