মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৯

২৪৪টি বেডের রাজ্যের প্রথম লেভেল-১ ট্রমা কেয়ার সেন্টার চালু হলো এসএসকেএমে, তবে পূর্ণাঙ্গ পরিষেবা মিলছে কি?

দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাজ্য জুড়ে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সংকট মিটেছে। চিকিৎসকদের ঘাটতি মেটানোর চেষ্টাও চলছে। তার মধ্যে সোমবার ১ জুলাই জাতীয় ডাক্তার দিবসে ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এসএসকেএমের বিসি রায় ট্রমা কেয়ার সেন্টারের উদ্বোধন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানিয়েছেন, ২৪৪টি শয্যার এই ট্রমা কেয়ার রাজ্যের প্রথম লেভেল-১ ট্রমা কেয়ার সেন্টার, দেশের প্রথম সারির ট্রমা কেয়ার সেন্টারগুলির মধ্যেও আধুনিকতম। তবে সূত্রের খবর,  পূর্ণাঙ্গ ইউনিট চালু হলেও অভিজ্ঞ ডাক্তার ও নার্সদের অভাব রয়েছে এই ট্রমা কেয়ার সেন্টারে। বস্তুত, প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু হলেও, ‘ট্রমা কেয়ার টিম’ এখনও সে ভাবে গড়ে ওঠেনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্রুত ঘাটতি মেটানোর আশ্বাস দিলেও, প্রশ্নচিহ্ন একটা থেকেই যাচ্ছে।

এ দিন বিসি রায় ট্রমা কেয়ার সেন্টারের উদ্বোধন করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এটি রাজ্যের প্রথম লেভেল-১ ট্রমা কেয়ার সেন্টার। রাজ্যের নামী সরকারি চিকিৎসকরা এখানে পরিষেবা দেবেন। জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সরকারি হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজেগুলির চিকিৎসকদের আমরা বিশিষ্ট চিকিৎসা সম্মান প্রদান করবো।”

প্রায় এক লক্ষ বর্গ ফুট জায়গা নিয়ে তৈরি এসএসকেএমের এই ১১ তলা ভবন। গোটা প্রকল্পে মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। মোট ২৪৪টি বেডের এই ট্রমা কেয়ার সেন্টারে প্রাথমিক ভাবে ১৪০টি বেড চালু করা হয়েছে বলে খবর। ২৪ ঘণ্টা পরিষেবা দেওয়ার জন্য এই ট্রমা কেয়ারে ছ’টি অপারেশন থিয়েটার ও পোর্টেবল আল্ট্রাসোনোগ্রাফি-সহ রয়েছে বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম। এতদিন ইমার্জেন্সি নিউরোসার্জারির চটজলদি পরিষেবা পাওয়া যেত এসএসকেএমে, এ বার যে কোনও জরুরি অবস্থায় দ্রুত পরিষেবার জন্যই এই ট্রমা কেয়ার খোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

কী কী সুবিধা থাকছে এই ট্রমা কেয়ার সেন্টারে—

মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, প্রথমত, রাজ্যের প্রথম লেভেল-১ ট্রমা কেয়ার সেন্টার এটি। দেশের প্রথম সারির ট্রমা কেয়ার সেন্টারগুলির মধ্যে অন্যতম। এই প্রথম সব রকমের আধুনিক পরিষেবাযুক্ত পূর্ণাঙ্গ ইউনিট তৈরি করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, দিল্লির এইমস-এর ধাঁচে প্রাইভেট ওয়ার্ড তৈরি করা হচ্ছে। প্রায় ১৫০ বেড চালু করা হচ্ছে, যেখানে টাকা দিয়ে রোগীরা প্রাইভেট পরিষেবা পাবেন। রাজ্যের সরকারি চিকিৎসকরাই এই পরিষেবা দেবেন। রোগীরা এখন যেমন বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করান, তেমনিই এখানে অভিজ্ঞ সরকারি ডাক্তারদের পরামর্শ ও চিকিৎসা পাবেন। এখান থেকে যে টাকা উঠবে তার ৭৫ শতাংশ হাসপাতালের পরিকাঠামোর জন্য খরচ করা হবে, বাকি ২৫ শতাংশ পাবেন ডাক্তার-নার্সেরা।

তৃতীয়ত, ধাপে ধাপে গোটা রাজ্যে এমন মডিউল তৈরি করা হবে। যেমন মানুষকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে তেমনই হবে। নামী ও অভিজ্ঞ ডাক্তাররাই সেখানে চিকিৎসা করবেন। পাশাপাশি, টাকা দিয়ে চিকিৎসা করানোর জন্য প্রাইভেট ইউনিটও থাকছে।

চতুর্থত, প্রায় দেড়শো শয্যা নিয়ে তৈরি দিল্লির এইমস হাসপাতালের ট্রমা বিভাগে রোগীর শারীরিক অবস্থা বুঝে লাল, হলুদ, সবুজ ওয়ার্ডে দেওয়া হয়। প্রত্যেক ওয়ার্ডের জন্য আলাদা চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানের দল রয়েছে। অন্য বিভাগ থেকে ছুটে গিয়ে ট্রমা কেয়ারের রোগী দেখা যায় না। এসএসকেএমের ট্রমা কেয়ারেও এমন ব্যবস্থা চালু হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। আপাতত ‘ট্রমা কেয়ার টিম’ তৈরি না হলেও প্রায় ৭৬০ জন ডাক্তার ও নার্সের পদের জন্য নিয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী কথায়, এসএসকেএমের ক্যানসার ইউনিটকে অনেক পরিণত হতে হবে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের পরে ক্যানসার রোগীদের কেন বাঁচানো যায় না সেটা দেখতে হবে চিকিৎসকদের। নতুন কী কী গবেষণা বা আবিষ্কার হচ্ছে সেই বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকতে হবে ডাক্তারদের।

এই ট্রমা কেয়ার সেন্টার ত্রিস্তরীয় জরুরি বিভাগ থাকবে বলে জানা গেছে। পিপিআর মডেলের এমআরআই, সিটি স্ক্যানের পাশাপাশি থাকবে, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, ডিজিটাল রেডিওগ্রাফি, পোর্টেবল এক্স-রে, ইউএসজি, পয়েন্ট অব কেয়ার ল্যাবোরেটরি ও ক্যাথ ল্যাব।

কোর টিমে যাঁরা থাকছেন

  • অধ্যাপক ডঃ এম এল সাহা (জেনারেল সার্জারি)
  • অধ্যাপক ডঃ সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়, নিউরোসার্জারি
  • ডঃ তন্ময় দত্ত, অর্থোপেডিক্স
  • ডঃ রজত চৌধুরী, অ্যানাসথেসিওলজি

২০১১ সাল থেকে আর জি করে ট্রমা কেয়ার তৈরির পরিকল্পনা শুরু হয়। ২০০টি শয্যা রাখার পরিকল্পনা থাকলেও আর্থিক সঙ্কটের জেরে ২০১৫ সালে প্রাথমিক ভাবে ৫০টি শয্যা নিয়ে ট্রমা কেয়ার পরিষেবা চালু হয়। পরে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পূর্ণাঙ্গ ট্রমা কেয়ার পরিষেবা চালু করেন। কিন্তু ২০১৯ সালেও কোনও পৃথক ট্রমা কেয়ার টিম তৈরি করতে পারেনি এই হাসপাতাল। স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছে, ট্রমা কেয়ারের জন্য কয়েক জন পৃথক চিকিৎসক, অন্তত ৫০ জন প্রশিক্ষিত নার্স এবং ৪৫ জন টেকনিশিয়ান প্রয়োজন। যা আর জি করে নেই। তা ছাড়া, আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছনো রোগীকে অ্যাম্বুল্যান্স থেকে বার করে ট্রমা কেয়ারে নিয়ে যাওয়ার জন্যও প্রয়োজন প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর।

দুর্ঘটনার পরবর্তী এক ঘণ্টাকে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলা হয়। বিশেষজ্ঞেরা বলেন, ওই সময়ের মধ্যে রোগীকে উদ্ধার করে চিকিৎসা শুরু করা গেলে বড় বিপদ এড়ানো যায়। কিন্তু অভিযোগ, দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম বা মেরুদণ্ডে চোট পাওয়া রোগীদের অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নামিয়ে ট্রমা কেয়ারের ভিতরে নিয়ে যাওয়া অথবা তাঁদের সিটি স্ক্যান, এমআরআই করাতে নিয়ে যাওয়া— সবই করেন রোগীর পরিজনেরা। ট্রমা কেয়ারের রোগীকে কী ভাবে সামলানো যাবে তার অভিজ্ঞতা তাঁদের নেই। পাশাপাশি, অভিজ্ঞ ডাক্তার-নার্সদের অভাব থাকে ট্রমা কেয়ারে।

এই সব ঘাটতি পূরণের জন্যই এসএসকেএমের ট্রমা কেয়ার সেন্টারটিকে উন্নতমানের করে গড়ে তোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিকর্তা (শিক্ষা) প্রদীপ মিত্র। তিনি বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী যেমন বলেছেন, সেইমতো এসএসকেএমের যে ক্যানসার ইউনিট সেটাকেই আমরা নতুন জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।’’

পরিকাঠামো হলো, তাকে ঢেলে সাজানো হলো, তবে পূর্ণাঙ্গ পরিষেবা কবে থেকে মিলবে সেই প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করা হলে এসএসকেএম হাসপাতালের সুপার ডঃ রঘুনাথ মিশ্র বলেন, ‘‘ট্রমা কেয়ার ইউনিট যেটা চালু হলো সেখানে আজ থেকেই চিকিৎসা শুরু হয়েছে। তবে প্রাথমিক ভাবে ২৪৪টি বেডের যে কথা বলা হয়েছিল, সেটা এখনই পূর্ণাঙ্গ ভাবে চালু হয়নি। তবে ধাপে ধাপে সেটা চালু হবে।’’

Comments are closed.