বুধবার, নভেম্বর ২০
TheWall
TheWall

কুংফু পান্ডা থেকে পিৎজা ইডলি, এইট পাস চেন্নাইয়ের এই ইডলি-ম্যানকে ডক্টরেট দিল আমেরিকার ইউনিভার্সিটি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইডলি চাই! ইডলি!

চাল-ডাল মিহি করে বেটে, মেথি বাটা আর নারকেলের গন্ধমাখা গোল গোল সাদা চাঁদের মতো ইডলিতে যদি আপনার অরুচি হয়, তাহলে চকোলেট ইডলি ট্রাই করতে পারেন। তেঁতুলের ক্কাথ দেওয়া সবজি মেশানো সম্বর ডালের জায়গায় পাবেন ঝাল ঝাল চাটনি। অথবা রামধনু রঙা ইডলি, টপিংয়ে মাখিয়ে দেওয়া হবে কমলালেবুর রস। কুংফু পান্ডা ইডলি চেখে দেখেছেন কখনও? পেঁয়াজ-রসুন-ক্যাপসিকাম দেওয়া পিৎজা ইডলি! দক্ষিণের সঙ্গে কনটিনেন্টালের ছোঁয়া। না, অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই সব ইডলি বাস্তবেই রয়েছে। রকমে নয় নয় করেও ২০০০। দক্ষিণী স্বাদে গোটা দেশের ডেলিকেসিকেই মিশিয়ে দিয়েছেন এই ব্যক্তি। তাতে আবার রেখেছেন বিদেশি স্বাদের ছোঁয়াও। গিনেস বুকে নাম তুলে ফেলা চেন্নাইয়ের এই ‘ইডলি-ম্যান’ এখন দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে ভিন দেশেও নাম করে ফেলেছেন।

নাম এম এনিয়াভান। লোকে চেনে ‘ইডলি-এনিয়াভান’ নামে। কোয়েম্বত্তূরের বাসিন্দা এনিয়াভান এখন পাকাপাকি ভাবে ইডলির ব্যবসা চালাচ্ছেন চেন্নাইতে। ‘মাল্লিপো ইডলি’ নামে তাঁর দোকানে ফি দিন হাজার মানুষের ভিড়। বাচ্চাদের পছন্দ মিকি মাউস ইডলি, আর বড়রা মজে নারকেল খুশবু ইডলিতে, কলেজ পড়ুয়াদের আবার পছন্দ কুংফু পান্ডা ইডলি বা সবজির পুর ভরা স্পঞ্জি ইডলি। দোকানে ৩০ রকম ভ্যারাইটি সব সময় থাকে। অবশ্য অনুরোধ করলে তাঁর হাজার দুয়েক রেসিপি থেকে আরও নতুন কিছুও থানায় সাজিয়ে দিতে খুব একটা আপত্তি করেন না এনিয়াভান।

রকমারি ইডলি সাজিয়ে চেন্নাইয়ের ইডলি-ম্যান এনিয়াভান

দক্ষিণী ডেলিকেসির মধ্যে নেহাতই প্রাতরাশের তকমা সাঁটা কম মশলাদার এই খাবারকে যে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেটা ভালোভাবেই প্রমাণ করে দিয়েছেন ‘ইডলি-এনিয়াভান।’ তবে শুরুটা এমন ছিল না। সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল অভাব। ক্লাস এইট পাস এনিয়াভানের কাছে লড়াইটা খুব একটা সহজ ছিল না।

জীবন বদলে গেল অটোচালকের…

কোয়েম্বত্তূরের বাসিন্দা এনিয়াভান। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ে খুব কম বয়সেই। ক্লাস এইটের পরে আর পড়াশোনাটা ঠিক হয়ে ওঠেনি। পেট চালাতে হাতে ওঠে অটোর স্টিয়ারিং। চেনা রুটে হাঁক পাড়তেই পাড়তেই একদিন ছকে বাঁধা জীবনটা আমূল বদলে যায়। স্মৃতির পথে হাঁটতে হাঁটতে সেই গল্পই শুনিয়েছেন চেন্নাইয়ের এই ইডলি-ম্যান।

ইডলির প্রতি অনুরাগ জন্মায় এক মহিলা যাত্রীর লড়াই দেখে। নাম চন্দ্রা। প্রায় প্রতিদিনই এনিয়াভানের অটোতে চেপে নিজের গন্তব্যে যেতেন চন্দ্রা। হাতে থাকত ইডলির বড় ক্যান। চন্দ্রা শুনিয়েছিলেন কী ভাবে ইডলি আর সম্বর ডাল বাড়ি বাড়ি বেচেই সংসার চালান তিনি। রাঁধতে বরাবরই ভালোবাসতেন এনিয়াভান। চন্দ্রার জার্নি মুগ্ধ করে তাঁকে। ইডলি-সম্বরের রেসিপি জেনে নিয়েছিলেন চন্দ্রার কাছ থেকেই। খরিদ্দারদের পছন্দ কেমন, সেটাও শুনে নিয়েছিলেন মন দিয়ে। এর পরই শুরু হয় এক অন্য লড়াই।

গতে বাঁধা জীবন নয়, এক্সপেরিমেন্টই পছন্দ ইডলি-ম্যানের

অজানার টানে কোয়েম্বত্তূর থেকে একদিন পাড়ি দেন চেল্লাইতে। সঙ্গে ইডলি বানানোর সামান্য উপকরণ। চেন্নাই পৌঁছে ঠাঁই মেলে একটেরে ছোট্ট ঘরে। সামনের ভাঙা ছাদের দালানেই স্ট্রিমার চাপিয়ে শুরু হয় ইডলি রান্না। একটা, দু’টোর বেশি খদ্দের হতো না প্রথমে। এনিয়াভানের কথায়, ‘‘প্রথম প্রথম ব্যবসা চলেনি। খুব বেশি মানুষ আসতেন না দোকানে। ভাঙাচোরা দোকান দেখেই হয়তো। সকলেই রেস্তোরাঁ বা বড় দোকান থেকেই কিনতেন। একদিন তুমুল বৃষ্টিতে ছাদ গড়িয়ে জল পড়ল স্ট্রিমারে। সব ইডলি নষ্ট হয়ে গেল।’’


মিকি মাউস ইডলি, চকোলেট ইডলি থেকে কাপ-ইডলি। এনিয়াভানের রেসিপিতে রোজই থাকে নতুন নতুন চমক।

ক্ষতি হলো অনেক টাকার। তবে হাল ছাড়লেন না এনিয়াভান। জানিয়েছেন, একই রকম সাদা ইডলিতে মানুষ রুচি হারিয়েছিল। একই ফোড়নের সম্বর ডাল আর মিহি চাল-ডাল-মেথি বাটার ইডলি বিশেষ পছন্দ ছিল না স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদেরও। তরুণ মনে তখন পিৎজা-বার্গারের নেশা। তাই ঠিক করলেন ইডলিই বানাবেন, তবে রেসিপিতে আনবেন চমক। যা কেউ দেখেনি, কেউ চাখেনি, এমন কিছু।

ইডলিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন এনিয়াভান।

শুরু হলো এক্সপেরিমেন্ট। প্রথম বদলটা হলো রঙে। যা দেখেই চোখ আর পেট একই সঙ্গে বলবে, তোফা! হলদে-সবুজ, বা রামধনু রঙা ইডলি, কখনও কচি পাতার রঙে ছাঁচে ফেলে ইডলি বিশেষ পছন্দ করতে শুরু করলেন খদ্দেররা। এর পর এল স্বাদ ও আকারে বদল। কখনও চকোলেট সস ঢেলে ইডলি হলো হার্ট-শেপের, আবার কখনও কমলালেবুর রস মাখিয়ে মিকি মাউসের ছাঁচে ফেলে ইডলি হলো অনবদ্য। কুংফু পান্ডার মুখের আদলের ইডলি বেশ পছন্দ করলেন বাইক হাঁকিয়ে আসা স্মার্ট তরুণরা। একটু বয়স্করা অর্ডার দিলেন নারকেলের জলে বানানো সবজি ভরা খুশবু ইডলি। স্কুল পড়ুয়াদের আবার পছন্দ চটপটে পিৎজা-ইডলি। কাপ কেকের মতো পেস্তা-কাজু ছড়ানো ইডলি পাতে পড়তেই শেষ। দোকান চলতে লাগল রমরম করে। লম্বা লাইন লাগল দোকানের সামনে।

নাম উঠল গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে

এনিয়াভান তখন চেন্নাইয়ের পরিচিত নাম। নাম হয়েছে ‘ইডলি-এনিয়াভান।’ ছোট্ট ভাঙা দোকানের জায়গায় তখন তাঁর ঝাঁ চকচকে রেস্তোরাঁ। যোগ দিলের ইডলি-ফেস্টিভালে। প্রায় ১২৫ কিলোগ্রাম ওজনের পেল্লায় ইডলি বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিলেন সকলকে। রেকর্ডও করে ফেললেন গিনেস বুকে।

বিশ্ব রেকর্ড করার আগে পরিবারের সঙ্গে এনিয়াভান। চলছে ১২৫ কেজি ইডলি বানানোর লড়াই।

এর পরের জার্নিটা আরও চমকের। এনিয়াভান জানিয়েছেন, বিশ্ব রেকর্ড করার পরে ইডলি নিয়ে তাঁর চিন্তা ভাবনাটা আরও বেড়ে যায়। বিভিন্ন বয়সের মানুষের পছন্দের কথা মাথায় রেখে একের পর এক রেসিপি তৈরি করতে শুরু করেন তিনি। বর্তমানে সেটা দু’হাজারে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনে সংখ্যাটা আরও বাড়বে। তাঁর ইডলি-প্রীতির কথা পৌঁছে গেছে আমেরিকাতেও। এই লড়াইকে স্বাগত জানিয়েছে আমেরিকার একটি ইউনিভার্সিটি। ক্লাস এইট পাস সত্ত্বেও তাঁর এক্সপেরিমেন্ট ও একাগ্রতা দেখে এনিয়াভানকে ডক্টরেট ডিগ্রি দেওয়া হয়েছে ওই ইউনিভার্সিটি থেকে।

ইডলি ফেস্টিভালে এনিয়াভানের রাঁধা হরেক কিসিমের ইডলি।

‘‘সাধারণ জল নয়, সব ইডলিই তৈরি হয় নারকেলের জল থেকে। এটা শিখেছিলাম আমার ঠাকুমাকে দেখে। তাই হয়তো আমার বানানো ইডলির স্বাদ অন্যরকম,’’ বলেছেন ‘ইডলি-এনিয়াভান’। তাঁর এক্সপেরিমেন্ট এখনও থামেনি। গোপনে জানিয়েছেন, সংখ্যাটা দু’হাজার ছাপিয়ে গেছে। খুব তাড়াতাড়ি নতুন মোড়কে ইডলিতে বিপ্লব আনতে চলেছেন তিনি। চেখে দেখবেন নাকি?

আরও পড়ুন:

ওরা চাষের জমির সাংবাদিক, ওরাই রোদে পোড়া চাষিদের নিয়ে সিনেমা বানায়

Comments are closed.