মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৫

‘আমিও যৌনদাসী!’ চিৎকার করে উঠল শহর, ঊর্মিমালার অপমানের বারুদে যেন প্রতিরোধের স্ফূলিঙ্গ

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

বৃষ্টির আশঙ্কা ছিল আগে থেকেই। খোলা আকাশের নীচে জমায়েতের ডাক। কোনও ব্যানার নেই, দল নেই, সেই অর্থে কোনও প্রস্তুতি বা আয়োজন নেই। থাকার বলে রয়েছে, একরাশ ঘেন্না থেকে জন্মানো একটা ফেসবুক পোস্ট। সে পোস্টে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান। কেবল সেটুকুর জোরে যে সপ্তাহান্তের মেঘলা বিকেলে আজও কয়েকশো মানুষ জড়ো হতে পারে এ ব্যস্তবাগীশ শহরটায়, তা বোধ হয় জানা ছিল না কারও!

শুক্রবার বিকেল পাঁচটা, অ্যাকাডেমি চত্বর। একটু একটু করে ভিড় জমতে শুরু করল নানা বয়সি মানুষের। মহিলারা বেশি, পুরুষের সংখ্যা তুলনায় কম। আর পাঁচটা জমায়েতের থেকে, এ জমায়েত আলাদা। এ জমায়েত গলা তুলতে এসেছে, দিনের পর দিন মেয়েদের প্রতি বেড়ে ওঠা সাইবার ট্রোলিংয়ের বিরুদ্ধে। না, ট্রোলিং নতুন নয়। তবে সম্প্রতি বাচিকশিল্পী ঊর্মিমালা বসুর প্রতি ঘটে যাওয়া অন্যায় যেন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বয়স, লিঙ্গ, পেশা নির্বিশেষে চিৎকার করে উঠেছেন সকলে, ‘আমিও যৌনদাসী!’ তাই ফেসবুকে পোস্ট করা ইভেন্টের ডাকেই প্রতিবাদে ভিড় করলেন এত মানুষ।

দেখুন সেই ইভেন্টের পোস্ট।

প্রতিবাদে আছি Protibadey Achhi এতে পোস্ট করেছেন মঙ্গলবার, 24 সেপ্টেম্বর, 2019

দিন কয়েক আগে ঊর্মিমালা বসুর নাম এবং ছবি দিয়ে, ঠিক এই ভাষাতেই কদর্য একটি মিম তৈরি করে ভাইরাল করা হয়েছে অনলাইনে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন নেটিজেনরা। ঊর্মিমালার ‘অপরাধ’, সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাবুল সুপ্রিয়কে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া তাণ্ডবে তিনি ছাত্রছাত্রীদের পক্ষ নিয়ে একটি পোস্ট শেয়ার করেছিলেন ফেসবুকে। তার পর থেকেই শুরু হয় নোংরা আক্রমণ। শেষমেশ তাঁকে দেগে দেওয়া হয় ‘বামপন্থীদের যৌনদাসী’ বলে।

ঊর্মিমালা নিজে জানান, ৭৩ বছর বয়সে এসে এরকম কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ তাঁর পক্ষে বেদনাদায়ক। তিনি নিজের জন্য নয়, তরুণী মেয়েদের জন্য শঙ্কিত। তবে তিনি এটাও জানান, এ আঘাত তাঁকে কষ্ট দিয়েছে কেবল। কোনও ক্ষতি করতে পারেনি তাঁর।

দেখুন ঊর্মিমালার পোস্ট।

যাদবপুর-কাণ্ডের সূত্রে আমাকে নিয়ে ফেসবুকে ঘুরতে থাকা একটি কদর্য মিম নিয়ে কিছু কথা। একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তাঁকে আমি…

Urmimala Bose এতে পোস্ট করেছেন সোমবার, 23 সেপ্টেম্বর, 2019

এর পরেই কলকাতার ফেসবুক মহলের এক পরিচিত মুখ, মিতুল দত্ত সোশ্যাল মিডিয়াতেই ডাক দেন পথসভা. জমায়েতের। আজ, শুক্রবার, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের সামনে সেই মুক্ত মঞ্চেই জড়ো হয়েছিলেন সকলে। এসেছিলেন ঊর্মিমালা নিজে। ছিলেন তাঁর স্বামী, বাচিক শিল্পী জগন্নাথ বসু। ছিলেন গায়ক শ্রীকান্ত আচার্য, বাম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, চিত্রপরিচালক অনীক দত্ত, অভিনেত্রী খেয়ালি ঘোষদস্তিদার, কবি মন্দাক্রান্তা সেন প্রমুখ।

ঊর্মিমালা বসু এ দিন বললেন, “এই শব্দটি, যৌনদাসী, আমায় অপমানিত করেছে ঠিকই। কিন্তু এ অপমান আমার একার নয়। এ অপমান রোজ ঘটছে কারও না কারও সঙ্গে। তাই অপমানে কণ্ঠ রুদ্ধ করা চলবে না। বরং এটাই সময়, আরও বেশি করে জোট বাঁধার।”

তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করে দেন, যে কোনও অসম-লডা়ইয়ে তিনি নিজ নির্ধারিত পক্ষে থাকবেন চিরকাল। বুক চিতিয়ে। এ সব অপমান তাঁকে রুখতে পারবে না। যে কোনও ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে গলা তোলার প্রয়োজন তিনি মনে করছেন ভীষণ ভাবে। তাই এই অপমান যেন সেই প্রয়োজনকেই আরও জোরদার ধাক্কা দিল! তবে শুধু নিজের জন্যই এই প্রয়োজন নয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়েও অনলাইনে যে কুরুচিপূর্ণ মিম, জোক, ভিডিও তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তা-ও রুখতে হবে বলে জানান তিনি। এ অপমান রাজনৈতিক পরিচয় বা ধর্ম বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে, নারীত্বের অবমাননা। গোটা সমাজের অবমাননা।

ঊর্মিমালা জানান, যৌনদাসী শব্দটির মধ্যে আলাদা ব্যঞ্জনা রয়েছে। এতে যেমন আছে ‘যৌন’ শব্দটি, তেমনই আছে ‘দাসী’ শব্দটিও। যা একযোগে মনে করিয়ে দেয় সিরিয়ায় আইএস জঙ্গিদের হাতে বন্দি অজস্র মুক্তিকামী নারীর অসহনীয় লড়াইয়ের কথা। তাই একে নিছক অপমান বলে হজম করে নিতে বা প্রথাগত অভিযোগের পথে হাঁটতে রাজি নন শিল্পী। তাঁর বিশ্বাস, ‘লক্ষ মুজিবর’-এর মতোই ‘লক্ষ ঊর্মিমালা’-র গলার স্বরে উচ্চকিত হয়ে উঠবে এই পিতৃতান্ত্রিক অসভ্যতার প্রতিবাদ।

অভিনেত্রী খেয়ালী রাগ ধরে রাখতে পারেননি তাঁর। তাঁর প্রিয় দিদি, শ্রদ্ধেয় শিল্পীর বিরুদ্ধে এই অপমান তাঁকে নাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানান তিনি। পুরুষদের এই কদর্যতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য সুশীলতার পথ নিতে চান না তিনি আর। “পেনিসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে পেন দিয়েই।”– বলে ওঠেন অভিনেত্রী।

বিকাশরঞ্জনবাবু মনে করিয়ে দেন, যে কোনও ফ্যাসিস্ট শক্তির শুরুর সময়টা এমনই হয়। মহিলাদের উপরে নোংরা আক্রমণ ফ্যাসিজ়মের এক অন্যতম হাতিয়ার বলে উল্লেখ করেন তিনি। ধর্ম নিয়ে দেশ জুড়ে যে মেরুকরণ চলছে, তা এক রকম ফ্যাসিজ়মের সূচনা বলেই মত দেন তিনি। এবং মনে করিয়ে দেন, জোটবদ্ধ একতাই এই লড়াইয়ের মূল শক্তি।

চিত্রপরিচালক অনীক দত্ত আবারও মনে করিয়ে দেন, যাদের বিরুদ্ধে এই কদর্য মিম তৈরির অভিযোগ, অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদী দলগুলি, তারা কিন্তু দেশমাতার নামে বড়ই সরব। এমনকী গোমাতার পুজোও করেন তাঁরা। কিন্তু নিজের ঘরের মাতাকে এমন অপমান করতে কোথাও বাধে না তাঁদের! “ওরা হয় মহিলাদের দেবী করে রাখে, নয় টেনে নামায় কুৎসিৎ কোনও পাঁকে। এর মাঝে যেন কিছু নেই। সাধারণ মহিলা হিসেবে যেন কারও কোনও সম্মান পাওয়ার নেই।”– বলেন অনীক।

মিতুল দত্ত

বিকেল ফুরিয়ে অন্ধকার নামে গড়ানে পথে। ভেজা হাওয়ায় মোড়া শহরে তত ক্ষণে জ্বলে উঠেছে স্ট্রিটলাইট। সেই আলোয় জ্বলজ্বল করছে কয়েকশো মানুষের মুখ। সকলে সই করেছেন পিটিশনে। জানিয়েছেন, এই অসভ্যতা মেনে নিচ্ছেন না তাঁরা। কয়েকশো সই-সমেত সেই পিটিশন জমা পড়বে মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপালের কাছে।

সুরঙ্গমা ভট্টাচার্য

উদ্যোক্তাদের তরফে মিতুল দত্ত এবং সুরঙ্গমা ভট্টাচার্য জানালেন, “এই লডা়ই সবে শুরু। আজ এত মানুষ এসে আশা বাড়ালেন, পথ রুদ্ধ হয়ে যায়নি। এখনও হাঁটতে চাইলে পায়ের পাশে পা মিলবে। এটাই আজকের জমায়েতে আমাদের প্রাপ্তি। আমরা মাথা নিচু করব না, ভয় পাব না। রুখে দাঁড়াব এই অসভ্যতার বিরুদ্ধে। সপাটে বলব, আমিও যৌনদাসী। রুখে দাঁড়ানোর জন্য সব সময় মা দুর্গা হয়ে উঠতে হয় না। দুর্গার শক্তি প্রতিটি মেয়ের ভিতরেই রয়েছে।”

রাত পোহালেই শেষ হবে পিতৃপক্ষ। অমাবস্যার চৌকাঠ ডিঙিয়ে প্রথম রশ্মির প্রবেশ সূচনা করবে দেবী পক্ষের। আলোর বেণু বাজিয়ে, ভুবন মাতিয়ে মা আসছেন ধরায়। তার ঠিক আগে শহর কলকাতা এ ভাবেই বার্তা দিল, মহিলাদের প্রতি কদর্য আক্রমণকারী সাইবার-অসুরদের বিরুদ্ধে ত্রিশূল ধরার।

ছবি: শুভজিৎ নস্কর

Comments are closed.