কী বুদ্ধি কুকুরের, পাঁচ বছর ধরে বিস্কুট কিনে খায়, টাকার বদলে কী দেয় জানেন!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: কলম্বিয়ার মন্টেরি এলাকার একটি বিখ্যাত স্কুল Instituto Educativo Técnico Diversificado De Monterrey Casanare।  সেখানকার শিক্ষক শিক্ষিকারা তাকে যখন দত্তক নিয়েছিলেন, বয়স ছিল মাত্র কয়েকমাস। ক্যাম্পাসের একটি ছোট্ট ঘরে থাকার জায়গা জুটেছিল। কুচকুচে কালো এই অনাথ ল্যাব্রাডর কুকুরটির নাম কীভাবে যেন হয়ে গিয়েছিল নেগ্রো।

    গলায় কোনও দিন চেন পরানো হয়নি, ফলে স্কুলের প্রকাণ্ড ক্যাম্পাস জুড়ে চলত নেগ্রোর দস্যিপনা। রাতে কয়েক ঘন্টা তবুও চুপ থাকত, সকালে ছাত্রছাত্রীরা ক্যাম্পাসে একবার ঢুকে পড়লে তখন নেগ্রোর আনন্দ আর দেখে কে। ছাত্রছাত্রী বা শিক্ষক শিক্ষিকাদের কোলে কোলে বা পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়াত আর আদর খেত। শিক্ষক শিক্ষিকারা নেগ্রোর শরীরের দিকে খেয়াল রাখতেন। নিয়মিত পশুচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতেন। পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করতেন। ফলে দ্রুত আড়ে-বহরে বাড়তে লাগলো নেগ্রো। পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগলো বুদ্ধি, নাকি দুষ্টু বুদ্ধি।

    এই সেই ল্যাব্রাডর নেগ্রো

    নেগ্রো কীভাবে যেন বুঝতে পেরেছিল, সে যেখানে থাকে সেখানে কিশোর কিশোরীরা পড়াশুনো করতে আসে। ওটাই ওদের প্রধান কাজ। তাই শিক্ষক শিক্ষিকারা ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসের বাইরে বকাবকি করলে নেগ্রোও একইসঙ্গে এবং সমানভাবে বকাবকি করত তার ভাষায়। শিক্ষক শিক্ষিকা ছাত্র ছাত্রীরা তার কাণ্ডে হাসাহাসি করলেও, নেগ্রো কিন্তু তার চিন্তাভাবনা ও কর্তব্যের প্রতি ভীষণ সিরিয়াস টাইপের। ছাত্রছাত্রীদের বেশি ফাজলামি তার দুচক্ষের বিষ।

    তাই সে ধীরে ধীরে সে ছাত্রছাত্রীদের ওপর তার গার্জেনগিরি ফলাতে শুরু করেছিল। ঘন্টা পড়ার পর ক্লাসের বাইরে থাকা যাবে না। গেটের দিকে যাওয়া চলবে না। নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করা চলবে না। ছুটির ঘন্টা পড়ার পর ক্লাসে থাকা চলবে না। এসবে বেচাল দেখলেই নেগ্রো চেঁচিয়ে ক্যাম্পাস মাত করে দেবে। আর তাহলেই প্রিন্সিপাল বা শিক্ষক শিক্ষিকা বা গার্ডরা ধরে ফেলবেন।

    এই বাচ্চাদের গার্জেন নেগ্রো

    সেই জন্য নেগ্রো যত বড় হতে লাগল স্কুলে ডিসিপ্লিন আরও বাড়তে লাগল। মনিটরের মতো সারা ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়ায় নেগ্রো। মাঝেমধ্যে নেগ্রোকে খ্যাপাবার জন্য ইচ্ছা করেই নিয়ম ভাঙতো ছাত্রছাত্রীরা। তার কথা না শুনলে নেগ্রো সটান চলে যেত প্রিন্সিপালের ঘরে। প্রিন্সিপাল বুঝতেন কিছু গন্ডগোল করেছে কেউ। বেশ মজায় কাটাচ্ছিল নেগ্রো।

    কিন্তু আজ থেকে পাঁচ বছর আগে, একদিন দুপুরে নেগ্রোর মাথায় বুদ্ধির আণবিক বোমা বিস্ফোরণ হয়েছিল। টিফিনের পর সব ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসে ঢুকিয়ে দিয়ে, গাছ থেকে ঝরে পড়া একটা পাতা মুখে নিয়ে নেগ্রো সোজা হাজির হয়েছিল ক্যাম্পাসের মধ্যে থাকা ছোট্ট একটা ক্যান্টিনে। ক্যাশিয়ারের কাউন্টারে দুই পা তুলে দিয়েছিল লেজ নাড়াতে নাড়াতে। মাথা ঘুরিয়ে বলতে চেয়েছিল সে তার পছন্দের বিস্কুট চায়। মুফতে বা ধারে নয়, সে সবার মতো নগদে বিস্কুট কিনবে। সে টাকা মুখে করে নিয়েই এসেছে, সেটা হল গাছের একটা পাতা।

    নেগ্রোর মুখে নেগ্রোর টাকা

    হতভম্ব ক্যাশিয়ার আর কর্মীরা মিনিট পাঁচেক পর বুঝতে পেরেছিলেন নেগ্রোর ফন্দি। ক্যাশিয়ার হাসিমুখে পাতাটি নেগ্রোর মুখ থেকে নিয়ে ক্যাশবাক্সে রেখেছিলেন। সহকর্মীকে বলেছিলেন নেগ্রোকে তার পছন্দের বিস্কুট দিতে। বিস্কুট পেয়ে খুশি নেগ্রো ল্যাজ নাড়তে নাড়তে দোকান ছেড়েছিল।

    টিফিন ব্রেকের সময় ছাত্রছাত্রীরা ক্যান্টিনে গিয়ে বিস্কুট আইসক্রিম কেক বার্গার কিনত। নেগ্রো লক্ষ্য করেছিল, কিশোর কিশোরীরা ব্যাগ থেকে পাতলা লম্বা কিছু (টাকা) বের করে ক্যান্টিনের কর্মীদের দিচ্ছে, আর কর্মীরা ওদের হাতে বিস্কুট কেক আইসক্রিম বা লজেন্স তুলে দিচ্ছে। অসম্ভব বুদ্ধিমান নেগ্রো তাই প্ল্যান আঁটে। কে কবে বিস্কুট দেবে তার জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই নিজের পথ ঠিক করে নেয়।

    ক্যাশ কাউন্টারে পাতা জমা দিচ্ছে নেগ্রো

    বিস্কুট কেনার জন্য মানুষের ছেলেপুলেরা পাতলা লম্বা কিছু দেয় দোকানের লোকগুলোকে। কিন্তু ওসব সে পাবে কোথায়! ভাবতে থাকে নেগ্রো টাকার মতো পাতলা কী হতে পারে। খুঁজে খুঁজে সে বের করে গাছের পাতা, যা টাকার মতোই পাতলা আর লম্বা। ঝানু নেগ্রো এভাবেই আবিষ্কার করে নেয় তার নিজস্ব কারেন্সি।

    স্কুলের শিক্ষিকা আঞ্জেলা গার্সিয়া সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, “যেদিন প্রথম ও মুখে পাতা নিয়ে ক্যান্টিনে ঢুকে কাউন্টারে ওপর পা তুলে দাঁড়াল বিস্কুট কেনার জন্য, আমাদের সবার চোখে জল চলে এসেছিল। ও আমাদের দয়া চায় না, সে সসম্মানে কিনে খেতে চায়।”

    স্কুলের শিক্ষিকা আঞ্জেলার সঙ্গে নেগ্রো

    ক্যান্টিনের পুরোনো কর্মী গ্ল্যাডিস ব্যারেটো সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন গত পাঁচবছর ধরে নেগ্রো রোজ ক্যান্টিনে এসে  টাকা থুড়ি পাতা দিয়ে বিস্কুট কিনে চলেছে। তার আইডিয়া ক্লিক করে যাওয়াতে প্রথম প্রথম দিনে বার বার পাতা মুখে নিয়ে বিস্কুট কিনতে আসত, তবে কতৃপক্ষ বলে দিয়েছে নেগ্রোকে দিনে দুবারের বেশি বিস্কুট দেওয়া যাবেনা। না ক্যান্টিনের লোকসানের জন্য নয়, নেগ্রোর শরীরের কথা ভেবেই নেওয়া হয়েছে এই সিদ্ধান্ত। কারণ ছাত্রছাত্রীদের কেউ না কেউ ওকে রোজই ওর পছন্দের বিস্কুট দেয়।

    কিন্তু নেগ্রো বিস্কুট কিনে খেতে চায়। দয়ার দান নিতে চায় না। তার কথা সে কাউকে বোঝাতে পারে না। তারও তো একটা সম্মান আছে নাকি! বাচ্চাদের হাত থেকে বিস্কুট খেয়ে তাদের ওপর খবরদারি করবে কেমন করে! অনেক দুষ্টু বাচ্চা তাকে ঘুষ দিয়ে খুশি করতে চায় তাও বোঝে নেগ্রো। ক্যাম্পাসের গার্জেন হয়ে বিনা পয়সায় খাওয়া যে তার আত্মশ্লাঘায় আঘাত হানে, এটাই কাউকে বোঝাতে পারে না সে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More