রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৫

সমাজের চোখে স্পেশ্যাল চাইল্ড বড় পর্দায় গোয়েন্দা! কেমন ছিল ‘কিয়া অ্যান্ড কসমস’-এর জার্নি?

  • 14
  •  
  •  
    14
    Shares

সোহিনী চক্রবর্তী

পাশের বাড়ির বেড়াল ‘কসমস’-এর সঙ্গে দারুণ ভাব ছিল পনেরো বছরের কিশোরী কিয়ার। কিন্তু আচমকাই কে যেন মেরে ফেলে তার সাধের বেড়ালটিকে। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাতেই মারা যায় কসমস।

সাথী হারানোর যন্ত্রণাটা মন থেকে মেনে নিতে পারেনি কিয়া। প্রতিবেশীর বেড়ালের খুনের তদন্তে তাই একাই নেমে পড়ে সে। একা একাই পাড়ি দেয় কালিম্পংয়ের উদ্দেশে। আর এই জার্নিতে নিজের বাবার সম্পর্কেও নানান আজানা কথা জানতে পারে কিয়া। ছোটবেলা থেকেই কিয়া জানতো তার বাবা হারিয়ে গেছে। তবে কসমসের খুনিকে খুঁজতে নেমে কিয়া জানতে পারে তার বাবা তাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে।

তবে এই কিয়ার সফরে একদম একা সে নয়। সঙ্গে রয়েছে আরও দু’জন বিশ্বস্ত বন্ধু। রিকশাওয়ালা রবি আর কিয়ার স্কুলের শিক্ষক শৌভিক। শেষ পর্যন্ত কি কিয়া খুঁজে পাবে কসমসের খুনিকে? জানতে পারবে কোথায় আছে তার বাবা? দর্শকদের এই সব প্রশ্নের উত্তর দিতেই ২৯ মার্চ রিলিজ হয়েছে ‘কিয়া অ্যান্ড কসমস’।

টিম ‘কিয়া অ্যান্ড কসমস’-এর সঙ্গে আড্ডায় বসেছিল দ্য ওয়াল। ছিলেন কিয়া—ঋত্বিকা পাল এবং ছবির সিনেমাটোগ্রাফার আদিত্য বর্মা। প্রাণখোলা আড্ডার মাঝেই উঠে এল শ্যুটিংয়ের নানান মজার প্রসঙ্গ। আর ঋত্বিকা এবং আদিত্য দু’জনেই জানালেন এই ছবিটা তাঁদের হৃদয়ের ঠিক কতটা কাছের। জানালেন পরিচালক সুদীপ্ত রায়ের সঙ্গে কতটা খোলামেলা ভাবে কাজ করতে পেরেছেন তাঁরা।

ঋত্বিকার কথায়….

আমার বাড়িতে কুকুর বা বেড়াল নেই। ছোট থেকে যেহেতু ওভাবে পোষ্য ঘেঁটে বড় হইনি তাই ওদের ব্যাপারে বিশেষ কিছু জানি না। এই একটা ব্যাপারেই কিয়ার সঙ্গে আমার একটু অমিল আছে। তবে হ্যাঁ আমার একটা পোষা মাছ রয়েছে। ও আমার খুব আদরের। আমার মনে হয় কিয়া আর আমি একই মানুষ। বলা ভালো আমাদের সবার মধ্যেই একজন কিয়া রয়েছে। সমাজের চোখে কিয়া একজন স্পেশ্যাল চাইল্ড। আর পাঁচজন তথাকথিত সুস্থ মানুষের সঙ্গে ওর বিস্তর ফারাক। লোকে বলে কিয়া বাকিদের মত করে ভাবতে পারে না। কিন্তু ও যেভাবে ভাবে, ঠিক ততটা সহজ সরল ভাবেই বোধহয় আমরা প্রত্যেকে ভাবতে চাই। এত জটিলতা আমরাও চাই না। তবে বেশিরভাগ সময়েই পরিস্থিতির চাপে আমাদের ভিতরের কিয়ারা বাস্তবে সামনে আসে না। পর্দায় ওদের দেখা যায়। আমার নিজেরই অত গাটস নেই কিয়ার মতো করে ভাবার।

ছবিতে স্বস্তিকা আপনার মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন? ওঁর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?

ঋত্বিকা- ওঁর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে একবারও মনে হয়নি যে উনি অত বড় অভিনেত্রী বা আমায় অহঙ্কার দেখিয়ে অপমান করছেন, ছোট করছেন। বরং ঠিক মায়ের মতোই সেটে আমার খেয়াল রাখতেন। নিজের হেয়ার ড্রেসারকে বলতেন, অ্যাই ওর চুলটা ঠিক করে দে। আমরা চকলেট ভাগ করে খেতাম। এমনকী আমার পড়াশোনার নিয়মিত খোঁজ রাখতেন উনি। বলতেন, তুই তো আমার মেয়েরই মত। পড়াশোনা ডকে তুলে পরীক্ষায় ফাঁকি দিস না। আর অভিনয় নিয়ে কীই বা বলবো বলুন। স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় ক্যামেরার সামনে বরাবরই ভীষণ সাবলীল। মাঝে মাঝে বুঝতেই পারতাম না যে উনি সিনে শট দিচ্ছেন, নাকি নিজের সংসারে কথাবার্তা বলছেন।

রিলিজের আগেই বিভিন্ন ফিল্ম ফেসটিভ্যালে গিয়েছে আপনার প্রথম ছবি, ট্রেলর দেখেই দেদার প্রশংসাও করেছেন শহরবাসী, সেলিব্রিটি ফিল হচ্ছে?

ঋত্বিকা- নাহ্‌। আমার আইডি কার্ডের ছবি আর এখনকার ছবি দেখলে কেউ চিনতে পারে না। আমি চাই আজীবন ব্যাপারটা এমনই থাকে। বেশি লোকজন চিনে ফেললে আমার পছন্দের বার্গারে এসে ভাগ বসাতে পারে। এটা আমার বিলকুল না পসন্দ। তবে হ্যাঁ এই যে এত এত ফিল্ম ফেসটিভ্যালে ছবিটা যাচ্ছে, মানুষের ভালো লাগছে, এটা আমায় খুব শান্তি দিয়েছে। আর মনে হয়েছে আমি যেন নিজেই ওই শহরগুলোয় হাজির রয়েছি। এককথায় বলতে গেলে, আমি গোটা ব্যাপারটার ফ্লেভারটা এনজয় করছি। ব্যাস এটুকুই।

এটা আপনার প্রথম ছবি, অভিনয় জগতে আসা কী ভাবে?

ঋত্বিকা- আমি যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ছাত্রী। ওখানে ড্রামা ক্লাবে যুক্ত ছিলাম। বেসিক্যালি আমি থিয়েটারেই অভ্যস্ত। প্রচুর নাটক করেছি। স্টেজ শো করেছি। সুদীপ্তদা (ছবির পরিচালক সুদীপ্ত রায়) একদিন বলেছিলেন এই ছবিটা বানাবেন। তখন জানতাম যে একটা শর্ট ফিল্ম হবে। ইউটিউবে বেরোবে। ওই আমি আর আমার বন্ধুরাই দেখবো। শেয়ার করবো। অনেক পরে জেনেছি যে এটা একটা ফুলস্কেল ছবি হচ্ছে। সিনেমা করবো বলে সিনেমা করতে এসেছি তেমনটা নয়। কোনওদিন সেভাবে চেষ্টাও করিনি। কেউ অফারও দেয়নি। আমি থিয়েটার জগতেরই মানুষ। একটা সিনেমা হয়ে গেল। এই যা।

কথার মাঝেই মুচকি মুচকি হাসছিলেন ছবির সিনেমাটগ্রাফার আদিত্য বর্মা। দক্ষিণ ভারতে জন্ম আদিত্যর। বাংলা বলতে পারেন না। তবে বুঝতে পারেন। খুব ছোটোবেলায় কলকাতায় এসেছিলেন। তারপর ‘কিয়া অ্যান্ড কসমস’-এর জন্য রেইকি করতে আসা। 

আপনারও এটা প্রথম বাংলা ছবি, এখানকার ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে কেমন লাগলো?

আদিত্য- দারুণ। সবচেয়ে অবাক হয়েছিলাম যেদিন সুদীপ্তদা বলেছিলেন, ক্যামেরায় সবকিছু সুন্দর দেখনোর দরকার নেই। যেটা যেমন তেমনই দেখিও। আর চেষ্টা করো কিয়া যেভাবে দুনিয়া দেখে, ওর চোখ দিয়ে দর্শকদের সেটাই দেখনোর। ঝটকা লেগেছিল সুদীপ্তদার কথায়। ভাবছিলাম লোকটা বলে কী? পরে কাজ করতে করতে আরও অনেক কিছু শিখেছি। আমায় কাজ করার এত স্বাধীনতা এখনও অবধি কোনও ডিরেক্টর দেয়নি। কোনওদিন উনি বলেননি এটা চাই। ওটা করতেই হবে। একটাই কথা বলতেন, এটা তোমারও ছবি। নিজের মনের মতো করে কাজ করো।

আদিত্যকে প্রায় থামিয়ে দিয়ে ঋত্বিকাও বলে উঠলেন, একদমই তাই। সুদীপ্তদা যেভাবে আমাদের সঙ্গে কাজ করেছেন, অত ফ্রিডম দিয়ে বোধহয় কেউ কাজ করাবেন না। আমি তো থিয়েটার করে অভ্যস্ত। যেখানে স্টেজের প্রতিটা লোকের উপরেই প্রতিটা মানুষ নির্ভর করে। ক্যামেরায় শট দেওয়াটা অনেকটা আলাদা। এক মুহূর্তের জন্যেও আমার মনে হয়নি যে আমি সাংঘাতিক কঠিন কিছু করছি। সেটের সবাই দারুণ ফ্রেন্ডলি ছিলেন।

স্বস্তিকার সঙ্গে কাজ করার কেমন অভিজ্ঞতা হলো আদিত্য?

আদিত্য- দেখুন আমি সেভাবে বাংলা ছবি দেখিনি। স্বস্তিকার সম্পর্কেও আগে থেকে কিছুই জানতাম না। প্রথম আমাদের দেখা হয় সুদীপ্তদার বাড়িতে। উনি মন দিয়ে বিরিয়ানি খাচ্ছিলেন। বেশ কয়েকটা ছবি তুলি আমি। ওনার খাওয়ার স্টাইলটা আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। ভেবেছিলাম যিনি খাবার খান এত স্টাইল করে, ক্যামেরায় তিনি মারকাটারি হবেন। হলোও তাই। এত সাবলীল অভিনেত্রী। আমার খাটনি কম হয়েছে। প্রায় সব শটই একবারেই ওকে করে দিতেন সুদীপ্তদা। আর স্বস্তিকার থেকে অনেক গাইডেন্সও পেয়েছি। আমি তো বাইরের রাজ্যের ছেলে। কিন্তু এই ফিলটা আমায় একবারের জন্যেও কেউ হতে দেননি। এমনকী সেটের টেকনিশিয়ান দাদাদের আমি পাগল করে দিতাম মাঝে মাঝে। কিন্তু ওঁরা একবারও বিরক্ত হতেন না। চুপচাপ হাসিমুখে শুধু আমায় সবরকম ভাবে সাহায্য করে যেতেন।

কলকাতা টু কালিম্পং, ক্যামেরা কাঁধে কেমন ঘুরলেন?

আদিত্য- ফাটাফাটি। আমি প্রথম যে ছবির জন্য শুট করেছিলাম সেটা ছিল লে-লাদাখে। আগে কখনও কালিম্পং আসিনি। তাই জানতাম না জায়গাটা কেমন। ভেবেছিলাম এখানেও ঝকঝকে নীল আকাশ থাকবে। বড় বড় ভ্যালি থাকবে। এর কোনওটাই পাইনি। বরং সকাল-বিকেল লেন্সে একরাশ কুয়াশা নিয়ে শ্যুট করেছি। কিন্তু কালিম্পং আমায় ভীষণভাবে টেনেছে। লেন্সে কুয়াশা পড়লে যে এত দারুণ ভিউ পাওয়া যায় এটা সত্যিই জানা ছিল না। আমি আর ঋত্বিকা তো এমনিই হাঁটতে হাঁটতে কত ছবি তুলেছি। তার মধ্যে থেকেই সুদীপ্তদা বেশ কিছু ছবি সিনেমায় ব্যবহার করেছেন। এমনকী ওয়ার্কশপের ছবিও সিনেমায় রেখেছেন। বোধহয় উনি বলেই করেছেন। বাকি পরিচালকরা ঘুরেও দেখতেন না এসব ছবি।

আদিত্য আর কিয়ার সঙ্গে আড্ডায় বারবার এসেছে স্বস্তিকার প্রসঙ্গ। অনেকদিন পর একদম অন্যরকমের চরিত্রে ‘কিয়া অ্যান্ড কসমস’-এ দেখা যাবে স্বস্তিকাকে। এখানে তিনি সিঙ্গল মাদার। তাঁর রিয়েল লাইফের সঙ্গে হয়তো অনেকাংশেই মিল রয়েছে এই চরিত্রের। তাই বোধহয় এই ছবির ব্যাপারে একটু বেশিই আবেগপ্রবণ স্বস্তিকা। ট্রেলর রিলিজের পর নিজের সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়ালে তাই অভিনেত্রী লিখেছিলেন, “সেভাবে পোস্টার পড়েনি শহর জুড়ে। ছবির বাজেটও কম। কিন্তু এসবের জন্য ভালো ছবি তৈরি হওয়া আটকে যায় না। যদি আপনারাও একই ভাবে ভাবেন, তাহলে ছবিটা দেখুন।”  

Comments are closed.