মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১
TheWall
TheWall

কে বলতে পারে মমতাই হবেন না অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার!

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

শঙ্খদীপ দাস 

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের উপর চিত্রায়িত ‘দ্য অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ ছবিটির মুক্তিকে ঘিরে কদিন আগেই খুব হই চই হল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন বলেছিলেন, এত হল্লার কী আছে? সব প্রাইম মিনিস্টারই তো অ্যাকসিডেন্টাল!

রাজীব গান্ধী, বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহ, নরসিংহ রাও, দেবগৌড়া, চন্দ্রশেখর এমনকি মনমোহন সিংহকে নিয়ে এ মন্তব্য করা যেতেই পারে! নরেন্দ্র মোদীকে অবশ্য সে দলে ফেলা যায় না। অনেকটা প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনের কায়দায় মানুষের ভোট নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাপটে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু তার পর? এখন মূল প্রশ্ন হল, উনিশের ভোটের পর কে প্রধানমন্ত্রী হবেন? নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেউ, নাকি এ বার ঘটনাচক্রে কারও ভাগ্যে সাউথ ব্লকের চেয়ার লেখা রয়েছে!

শনিবার ব্রিগেডে জনসভা ডেকেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার আগে এই আলোচনা স্বাভাবিক ভাবেই প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে তৃণমূলনেত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে যখন তামাম বিরোধী দলের তাবড় নেতারা কলকাতায় পৌঁছতে শুরু করেছেন। বস্তুত কেন্দ্রে দ্বিতীয় সরকারে তৃণমূল ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক। লোকসভায় আসন সংখ্যার ভিত্তিতে বর্তমানে বিজেপি, কংগ্রেস, এআইডিএমকে-র পর চতুর্থ বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। ফলে জাতীয় রাজনীতিতে মমতার প্রাসঙ্গিকতা নতুন নয়। কিন্তু এ বার যে তা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শনিবারের ব্রিগেড তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত হবে। স্পষ্ট বার্তা দেবে, সর্বভারতীয় রাজনীতিতে মোদী বিরোধী লড়াইতে অন্যতম মুখ তিনি।

কিন্তু তার পর? আঞ্চলিক দলের এই নেত্রী কি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন?

এর উত্তর হ্যাঁ বা না-তে দেওয়া এখনই কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। ইভিএম না খোলা ইস্তক, সেই রহস্য জিইয়েই থাকবে। তবে হ্যাঁ, ভোট পরবর্তী কিছু সম্ভাবনার কথা এখন আলোচনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ কী হলে কী হবে? যেমন, গতবারের তুলনায় আসন কমলেও বিজেপি যদি দু’শোর বেশি আসন পায়, তা হলে সন্দেহাতীত ভাবেই ফের গেরুয়া শিবিরের নেতৃত্বে কেন্দ্রে জোট সরকার তৈরি হবে। সেই সরকারে ভিতর থেকে বা বাইরে থেকে মমতার সমর্থনের প্রশ্নও ওঠে না। অনেক রাজনৈতিক পণ্ডিতের মতে, বিজেপি ১৭০ বা তার বেশি আসন পেলেও টেনেটুনে সরকার বানিয়ে ফেলবে। কিন্তু যদি ১৬০ বা তার কম আসন পায়, তা হলে সরকার গড়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

জাতীয় স্তরে বিজেপি-র আসন কমার অর্থই হল, কংগ্রেসের আসন বাড়া। এবং কংগ্রেসের আসন বেড়ে যদি ২০০৯ এর মতো পরিস্থিতি হয়, তা হলে ধরে নেওয়া যেতেই পারে রাহুল গান্ধীই দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। কিন্তু আপাতত তেমন কোনও সম্ভাবনাই দেখতে পাচ্ছেন না পর্যবেক্ষকরা। অধিকাংশেরই মতে, কংগ্রেসের আসন আগের তুলনায় অনেকটা বাড়বে ঠিকই। কিন্তু তা ১২০-র বেশি কখনওই হবে না।

এ ব্যাপারে এখন থেকেই স্পষ্ট বলে দেওয়া যায়, ১২০ কেন, কংগ্রেস যদি ১৬০ বা ১৭০টি আসনও পায়, তা হলেও প্রধানমন্ত্রী হতে চাইবেন না রাহুল গান্ধী। কেন? কারণ রাহুল জানেন, সেই সরকার চালানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। নামে সরকার থাকবে, কিন্তু শরিকদের টানাপোড়েনে কিছুই করতে পারবেন না তিনি। এবং একমাত্র সেই পরিস্থিতিতেই আরও একবার নতুন কোনও ‘অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ পেতে পারে দেশ। আঞ্চলিক দলের কোনও নেতা বা নেত্রীর নেতৃত্বে জোট সরকার, তাতে বাইরে থেকে সমর্থন করছে কংগ্রেস।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে সুযোগ তৈরি হতে পারে তখনই। রাজনীতিতে উচ্চাকাঙ্খা অমূলক নয়। থাকাটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে সর্বভারতীয় স্তরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন পোড় খাওয়া নেতা এখন হাতেগোণা। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে মোদীরও সেই অভিজ্ঞতা ছিল না। অনেকের মতে, উনিশের ভোট পরবর্তী সেই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশা করেই শনিবার ব্রিগেড সমাবেশের ডাক দিয়েছেন মমতা। এবং এই কারণেই মমতা বার বার বলছেন, বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ ভাবে ভোটে লড়ুক। যার যেখানে শক্তি, সে সেখানে বিজেপি-কে রুখে দিক। কিন্তু এখনই জোটের কোনও নেতা বাছার দরকার নেই। রাহুলের নেতৃত্ব মেনে নিতে সেই কারণেই নারাজ মমতা।

প্রশ্ন হল, কিন্তু ভোট ফলাফলে যদি তেমন কোনও সম্ভাবনা তৈরি না হয়! তা হলে? এতো পরিশ্রম পণ্ডশ্রম হল না?

বলে রাখা ভাল, রাজনীতিতে কোনও ধনই যায় না ফেলা! উনিশের ভোটের পর কী হবে তা পরে দেখা যাবে, কিন্তু মমতা জানেন শনিবার ব্রিগেডের সভা সফল হলে লোকসভা ভোটে তাঁর হাতে গরম ফল পেতে পারেন তিনি। রাজ্য রাজনীতিতে তিনি এই বার্তাই দিতে পারবেন যে, উনিশে প্রধানমন্ত্রী পদের অন্যতম দাবিদার তিনি। তার পর বাংলা ও বাঙালির আবেগ উস্কে মানুষের কাছে ভোট চাইবে তৃণমূল। যা ইভিএমে কিছুটা হলেও তাদের বাড়তি মাইলেজ দিতে পারে বলে আশা তৃণমূলের। দ্বিতীয়ত, বাংলায় সংখ্যালঘুরা তৃণমূলের বড় ভোট ব্যাঙ্ক। কিন্তু লোকসভা ভোটের সময় বরাবরই সংখ্যালঘুদের কিছু ভোট কংগ্রেস পায়। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে গত লোকসভা ভোটে কোথাও কোথাও তৃণমূলের থেকে অনেক বেশি সংখ্যালঘু ভোট পেয়েছিল কংগ্রেস। কিন্তু শনিবারের ব্রিগেড থেকে মমতা দেখাতে চাইবেন বাংলায় মোদী বাহিনীকে ঠেকাতে পারেন তিনিই। তাই কংগ্রেসও তাঁর মঞ্চে সামিল হয়েছে। এবং এ সবের ফলে যদি উনিশেও চোদ্দর ভোটের মতো তৃণমূল ৩৪ টা বা তার বেশি আসন পায়, তা হলে জাতীয় রাজনীতিতে এমনিতেই দর থাকবে। বিজেপি ও কংগ্রেসের পর তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসাবে মর্যাদা থাকবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের। কেন্দ্রে জোট সরকারের শরিক হলে নিয়ন্ত্রণের রাশ থাকবে দিদির হাতেই। আর কংগ্রেসের সমর্থনে আঞ্চলিক দলের কোনও নেতা বা নেত্রীর সমর্থনে জোট সরকার গঠনের পরিস্থিতি হলে তো কথাই নেই। মমতাই হয়ে যেতে পারে পরবর্তী অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার।

Share.

Comments are closed.