শনিবার, মার্চ ২৩

রূপকথা নয়

ঠিক যেন ছোটগল্প। তবে গল্প নয়, সত্যি কাহিনী। এক ব্যতিক্রমী সত্যি কাহিনী। এবং সাম্প্রতিক। জানি না, কতজন আপনারা খেয়াল করেছেন।

এই গল্পে চারটি মুখ্য চরিত্র। ঘটনাস্থল, রাঢ় বঙ্গের এক প্রসিদ্ধ জনপদ। প্রথম চরিত্র, এক গরিব বাবার তথাকথিত বিবাহ-যোগ্যা তরুণী, যার বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। দুই, এক ক্ষেতমজুর বাবা, যার পরিবারে নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যাওয়াটাই দস্তুর। তিন, এক সহৃদয় পুর-প্রতিনিধি যিনি সেই বাবার দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ নিরসনে আন্তরিকভাবে সক্রিয়। চার, এক ইলেকট্রিক মিস্ত্রি যুবক, যে রেস্তয় নয়, মনে বিত্তশালী। অবশ্য পঞ্চম একটি পক্ষও আছে। একটি পরিবার, এই গল্পে যাদের বাস ওই জনপদের সন্নিহিত একটি গঞ্জ এলাকায় হলেও, যারা সমাজে আতঙ্কজনক ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ।

এই পরিবারেই মেয়েকে সম্প্রদান করবেন বলে তোড়জোড় করছিলেন বাবা, এবং প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন টাকাপয়সা গয়নাগাটির সংস্থান করতে, এবং ব্যর্থ হচ্ছিলেন। যখন নিরুপায় হয়ে সেই অপারগতা ওই পরিবারকে জানালেন, তারা পত্রপাঠ বিয়ে নাকচ করে দিলেন। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়া পিতা কাঁদতে কাঁদতে ছুটলেন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় দফতরে, যেখানে ওই হৃদয়বান জনপ্রতিনিধির কাছে গোটা ঘটনা খুলে বলা, এবং তাঁর উদ্যোগে ইলেকট্রিশিয়ান যুবককে প্রস্তাব, ভাই রোজগার হবে না, কিন্তু ভালো মেয়ে পাবে। সেই ছেলে রাজি হল। বিয়ে হল। শুধু তাই নয় ওই নেতার আন্তরিক উদ্যমে ভূরিভোজও মন্দ হল না।

রূপকথার আদলে বলা যায়, বা প্রত্যাশা করা যায়, দে উইল  লিভ হ্যাপিলি এভার আফটার।

কিন্তু গল্প তো এমন ভাবে নাও এগোতে পারত। ওই গরিব বাবার যদি এক আধ কাঠা বিক্রয়যোগ্য জমি থাকত, তিনি সেটা অভাবী-বিক্রি করতেন। এবং সেটা করেও পুরো টাকা জোগাড় করতে পারতেন না, যা দিয়ে দর হেঁকে বসে থাকা ওই পরিবারকে পুরোপুরি খুশি করা যায়। বাকি টা শিগগির জোগাড় করে দিয়ে দেব—এই শর্তে কাকুতি মিনতি করে মেয়েটা কে পাঠিয়ে দিতেন। এবং কার্যত কপর্দকশূন্য বাবা কথা রাখতে পারতেন না। দিন কয়েক দেখেই মেয়ের উপর অত্যাচার শুরু হতো। মেয়ে বাবাকে কিছু জানতে দিত না। অত্যাচার বাড়ত। তারপর এক দিন আবিষ্কৃত হতো সেই দুঃখী মেয়ের ঝুলন্ত বা দগ্ধ দেহ। হয় তো ততদিনে সে গর্ভবতী। কারণ দিনে অত্যাচার চালানোর পাশাপাশি রাতেও তো শরীরের চাহিদা মেটাতে হবে স্বামীকে, যে হয়তো চূড়ান্ত অকর্মণ্য এক বেকার।

নতুন কিছুই নিশ্চই শুনলেন না। এ গল্প তো রোজকারের। অহর্নিশ ঘটে চলেছে কমবেশি সমাজের সব স্তরেই। ছেলের পরিবার যখন পণ হাঁকে, সওদা করে, মেয়ের বাবারা এক বার ভাবেন কি, এ তো সবে শুরু?  মেয়েকে যদি ভরণপোষণ করতে নাও পারি, মেয়ে আমার কাছে মরুক, কিন্তু এ ভাবে তাকে কতগুলো পশুর কাছে পাঠাব না, বা ঘাতকের কাছে, যারা খড়্গে শান দিচ্ছে মেয়েকে বলি দেওয়ার জন্য।

সমাজের যে বিষ রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে আছে, তাকে ঝাড়ার জন্য সকলকে এগিয়ে আসতে হয়, একটু সাহসী হতে হয়। মেয়েরা যখন শ্বশুরবাড়িতে খুন হয়, তখন মেয়ের বাবারাও কি এই অপরাধ থেকে নিজেকে বিযুক্ত করতে পারেন?

ভাবাটা বড্ড জরুরি, এবং আর সময় নষ্ট না করে। বাবাদের কাজ মেয়েকে স্বনির্ভর ও সাহসী করে বড় করা। বাকিটা তা হলে তারাই সামলে নেবে। দয়া করে ওদের বধ্যভূমিতে পাঠানো বন্ধ করুন। বুকে বল রেখে।

 

Shares

Leave A Reply