মঙ্গলবার, মার্চ ২৬

ফুটবলার ‘কুসুমিতার গপ্পো’—–গল্প হলেও সত্যি

দেবার্ক ভট্টাচার্য্য

টেক ওয়ান 

উত্তর ২৪ পরগণার সন্দেশখালির প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েটার ছোট থেকে ধ্যান-জ্ঞান বলতে শুধুই ফুটবল। বাবা ফুটবল ভালোবাসেন। কিন্তু মা পছন্দ করেন না। গাঁ-ঘরের মেয়ে, গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে গা লাগিয়ে ফুটবল খেলবে, লোকে কথা তো বলবেই। কিন্তু নিজের স্বপ্ন, ভালোবাসা ছাড়তে নারাজ কুসুমিতা। এই স্বপ্নকে নিয়ে বেড়ে ওঠা। ক্লাস এইটেই পড়াশোনায় ইতি। একটু বড় হতে তিনটে নদী পেরিয়ে বসিরহাটে খেলতে আসা। ধীরে ধীরে বাংলার মহিলা দলে ফুটবল খেলা শুরু।

টেক টু

এসএসকেএম হাসপাতালের উডবার্ণ ভবনের একতলার অন্ধকার গলি পেরিয়ে একটা বেড। বেডের উপরে বসে লিগামেন্ট ছেঁড়া কুসুমিতা। বাংলার হয়ে কেরলে খেলতে গিয়ে ওড়িশার বিরুদ্ধে মাঠেই চোট পান। ছেঁড়া লিগামেন্ট নিয়েই ৯০ মিনিট খেলেছিলেন। তারপর রাজ্যে ফিরে এসে ভর্তি হন এসএসকেএম-এ। বেডের নীচে ঘুরে-বেড়াচ্ছে বিড়াল। পাশে বসে মা-বাবা। মুখে চিন্তার ছাপ। হাঁটুর অপারেশন করতে দরকার ২৬ হাজার টাকা। কীভাবে আসবে সেই টাকা? আছে বলতে দু’বিঘে জমি। সেটা বিক্রি করতে রাজি বাবা। কিন্তু মেয়েকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, ফুটবল খেলা ছাড়বে সে। মেয়েও নাছোড়বান্দা, ফুটবল খেলবেই। এ দিকে তখন সেই উডবার্ণ ভবনেরই দোতলায় বহাল তবিয়তে তৎকালীন রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী মদন মিত্র। সিবিআই অভিযুক্ত হওয়ার পর অসুস্থ হয়ে সেখানে ভর্তি তিনি। অথচ তিনি জানেনই না, সেখানেই একতলার অন্ধকারে চরম অবহেলায় তাঁর রাজ্যেরই এক ফুটবলার।

টেক থ্রি

খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে হাজির হন রাজ্যের ক্রীড়া সাংবাদিক রতন চক্রবর্তী। দেখেন, অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় অন্ধকার ঘরে বেডের উপর বসে কুসুমিতা। তাঁর সাহায্যের জন্য কেউ নেই। এই ঘটনাটি নিয়ে একটি প্রতিবেদনও লেখেন তিনি। রতন চক্রবর্তীর এই প্রতিবেদনের উপর নির্ভর করেই তৈরি হয়েছে ‘কুসুমিতার গপ্পো’। সিনেমায় তাঁর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

রতন চক্রবর্তীর প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরেই শোরগোল পড়ে যায় গোটা রাজ্যে। কুসুমিতার সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী। অন্ধকার, অপরিচ্ছন্ন বেড থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় দোতলার এসি ঘরে। চিকিৎসার ভার বহন করে রাজ্য সরকার। সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে আইএফএ। হাঁটুর অপারেশন সেরে নিজের বাড়ি ফেরে কুসুমিতা। আর ফুটবল? মাঠে ফেরা কি হবে কুসুমিতার?

এই তিনটি প্রতিবাদ্যের উপর নির্ভর করেই নিজের দ্বিতীয় ছবি করেছেন পরিচালক হৃষীকেশ মন্ডল। ছবির মূল বিষয়বস্তু অবশ্য কুসুমিতার ফুটবলার হয়ে ওঠা, চোট পাওয়া ও তারপর ফের সব বাধা অতিক্রম করে মাঠে ফেরা, এই জার্নিটা নিয়েই।

ছবিতে কুসুমিতার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ঊষসী চক্রবর্তী। ফুটবল না খেললেও খেলাধূলোর প্রতি ছোট থেকেই ভালোলাগা আছে তাঁর। মাঝেমধ্যে ওয়েট লিফটিংও করেন। নিজেকে ফিট রাখেন। আর তাই যখন এই চরিত্র করার সুযোগ মিলেছে, নিজেকে নিংড়ে দিয়েছেন ঊষসী।

 

 

ফুটবলার হয়ে ওঠার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছেন। তিন মাস প্র্যাকটিস করেছেন। দেশপ্রিয় পার্কে বাচ্চাদের সঙ্গেই সকাল-সন্ধ্যা প্র্যাকটিস করতেন ঊষসী। তাঁর কথায়, “কুসুমিতাকে ফুটিয়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছি আমি। তিন মাস ফুটবল প্র্যাকটিস করেছি প্রাক্তন মহিলা ফুটবলার কুন্তলা ঘোষ দস্তিদারের কাছে। অনেক সময় কুসুমিতা নিজে এসেছে প্র্যাকটিসে। মাঝেমধ্যেই চোট পেতাম। কিন্তু আমি থামিনি। আশা করি, আমার এই পরিশ্রমের ফল বড়পর্দায় দর্শকরা দেখতে পাবেন।”

খুশি ঊষসীকে কোচিংয়ের দায়িত্বে থাকা কুন্তলা ঘোষ দস্তিদারও। তাঁর কথায়, “আমার সবথেকে ভালো লেগেছে ঊষসীর অধ্যবসায়। সময়ের আগে ও মাঠে হাজির হয়ে যেত। কোনওদিন নিজের প্র্যাকটিসে খামতি দেয়নি। নিজের সবটা নিংড়ে পরিশ্রম করেছে চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে।”

ছবিতে ঊষসী ছাড়া অন্যতম প্রধান ভূমিকায় রয়েছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। শুধুমাত্র কুসুমিতার কথা সবাইকে জানানোই নয়, তাঁকে ফের মাঠে ফিরিয়ে আনার পেছনে অন্যতম সূত্রধর সৌমিত্রবাবু। ছবিতে তিনি যেন ৩৩ বছর আগের ক্ষিদদা। এ বার কোনির জায়গায় কুসুমিতা। সাঁতারের জায়গায় ফুটবল। কিন্তু জার্নিটা তো সেই এক।

এই ছবিতে প্রথমবার অভিনয় করতে দেখা যাবে ফুটবলার শিল্টন পালকে। ছবিতে শিল্টন কুসুমিতার গ্রামেরই ছেলে। তিনি কলকাতায় ফুটবল খেলেন। ছবিতে তাঁর সঙ্গে কুসুমিতার একটা সম্পর্কের দিকও দেখানো হয়েছে। এই চরিত্রের ব্যাপারে বলতে গিয়ে শিল্টন বলেন, “এই ছবিতে অভিনয় করতে খুব ভালো লেগেছে। বেশ অন্যরকম অভিজ্ঞতা।”

রয়েছেন মাধবী মুখোপাধ্যায়ও। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রীর ভুমিকায় অভিনয় করেছেন তিনি। ৩০ বছর পর ফের সেলুলয়েডে দেখা যাবে সৌমিত্র-মাধবী জুটিকে। কুসুমিতার বাবা-মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন দেবেশ রায়চৌধুরী ও মানসী সিন্‌হা। রয়েছেন দুলাল লাহিড়ী, সমীর আইচ। এ ছাড়াও অতিথি শিল্পী হিসেবে অভিনয় করেছেন প্রাক্তন মোহনবাগান কোচ সঞ্জয় সেন, ১৯৮১ সালে মহিলা বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের অধিনায়ক কুন্তলা ঘোষ দস্তিদার, অর্জুন পুরস্কার প্রাপ্ত শান্তি মল্লিক, শুক্লা দত্ত, শুক্লা নাগ, চৈতালী চট্টোপাধ্যায়, মিনতি রায়, সুষমা দাস, জুরি ডি’সিলভা, ইন্দ্রানী সাহারা। ছবির মিউজিক দিয়েছেন সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়। অতিথি সুরকার হিসেবে সুর দিয়েছেন সিদ্ধার্থ রায় ( সিধু )। বাঙালির ফুটবলের চিরন্তন গান ‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল’কে নতুনভাবে তৈরি করা হয়েছে। গানগুলি ইতিমধ্যেই দর্শকদের মন ছুঁয়েছে।

পরিচালক হৃষীকেশ মন্ডলের এটি দ্বিতীয় ছবি। তাঁর প্রথম ছবি ‘অচেনা বন্ধু’ ছিল এলজিবিটি সম্প্রদায়ের উপর নির্ভর করে। এ বার মহিলা ফুটবলার। পরিচালকের কথায়, “আমি সবসময় সত্যি ঘটনা নিয়ে ছবি করতে ভালোবাসি। ২০১৪ সালে প্রথম খবরের কাগজে এই ঘটনাটা জানতে পারি। খুব কষ্ট হয়েছিল। ভাবলাম এই গল্পটা নিয়ে ছবি করতে হবে।” ছবির কলাকুশলীদের নিয়ে বলতে গিয়ে হৃষীকেশ বললেন, “শিল্টন ফুটবলার থেকে এখানে অভিনেতা হওয়ার চেষ্টা করেছে। আর ঊষসী অভিনেত্রী থেকে ফুটবলার হওয়ার। আশা করছি দর্শকদের এই ছবি ভালোই লাগবে।”

আর যাঁকে নিয়ে এই ছবি, সেই কুসুমিতার কী রকম মনে হচ্ছে? বর্তমানে গ্রীন পুলিশে কাজ করেন কুসুমিতা। খেলেন কলকাতা পুলিশের মহিলা ফুটবল দলে। এখনও তাঁর কথায় সেই গ্রাম্য টান, শেকড়ের যোগ স্পষ্ট। বললেন, “আমার জীবন নিয়ে যে সিনেমা হচ্ছে, এতেই আমি খুব গর্বিত। হৃষীকেশদা আমার বাড়ি ঘুরে গিয়েছেন। ঊষসীদি যা পরিশ্রম করেছেন, ভাবা যায় না। সবাই খুব ভালো।” কিন্তু এতকিছুর পরেও একটা আক্ষেপ তাঁর গলায়। বললেন, “আমি আর ক’বছর খেলতে পারবো? তারপর? আমাদের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ। মুখ্যমন্ত্রী যদি আমার একটা পাকা চাকরি করে দিতেন, তাহলে খুব ভালো হতো। অন্তত সংসারটা ঠিক মতো চলতো।”

 

আসলে কুসুমিতার জীবনের পরতে পরতে সিনেমা। তাঁর বড় হয়ে ওঠা, ফুটবলা খেলা, চোট, ফের মাঠে নামা, পুরোটাই। আর এই জীবনটাকেই বড় ক্যানভাসে ধরেছেন হৃষীকেশ। ইতিমধ্যেই ছবির ট্রেলর বেরিয়েছে। হয়েছে মিউজিক লঞ্চও। ছবি মুক্তি পাবে ১৫ মার্চ। এখন থেকেই দর্শকদের মধ্যে তুমুল আগ্রহ কুসুমিতার গপ্পো শোনার। আসলে কুসুমিতার গপ্পো হলেও তা যে সত্যি।

Shares

Comments are closed.