শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৪

অগুস্তা লাও, রাফায়েল ঠেকাও! উনিশের যুদ্ধ

শঙ্খদীপ দাস 

অগুস্তা ঘুষ কাণ্ডে অভিযুক্ত ব্রিটিশ দালাল ক্রিশ্চিয়ান মিশেল জেমসকে দুবাই থেকে প্রত্যর্পণ করে সবে দিল্লি আনা হয়েছে। সিবিআই তাঁকে দশ দিনের জন্য হেফাজতে নিয়েছে। ওমনি বুধবার রাজস্থানে ভোট প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বভাবগত ভাবে হাতে তালি দিতে দিতে বলেছেন, “আজকের খবরের কাগজ পড়েছেন তো! হেলিকপ্টার কেলেঙ্কারিতে একটা দালালকে ধরে এনেছি। এই রাজদারকে (যিনি রহস্যের হদিশ জানেন) জেরা করে দেখুন না কত নামদারের নাম বেরিয়ে পড়ে!”

ক্রিশ্চিয়ানোকে ধরে যখন আনা হয়েছে, তখন তদন্ত তো হবেই। কিন্তু যে ভঙ্গিমায় হাতে তালি দিয়েছেন মোদী, তাতে যেন ঠাওর হচ্ছে নামদারদের নাম তাঁর জানাই রয়েছে। শুধু ক্রিশ্চিয়ানোর পেট থেকে সেটা টেনে বের করার অপেক্ষা!

 

রাফায়েল

তা ভালো! দুর্নীতির রহস্য উন্মোচন করা দেশের জন্য সব সময়েই মঙ্গলের। অগুস্তারও হিল্লে হলে মন্দ কী? বাস্তব যদিও অন্য কথা বলে! অতীতে বফর্স কেলেঙ্কারি থেকে বাজপেয়ী জমানায় কফিন কেলেঙ্কারি পর্যন্ত কোনও প্রতিরক্ষা দুর্নীতিরই ফয়সালা হয়নি। কেউ জেলেও যায়নি। শুধু প্রতিরক্ষা কেন! টুজি স্পেকট্রাম কাণ্ডে ১ লক্ষ ৭৬ হাজার কোটি টাকা চুরি হয়েছে বলে যে বিজেপি দুনিয়া মাথায় করেছিল, তাঁদের সবথেকে শক্তিশালী, ক্ষুরধার, সৎ, সাহসী প্রধানমন্ত্রীও গত পাঁচ বছরে সেই দুর্নীতি কাণ্ডে কাউকে সাজা দিতে পারেননি। প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস হয়ে গিয়েছেন সব্বাই।

সে যাক। কিন্তু অগুস্তার ব্যাপারটা কী? মোদীই বা কেন লটারি লেগে যাওয়ার মতই উৎসাহী।

ব্যাপারটা সোজা সাপ্টা। ফ্রান্সের দাসো এভিয়েশন থেকে ফোর্থ জেনারেশন যুদ্ধবিমান রাফায়েল কিনেছে মোদী সরকার। কংগ্রেসের অভিযোগ সে চুক্তিতে বড় রকমের দুর্নীতি হয়েছে। এবং সেই দুর্নীতির ষড়যন্ত্র করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। কেলেঙ্কারির কালি মাখাতে চেয়ে মোদীকে উদ্দেশ করে নতুন স্লোগানও তুলেছেন রাহুল গান্ধী। বলছেন, ‘চৌকিদার হি চোর হ্যায়!’ এবং গত কয়েক মাসে দেখা গিয়েছে রাহুলের সেই মিসাইল সামলাতে গিয়ে হিমসিম অবস্থা বিজেপি-র। মোকাবিলা করতে গিয়ে একের পর এক যা তথ্য বেরিয়ে আসছে, তাতে উল্টে প্রকট হচ্ছে মোদী সরকারের মধ্যেই স্ববিরোধ ও গরমিল।

সুতরাং অগুস্তা লাও, রাফায়েল ঠেকাও! বিশেষ করে ক্রিশ্চিয়ানোর ডায়েরিতে যখন রথি মহারথীদের নাম লেখা রয়েছে বলে অভিযোগ। বিজেপি এরই মধ্যে বলতে শুরু করেছে, ডায়েরিতে নাকি সনিয়া-মনমোহনেরও নাম লেখা রয়েছে।

ফলে দেওয়াল লিখন পরিষ্কার,- এখন থেকে উনিশে লোকসভা ভোট পর্যন্ত জবরদস্ত লড়াই হবে সমরাস্ত্র নিয়ে। একদিকে রাফায়েল, অন্যদিকে অগুস্তা। বলাবাহুল্য রাফাল তরজা ঠেকাতে মোদীর তর সয়নি। বুধবারই অগুস্তা প্রসঙ্গ হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছেন। যেন তেন প্রকারে যদি সনিয়াকে একবার কাঠগড়ায় তোলা যায়, তা হলেই…

কিন্তু তা কি আদৌ সম্ভব? নাকি শুধু ভোট প্রচারে কাদা ছোঁড়াই সার হবে। শেষমেশ মালমশলা কিছুই বেরোবে না! ভুলে গেলে চলবে না অগুস্তা কেলেঙ্কারি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ গোড়ায় ইতালিতেই উঠেছিল। সংস্থার সিইও-র বিরুদ্ধে। কিন্তু সেখানকার সুপ্রিম কোর্টই শেষে রায় দিয়েছে কোনও দুর্নীতিই হয়নি।

এমআই ১৭

এখন প্রশ্ন অগুস্তা হেলিকপ্টার চুক্তিতে আদতে কী ঘটেছিল? সেই সহজ পাঠের গল্পটা কী?

দেশের ভিভিআইপি-দের জন্য বিশেষ বিমান ও হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা অনেক দিন ধরেই রয়েছে। এই সব বিমান ও হেলিকপ্টার যতটা না বিলাসের জন্য, তুলনায় অনেক বেশি নিরাপত্তার কারণে জরুরি। কারণ তাতে অ্যান্টি মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম, সেন্সর সহ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ফিটেড থাকে। রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর থেকে ধারাবাহিক সব সরকারই এ ব্যাপারে সজাগ। প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপের নিরাপত্তায় যাঁরা রয়েছেন যেমন গান্ধী পরিবারের সদস্যরা, কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের এ দেশে সফরের জন্য এ ধরনের বিমান ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়।

অতীতে বাজপেয়ী জমানায় ভিভিআইপি-দের জন্য ১৬ আসনের এমব্রেয়ার বিমান কেনা হয়েছিল। কিন্তু এর পরেও প্রয়োজন ছিল কয়েকটি হেলিকপ্টারের। কেন না ভিভিআইপি-দের জন্য যে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হত, তাতে আওয়াজ হতো খুবই। ওই কপ্টারগুলি ছিল রাশিয়ার তৈরি এমআই ১৭ গোত্রের। কপ্টারগুলি গুণগত ভাবে ভাল হলেও তাদের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। তাই ইউপিএ জমানায় ঠিক হয় ভিভিআইপি-দের জন্য ১২ টি হেলিকপ্টার কেনা হবে।

সিকরস্কি

কার থেকে কেনা হবে?

এখানেই আসে অগুস্তা ওয়েস্টল্যান্ড নামে একটি এভিয়েশন কোম্পানির নাম। যেটি ব্রিটিশ ও ইতালীয় প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও একটি জটিলতা তৈরি হল। শুরুতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক প্রস্তাব দিয়েছিল যে ভিভিআইপি-দের জন্য এমন হেলিকপ্টার কেনা হবে যেগুলি ৬ হাজার মিটার বা প্রায় ২০ হাজার ফুট উচ্চতা পর্যন্ত যেতে পারে। কিন্তু দেখা গেল সেই শর্ত অনেকেই পূরণ করতে পারছে না। একমাত্র মার্কিন এভিয়েশন সংস্থা লকহিড মার্টিনের তৈরি সিকরস্কি কপ্টারই অতো উচ্চতায় যেতে সক্ষম। সুতরাং দরপত্র ডাকার পর স্রেফ একটি নামই উঠে এলো। কোনও প্রতিযোগিতাই নেই। কোনও তুল্যমূল্য বিচারও করা যাচ্ছে না তাই। এবং সে কারণে তখন এ প্রশ্নও উঠল, ৬ হাজার মিটার বা ২০ হাজার ফুট উঁচুতে উড়তে পারবে এমন কপ্টার কেন প্রয়োজন? সিয়াচেনে বা তারও উপরে না যেতে হলে ভিভিআইপি-দের জন্য এমন কপ্টার প্রয়োজন নেই। ভিভিআইপি কপ্টার সাড়ে চার হাজার মিটার তথা ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে পারলেই যথেষ্ট। শর্ত এ ভাবে লঘু করায় প্রতিযোগিতায় আরও কয়েকটি সংস্থার নামে প্রতিযোগিতায় ঢুকে পড়ল। অগুস্তার নামও ঢুকে পড়ল প্রতিযোগিতায়। তার পর ‘সব দিক বিচার করে’ ইউপিএ সরকারের নিরাপত্তা বিষয়ক ক্যাবিনেট কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হল অগুস্তা হেলিকপ্টারই কেনা হবে।

কিন্তু চুক্তিকে ঘিরে মূল অভিযোগ ও সন্দেহ তৈরি হল একটাই ব্যাপারে। তা হল, অগুস্তা ওয়েস্টল্যান্ডকে বরাত পাইয়ে দেওয়ার জন্যই কপ্টারের উড়ান ক্ষমতা ৬ হাজার মিটার থেকে কমিয়ে সাড়ে চার হাজার করা হয়েছে। যদি তাই হয়, তা হলে কেন তা করা হয়েছে?

অবশ্যই ‘কাট মানি’ খাওয়ার জন্য। মোদ্দা কথায়, প্রতিরক্ষা-ঘুষ। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে সিবিআই মামলা শুরু করে ইউপিএ আমলেই। তদানীন্তন বায়ুসেনা প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল এস পি ত্যাগী, তাঁর ভাইপো সহ ৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়। সেই সঙ্গে উঠে আসে প্রতিরক্ষা দালাল ক্রিশ্চিয়ান মিশেলের নাম। অগুস্তা ওয়েস্টল্যান্ড যাতে এই বরাত পায় সে জন্য তিনি নাকি প্রায় ৩০ হাজার মিলিয়ন ডলার কিছু ভারতীয় রাজনীতিক, প্রতিরক্ষা অফিসার এমনকী কয়েক জন সাংবাদিককে ঘুষ হিসাবে দিয়েছিলেন। একটি ডায়েরিতে সাংকেতিক ভাবে সে সব নাকি লিপিবদ্ধ রয়েছে। এমনকী অগুস্তার কর্তাকে ক্রিশ্চিয়ান মিশেলের পাঠানো একটি নোটও পাওয়া যায় তদন্তে। যাতে বলা হয়েছে, ‘আপনারা সনিয়া-মনমোহনের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করুন। ওঁরাই ঠিক করবেন।’

কিন্তু এতেই কি দুর্নীতি প্রমাণ হয় সনিয়া-মনমোহনের বিরুদ্ধে? কেন্দ্রে যখন ইউপিএ সরকার চলছে তখন সনিয়া-মনমোহনই যে সিদ্ধান্ত নেবেন তা তো বলাই বাহুল্য।

তবে এ তো গেল ভারতের দিকের ব্যাপার স্যাপার। ও দিকে ইতালিতেও তখন জটিলতা তৈরি হতে শুরু করেছে। বস্তুত অগুস্তা ওয়েস্টল্যান্ড চুক্তিতে কাট মানি দেওয়া হয়েছে বলে প্রথম অভিযোগ উঠেছিল ইতালিতেই। বলা হয়েছিল, সংস্থার প্রেসিডেন্ট গুসিপো ওরসি এবং সিইও ব্রুনো স্প্যাগনোলিনি ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে কমিশন দিয়েছেন। কিন্তু সেখানে উপর্যুপরি আদালতে শুনানিতে সেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ফলে ওই দুই কর্তাকেই পরে নির্দোষ বলে ঘোষণা করে ইতালির সুপ্রিম কোর্ট।

 

কিন্তু নয়াদিল্লি তা মানতে চায়নি। বরং ইউপিএ সরকারই বলে, চুক্তিতে দুর্নীতি হয়েছে কিনা তা নিয়ে তদন্ত হবে। এবং মনমোহন সিংহ সরকারের নির্দেশেই সিবিআই তদন্ত শুরু করে দেয়। শুধু তা নয়, অগুস্তার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে নয়াদিল্লি। সেই সঙ্গে চুক্তির জন্য আগাম যে টাকা অগুস্তাকে দেওয়া হয়েছিল তা উদ্ধার করে। অগুস্তার ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি পর্যন্ত আটকে দেয়। এমনকী যে তিনটি হেলিকপ্টার অগুস্তা ততদিনে পাঠিয়ে দিয়েছিল তাও আটকে রাখে নয়াদিল্লি। এবং এ সবই হয়েছে মনমোহন জমানাতেই। ফলে অগুস্তা চুক্তিতে নয়াদিল্লির শেষ মেশ কোনও ক্ষতি হয়নি। উল্টে এক রকম লাভই হয়েছে।

অগুস্তা

তার পরেও তদন্ত থামেনি। সিবিআই এখনও যা হাতে পায়নি, তা হল কাট মানি বা কাট ব্যাকের সম্পর্কে কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য। কারণ, ডায়েরিতে কিছু লেখা থাকলে তা তদন্তে সাহায্য করতে পারে ঠিকই, কিন্তু মানি ট্রেল প্রমাণ না করতে পারলে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা মুশকিল। সম্ভবত ক্রিশ্চিয়ান মিশেলকে জেরা করে সেই মানি ট্রেল জানারই চেষ্টা করবে সিবিআই। মিশেলের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের লেনদেন মিলিয়ে দেখতে হবে। ঝক্কি কম নয়। এবং তা সময়সাপেক্ষও বটে।

আগেই বলেছি, টুজি স্পেকট্রাম কাণ্ড থেকে হাওয়ালা কাণ্ড —- কোনও ক্ষেত্রেই মানি ট্রেল প্রমাণ করা যায়নি। ডায়েরিতে লেখা তথ্য তদন্ত করে দেখেও প্রকৃত টাকার লেনদেনের হদিশ পায়নি সিবিআই। এ ক্ষেত্রেও তারা কতটা সফল হবে সে ব্যাপারে তাই গোড়া থেকেই সংশয় রইল।

কিন্তু তাতে কি! গোটা ব্যাপারটা যতটা না তদন্তের স্বার্থে হচ্ছে, তার বেশি হচ্ছে রাজনীতির স্বার্থে। অগুস্তা দিয়ে এখন রাফায়েলকে ঠেকাতে চাইছেন মোদী। দেখা যাক উনিশে কে জেতে?

Shares

Comments are closed.