করোনা জয় করেছে ‘ভিলওয়াড়া মডেল’, মৃত্যু থেমেছে, সংক্রমণ নেই, নজির গড়েছে রাজস্থানের জেলা

মহামারী ঠেকাতে যখন মাথা ঘামাচ্ছে দেশ, রাজস্থানের একটি ছোট্ট জেলা দেখিয়ে দিয়েছিল কীভাবে প্রতিরক্ষার ভিত গড়ে তুলতে হয়। ‘ভিলওয়াড়া মডেল’— দেশকে বাঁচাতে যার উল্লেখ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো:  সেই ২০ মার্চ থেকে শুরু হয়েছিল কার্ফু। ৩ এপ্রিল থেকে ‘মহা-বনধ’। গোটা রাজস্থান থেকেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়েছিল ভিলওয়াড়া। নিজের চারদিকে গড়ে তুলেছিল সুরক্ষার এমন এক মজবুত পাঁচিল, যাকে ভেদ করে করোনা নামক ভয়ঙ্কর শত্রু বিশেষ আস্ফালন করতে পারেনি। সেই মার্চ থেকে আজ অবধি রাজস্থানে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও তার ছায়া পড়েনি ভিলওয়াড়াতে। নতুন সংক্রামিত এক বা দু’জন। প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়েছিল যাঁদের মধ্যে, তাঁদের অধিকাংশই সেরে উঠেছেন। সংক্রমণের আশঙ্কা, মৃত্যুর আতঙ্ক নেই শহরের পথে, গলির মোড়ে। করোনা প্রতিরোধে গোটা বিশ্ব যখন হিমশিম খাচ্ছে, মহামারী ঠেকাতে মাথা ঘামাচ্ছে দেশ, সেই সময় রাজস্থানের একটি ছোট্ট জেলা দেখিয়ে দিয়েছিল কীভাবে প্রতিরক্ষার ভিত গড়ে তুলতে হয়। ‘ভিলওয়াড়া মডেল’— দেশকে বাঁচাতে যার উল্লেখ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও।

    করোনা রুখতে ভিলওয়াড়া মডেলের কথা বিশেষভাবে বলেছিলেন ক্যাবিনেট সচিব রাজীব গৌবাও। দেশজোড়া লকডাউন ঘোষণার সময় কীভাবে সচেতনতা গড়ে তোলা যায় তার উদাহরণ দিতে বারে বারেই এই মডেলের কথা উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। যাঁর বুদ্ধি ও দক্ষতায় ভিলওয়াড়া প্রায় করোনার প্রকোপ মুক্ত সেই আইএএস অফিসার রাজেন্দ্র ভাট এখনও লড়াই করছেন নিজের জেলাকে সবরকমভাবে সুরক্ষিত রাখতে। ৫৬ বছরের আইএএসের কথায়, “আজ অবধি নতুন সংক্রমণের খবর নেই। ঘরে ঘরে সকলেই বিপদমুক্ত। আশা করছি ১ মে-র মধ্যে গোটা ভিলওয়াড়াকে ভাইরাস-মুক্ত ঘোষণা করতে পারব।”

    প্রথম সংক্রামিত এক ডাক্তার, তারপরেই নড়েচড়ে বসে ভিলওয়াড়া

     

    দিল্লি থেকে ৫৩০ কিলোমিটার দূরত্বে রাজস্থানের জেলা ভিলওয়াড়া। ১৯ মার্চ প্রথম ভাইরাস সংক্রমণের খবর মেলে ভিলওয়াড়া থেকে। আক্রান্ত হন ডাক্তার নিয়াজ খান। কীভাবে তিনি সংক্রামিত হন সেটা জানা যায়নি, তবে প্রথম সংক্রমণের খবরেই নড়েচড়ে বসে গোটা ভিলওয়াড়া। অজানা শত্রুকে আটকাতে আসরে নামেন জেলাশাসক রাজেন্দ্র ভাট। তুরন্ত গোটা জেলা জুড়েই জারি করা হয় কার্ফু। ২০ মার্চ থেকেই জেলার বেশ কয়েকটি এলাকায় লকডাউন শুরু হয়ে যায়। বন্ধ করে দেওয়া হয় সীমান্ত। কিন্তু সংক্রমণ ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছিল। প্রথম মৃত্যু ২৬ মার্চ, এক ৭৩ বছরের বৃদ্ধ করোনা সংক্রমণে মারা যান। দ্বিতীয় মৃত্যু এক ৬০ বছরের রোগী। তিনজন ডাক্তার ও ১৪ জন নার্সের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়ায়।

    “বুঝেছিলাম শুধু বিজ্ঞানের উপর ভরসা রাখলে মহামারী ঠেকানো যাবে না। তাই আমরা একজোট হয়ে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিই। আর একজনও যাতে আক্রান্ত না হন, তার জন্য দ্রুত প্রোটোকল ঠিক করে ফেলা হয়। রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন নিয়েই নিজস্ব বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে তুলি আমরা,” বলেছেন রাজেন্দ্র ভাট। গত ১৯ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ, এই সময়সীমার মধ্যে রাজস্থানের ওই জেলায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ২৭। তবে ৩০ মার্চের পর থেকে সংক্রমণের গ্রাফ ক্রমশই নিম্নমুখী। আক্রান্তদের মধ্যে ১৭ জনের সুস্থ হয়ে ওঠার খবর মিলেছে। ৯ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে হাসপাতাল থেকে।

     

    মৃত্যু থেমেছে, মহামারী রুখেছে ‘ভিলওয়াড়া মডেল’

     

    রাজেন্দ্র বলেছেন, সংক্রমণ ঠেকাতে চটজলদি নতুন প্রোটোকল ঠিক করে ফেলা হয়। বাড়ি বাড়ি ঘুরে শুরু হয় স্ক্রিনিং। কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তার জন্য তৈরি হয় নতুন নতুন কর্মসূচী, যা এখন ‘ভিলওয়াড়া মডেল’নামে পরিচিত।

    ২০ মার্চ থেকেই শুরু হয়েছিল কার্ফু। প্রথমেই জেলার কয়েকটি এলাকাকে হটস্পট চিহ্নিত করে ফেলা হয়। সিল করে দেওয়া হয় সেইসব এলাকা। বন্ধ করে দেওয়া হয় সীমান্ত। রেল পরিষেবা বন্ধ হযে যায়। গণপরিবহন কমিয়ে দেওয়া হয়। একসঙ্গে জমায়েত, ভিড়, মিছিল সবকিছুতেই কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। এই কার্ফু চলে ২ এপ্রিল পর্যন্ত।

    কার্ফুর সময়েই স্বাস্থ্য দফতর ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ৮৫০ জনের টিম বানিয়ে ফেলা হয়। এই টিমের কাজ হয় বাড়ি বাড়ি ঘুরে স্ক্রিনিং করা। জেলার প্রতিটি বাড়ি স্যানিটাইজ করা। দিনকয়েকের মধ্যেই ৫৬ হাজারের বেশি বাড়ি ও তিন লাখের বেশি মানুষকে সার্ভে করা হয়। আজ অবধি সেই সংখ্যা আরও বেশি।

    রাজেন্দ্র জানিয়েছেন, গত ২৬ মার্চ জেলায় করোনা সংক্রমণে প্রথম মৃত্যুর পরে ৬,৪৪৫ জনকে হোম-কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছিল। প্রত্যেকের নমুনা পরীক্ষা করানো হয়। সামান্য উপসর্গ দেখা দিয়েছে মনে হলেই দ্রুত তাঁদের আলাদা করে চিকিৎসা শুরু করানো হয়। ২৭ মার্চের মধ্যেই ভিলওয়ারার ৩০ লাখ মানুষের মধ্যে ২২ লাখেরই স্ক্রি’নিং করা সম্ভব হয়েছিল। আজ অবধি ভিলওয়াড়ার প্রতিটি বাড়িকেই কম করে দু’বার সার্ভে করা হয়ে গেছে।

    ৩ এপ্রিলের পর থেকেই জেলাজুড়ে শুরু হয় ‘মহা-বনধ’। তার আগে ঘরে ঘরে সার্ভে করে দেখা হয় প্রতি পরিবারে কতটা রেশন, কাঁচা আনাজ, দুধ লাগবে। অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকা তৈরি হয়ে যায়। লকডাউন শুরুর পরে একজন মানুষেরও যাতে খাদ্য বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের সমস্যা না হয়, তার জন্যই এই ব্যবস্থা।

    রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলাতের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে বৈঠক হয়। জেলার সমস্ত হাসপাতাল, নার্সিংহোম, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে চিকিৎসার সরঞ্জাম, এন৯৫ মাস্ক, সার্জিক্যাল মাস্ক, ভেন্টিলেটরের কী ব্যবস্থা আছে খতিয়ে দেখা হয়। জনসাধারণের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয় মাস্ক ও সুরক্ষার সরঞ্জাম। বিশেষ ব্যবস্থা করা হয় ডাক্তার-স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য।

    ভিলওয়াড়ার এসপি হরেন্দ্র মহাওয়ারের নেতৃত্বে তৈরি হয় স্পেশাল টিম। লকডাউন বিধি মানা হচ্ছে কিনা, কোনও পরিবার সমস্যায় আছে কিনা সেটা দেখার দায়িত্ব নেন পুলিশকর্মীরা। জরুরি অবস্থার জন্য আজমেঢ়ে তৈরি থাকতে বলা হয় সেনাবাহিনীকেও।

    জেলার ২৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ২৭-৩০টি হোটেলের ঘরকে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার বানিয়ে ফেলা হয়। আপৎকালীন অবস্থার জন্য হাসপাতালে বাড়ানো হয় আইসোলেশন বেড।

    শহর ও গ্রামে নিয়োগ করা হয় বিশেষ টাস্ক ফোর্স। বিডিও, সরকারি আধিকারিকদের নিয়ে তৈরি হয় করোনা-ক্যাপ্টেন টিম। বাড়ি বাড়ি ঘুরে নমুনা সংগ্রহ ও স্ক্রিনিংয়ের জন্য স্বাস্থ্যকর্মী, আশাকর্মীদের নিয়ে তৈরি হয় করোনা-ফাইটার টিম।

    জেলাশাসক রাজেন্দ্র ভাট বলেছেন, শুধুমাত্র কর্মসূচী নয়, জেলার প্রতিটি মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। সংহতির বার্তা নিয়ে লড়াই চলছে প্রাণঘাতী শত্রুর বিরুদ্ধে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More