ঝাড়খণ্ডের ফলাফল তৃণমূলের স্বস্তির কারণ কেন, কেনই বা অশনিসঙ্কেতও

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শঙ্খদীপ দাস

    ঝাড়খণ্ডে ভোট গণনা তখনও শেষ হয়নি। টুইট করে হেমন্ত সোরেনদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বলেছেন, ‘নাগরিকদের পক্ষেই রায় দিয়েছে ঝাড়খণ্ড!’

    দিদির এই টুইটেই বোঝা যাচ্ছে তৃণমূল খুশি। বিজেপির ভরাডুবিতে তৃণমূল খুশি হবে সেটাই স্বাভাবিক। আপাতভাবে এর মধ্যে রহস্যেরও কিছু নেই। তবে গভীরে গিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, স্রেফ হারজিতের অঙ্কটাই একমাত্র কারণ নয়, তৃণমূলের স্বস্তির কারণ সম্ভবত বৃহত্তর। দিদিও হয়তো সেই বৃহৎ ছবিটাই দেখছেন।

    ঝাড়খণ্ড বাংলার প্রতিবেশী রাজ্য। স্বাভাবিক ভাবেই লাগোয়া বাংলার জেলাগুলিতে ঝাড়খণ্ডের শাসক দলের একটা প্রভাব বরাবরই থাকে। লোক-লস্কর, টাকা পয়সা, ব্যানার-ফেস্টুন—সবরকম সাহায্যই পাওয়া যায়। এই যেমন লোকসভা ভোটে হয়েছিল। দিদি বারবার বলতেন, ঝাড়খণ্ড থেকে লোক ঢোকাচ্ছে বিজেপি। গেরুয়া শিবির তখন কত লোক ঢুকিয়েছে বা আদৌ ঢুকিয়েছে কিনা সেই তর্কে ঢুকছি না। তবে বোঝানোর জন্য মনে করিয়ে দিতে চাইছি, দলের জনসভায় সমর্থক জোটাতে বিজেপি যখন বাস ভাড়া করতে হন্যে হয়ে ঘুরছে, বাংলার বাস মালিকরা গাড়ি দিচ্ছেন না, তখন ঝাড়খণ্ড থেকে বাস ভাড়া করে এনেছিল গেরুয়া শিবির।

    সে যাক, বাস্তব হল ঝাড়খণ্ড লাগোয়া বাংলার প্রায় সব লোকসভা আসনেই উনিশে ডাহা হেরেছে তৃণমূল। ঘাটাল এবং বীরভূম আসন ব্যতিরেকে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর ওপশ্চিম বর্ধমানের কোনও লোকসভা আসনেই জেতেনি। ঝাড়খণ্ডে বিজেপি পর্যুদস্ত হওয়ার পর বাংলার পশ্চিমাঞ্চলে গেরুয়া শিবিরের রসদে একটু হলেও টান পড়ারই কথা। শুধু তা নয়, স্থানীয় মানুষের মধ্যেও এই ভোট ফলাফলের প্রভাব পড়তেই পারে।

    আরও পড়ুন- আরও ফিকে হল গেরুয়া, ভারতের ম্যাপে এখন নানা রঙের সমাহার

    তবে বোধকরি তৃণমূলের স্বস্তির কারণ এটুকুতেও সীমাবদ্ধ নয়। বরং বাংলার শাসক দল আরও বড় কিছু দেখার চেষ্টা করছে। তা হল—লোকসভা ভোটে এই ঝাড়খণ্ডেই ১৪ টি আসনের মধ্যে একা ১১ টি আসনে জিতেছিল বিজেপি। তাদের শরিক আজসু জিতেছিল একটি আসনে। মাত্র ৬ মাসের মধ্যে কেন এমন কাঙাল অবস্থা হল গেরুয়া দলের? এবং তা পর্যালোচনা করতে গিয়ে তাঁরা এও দেখছেন, ঠিক একইরকম কাণ্ডই তো ঘটেছিল হরিয়ানা ভোটেও। মহারাষ্ট্রেও সরকার গড়তে পারেনি বিজেপি। তা হলে কি নরেন্দ্র মোদীর মুখ দিয়ে আর রাজ্যের ভোটে জেতা যাচ্ছে না।

    হ্যাঁ তাই। চোদ্দ সালে লোকসভা ভোটের পর কিন্তু এমন ছিল না। নরেন্দ্র মোদী তখন সবে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ‘আচ্ছে দিন’-এর স্বপ্নে বুঁদ হয়ে আছে গোটা দেশ। দেখা গিয়েছিল, তাঁর মুখ সামনে রেখেই একের পর এক রাজ্য জিতে নিচ্ছে বিজেপি। উত্তরপ্রদেশের মতো বড় রাজ্যেও সেই এক রসায়নই সামনে রেখেছিল গেরুয়া শিবির।

    কিন্তু উনিশের ভোটের পর আর তা আর হচ্ছে না। একের পর এক রাজ্যে আঞ্চলিক আবেগ, চাহিদা ও রাজনীতি চাইছে স্থানীয় মজবুত নেতা। তা না থাকাতেই বিপর্যয় হয়েছে, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র ও ঝাড়খণ্ডে। হরিয়ানায় মনোহর লাল খট্টর, মহারাষ্ট্রে দেবেন্দ্র ফড়নবীশ বা ঝাড়খণ্ডে রঘুবর দাসকে কোনওভাবেই মজবুত নেতা বলা যায় না। নিজের রাজ্যেই তাঁদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব মজবুত নয়। বরং সাধারণ ধারনা হল, তাঁরা দিল্লির অঙ্গুলিহেলনে চলেন। নিজেদের কোনও বক্তব্য নেই। ফলে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে তাঁরা বেসামাল হয়ে পড়ছেন।

    তৃণমূলের বড় স্বস্তির কারণ সম্ভবত এটাই। দিদির অনুগামীরা আন্দাজ করছেন, লোকসভা ভোটে মোদীর সামনে কোনও গ্রহণযোগ্য মুখ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে না পারায় তিনি একাই তিনশ পার করেছেন ঠিকই। কিন্তু রাজ্যের ভোটে বিজেপির মুখ নেই। বাংলাতেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারার মতো কোনও মুখই নেই এখনও পর্যন্ত। ফলে এই এক অ্যাডভান্টেজই উতরে দিতে পারে একুশের ভোট। ফের ক্ষমতায় আসতে পারে তৃণমূল। বস্তুত প্রশান্ত কিশোরও দিদির ব্র্যান্ড মজবুত করার কাজটাই করছেন।

    আরও পড়ুন- ‘নাগরিকদের পক্ষে’ রায় দিয়েছে ঝাড়খণ্ড, হেমন্ত সোরেনকে শুভেচ্ছা বার্তা মমতার

    এখন প্রশ্ন, তাহলে কি একুশে তৃণমূলের কোনও ঝুঁকি রইল না।

    সে কথাও বলা যায় না। মোদী-অমিত শাহর গত পাঁচ বছরের রাজনীতি পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে—ভোটে বারবার তাঁরা মেরুকরণের চেষ্টা করেছেন। সেই মেরুকরণের কোনও বাঁধা গৎ নেই। কখনও তা উন্নয়নের প্রশ্নকে সামনে রেখে তাঁরা করেছেন, কখনও দুর্নীতির প্রশ্ন সামনে রেখে। এবং অবশ্যই কখনও ধর্মীয় মেরুকরণ ঘটানোর চেষ্টা করেছেন তাঁরা।

    সন্দেহ নেই, ঝাড়খণ্ডে বিপর্যয়ের পর বিজেপি আরও সতর্ক হতে চাইবে। ফলে আরও গুরুত্ব দেবে একুশের ভোটকে। কারণ, প্রশান্ত কিশোররাও জানেন পরবর্তী লোকসভা ভোটের আগে দুটি রাজ্যে যেভাবেই হোক ক্ষমতায় আসতে চায় বিজেপি। এক উত্তরপ্রদেশ এবং দুই পশ্চিমবঙ্গ। কারণ, এই দুই রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে পারলে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটটাও তাদের কাছে সহজ হয়ে যেতে পারে।

    ফলে ধরে নেওয়া যেতেই পারে নাগরিকত্ব আইন থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে বাংলায় তীব্র মেরুকরণের চেষ্টা করতে পারে বিজেপি। তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোট ধরে রাখার তাগিদ রয়েছে। কারণ, সেটাই তাদের বড় পুঁজি। ফলে তা ধরে রাখার পাশাপাশি সংখ্যাগুরুর আবেগ অক্ষুণ্ণ রাখাও তৃণমূলের কাছে এখন একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

    আরও পড়ুন- ঝাড়খণ্ডে ভরাডুবি বিজেপির, আদিবাসী আবেগে ভর করে মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন হেমন্ত সোরেন

    দ্বিতীয়ত, বিজেপি যে রাজ্যেই রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেছে, দেখা গিয়েছে সেখানে শাসক দল তথা বিজেপি বিরোধী দলের নেতা-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কাকতালীয় ভাবেই দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়ে যায় বা হঠাৎ করে তদন্ত গতি পায়। বাংলায় সারদা,রোজভ্যালি থেকে শুরু করে চিটফান্ড দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতা ও আমলার বিরুদ্ধে। তা ছাড়া আয় বহির্ভূত সম্পত্তির অভিযোগও রয়েছে। সুতরাং কে বলতে পারে সেসব ব্যাপারে তদন্ত ফের গতি পাবে না! এলোপাথাড়ি সেসব শুরু হলে তৃণমূলের রাজনৈতিক আন্দোলন ধাক্কা খাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বইকি।

    তৃতীয়ত, আঠারো সালের শেষ দিক থেকেই একের পর এক রাজ্যের ভোট একটা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। তা হল, সুশাসনের অভাব হলে ভোটাররা ছেড়ে কথা বলছে না। মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগড়, রাজস্থান, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড—এই সব রাজ্যেই শাসক দলের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা ভোটে একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। ঝাড়খণ্ডে আদিবাসী তথা জনজাতিদের বিপুল ক্ষোভ ছিল রঘুবর দাস সরকারের বিরুদ্ধে। সুতরাং দশ বছর বাংলায় শাসন করার পর তৃণমূলের বিরুদ্ধেও প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। এমনিতে অনেকের মতে, লোকসভা ভোটেই জাতীয় ইস্যুর তুলনায় স্থানীয় স্তরে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা তৃণমূলের ১৮টি আসনে পরাজয়ের নেপথ্যে বড় কারণ ছিল।

    সব মিলিয়ে ঝাড়খণ্ডের ভোট ফলাফল আশা-আশঙ্কার দোলাচলের মধ্যেই রাখল তৃণমূলকে। এও বোঝা যাচ্ছে, আগামী দিনে বাংলায় তৃণমূল-বিজেপি রাজনৈতিক লড়াই হবে জবরদস্ত।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More