চাঁদের গহ্বরে চোখ রাখল অরবিটারের রেডার, অবিশ্বাস্য সাফল্য চন্দ্রযানের

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পাশাপাশি ঘেঁষাঘেঁষি খোলামুখ গহ্বর, উঁচুনিচু গোলাকার, চ্যাপ্টা বা ডিম্বাকৃতি, উপবৃত্তাকার—চাঁদের পিঠের খানাখন্দ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে চন্দ্রযানের অরবিটার। ইসরো আগেই বলেছিল ভারতের বহু প্রতীক্ষিত চন্দ্রযাত্রা ব্যর্থ হয়নি। চাঁদের পিঠে ল্যান্ডার ‘বিক্রম’ নামতে পারেনি ঠিকই, তবে চাঁদের পাড়ায় থুড়ি কক্ষপথে বসে নিজের কাজ মনোযোগ দিয়ে করে যাচ্ছে চন্দ্রযানের অরবিটার। কখনও চাঁদের ধুলো রেগোলিথের (Regolith) হাল-হকিকত ব্যাখ্যা করছে, কখনও তার হাই রেজোলিউশন ক্যামেরায় (Orbiter High Resolution Camera -OHRC) ধরা পড়ছে দক্ষিণ মেরুর ‘ বোগুলস্কি ই-ক্রেটার’ (Boguslawsky E-Crater)।  অরবিটারের ‘ডুয়াল ফ্রিকোয়েন্সি সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডার’ (DF-SAR)-এ ধরা পড়েছে চন্দ্রপৃষ্ঠের অনেক অজানা ও রহস্যময় গহ্বরের ছবি।

চাঁদের কক্ষপথে পাক খাচ্ছে চন্দ্রযানের অরবিটার। চাঁদের এক পক্ষকালের হিসেবে দক্ষিণ মেরুতে এখন আঁধার। ২৯ দিন ধরে চাঁদের চারপাশে পাক খাওয়ার সময় টানা ৬দিন অরবিটার ছিল দক্ষিণ মেরুর উপরে। তার হাই রেজোলিউশন ক্যামেরার স্পেশাল জুমিং চাঁদের গহ্বরের ছবি তুললেও ল্যান্ডারের খোঁজ পায়নি। চন্দ্রযানের অরবিটারের মতো নাসার মহাকাশযান ‘লুনার রিকনাইস্যান্স অরবিটার (এলআরও) পাক খাচ্ছে চাঁদের কক্ষপথে। সেও ল্যান্ডার বিক্রমের খোঁজ পায়নি। বিক্রম যেখানেই থাকুন না কেন, সেটা নিয়ে মাথা ঘামাবার বদলে চন্দ্রযানের অরবিটার এখন চাঁদের মাটির বৈশিষ্ট্য, তার গহ্বরের প্রকৃতি নিয়ে খোঁজ চালাচ্ছে। খনিজের অনুসন্ধান করছে।

চন্দ্রযান ২-এর সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডারে ধরা পড়েছে চাঁদের মাটির গোপন কথা

ইসরো জানিয়েছে, অরবিটারের আটটি পে-লোডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় লার্জ এরিয়া সফট এক্স-রে স্পেকট্রোমিটার (CLASS), অরবিটার হাই রেজোলিউশন ক্যামেরা (OHRC) এবং ডুয়াল ফ্রিকোয়েন্সি সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডার’ (DF-SAR)। এই সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডার বা SAR-এর এস-ব্যান্ড হাইব্রিড পলোরিমেট্রিক সিস্টেম চাঁদের মাটির গোপন কথা তুলে আনতে সক্ষম। চাঁদের পিঠের গহ্বর তো বটেই, চাঁদের মাটির বিশেষত্বও ধরা পড়ে এই বিশেষ ধরনের রেডারে।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, চন্দ্রযান-১ সফল না হলেও এর সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডার চাঁদের দক্ষিণ পিঠে বরফের খোঁজ দিয়েছিল। চাঁদের মাটিতে খনিজের সম্ভাবনার কথা বলেছিল। সেই সম্ভাবনাকে খতিয়ে দেখার জন্যই ছিল এই দ্বিতীয় চন্দ্রযাত্রা। তবে সময় ফুরিয়ে যায়নি। চন্দ্রযানের অরবিটার যেভাবে একের পর এক চমক দিচ্ছে তাতে বিজ্ঞানীদের ধারণা, চাঁদের অনেক অজানার খোঁজ মিলবে অচিরেই।

চন্দ্রযান-২ এর সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডারে রয়েছে এল ও এস ব্যান্ড। প্রথম চন্দ্রযানের চেয়ে যা অনেক বেশি উন্নত ও আধুনিক। এই রেডারে সহজেই ধরা পড়ে চাঁদের ক্রেটার বা গহ্বরের বৈচিত্র্য। ক্রেটার থেকে ছিটকে বেরনো পদার্থ বা Crater Ejecta। কয়েক কোটি বছরের পুরনো বুড়ো গহ্বর যেমন দেখেছে এসএআর তেমনি দেখেছে নতুন গজিয়ে ওঠা সদ্যোজাত গহ্বরও। মহাকাশবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, হাই রেজোলিউশন ক্যামেরায় এইসব গহ্বর অনেক সময়েই ধরা দেয় না। কারণ চাঁদের ধুলো বা রেগোলিথ সেগুলোকে আড়াল করে রাখে। ধুলোর চাদরের ভিতরে চোখ বুলিয়ে লুকিয়ে থাকা সেইসব গহ্বরের খোঁজ চালানোই কাজ সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডারের।

‘ভলক্যানিক ক্রেটার’ ও ‘ইমপ্যাক্ট ক্রেটার’ দেখল অরবিটারের DF-SAR

ক্রেটার কথাটা এসেছে গ্রিক শব্দ Vessel থেকে। প্রথম টেলিস্কোপ আবিষ্কার করে গ্যালিলিও বলেছিলেন চাঁদ মোটেও গোলপানা সুন্দর নয়। বরং চাঁদের মাটি খানাখন্দ, পর্বত-উপত্যকায় ভরা। আর আছে কাপের মতো আকৃতির কিছু উঁচুনিচু জায়গা। ১৭৯১ সালে এই উঁচুনিচু কাপের মতো আকৃতির জায়গাগুলোরই নাম দেওয়া হয় ক্রেটার বা চাঁদের গহ্বর। এখন চাঁদের মাটিতে এইসব গহ্বরের জন্ম কীভাবে হল সেই নিয়ে খোঁজ দীর্ঘদিনের। চন্দ্রযানের রোভারের অন্যতম লক্ষ্যও ছিল চাঁদের মাটিতে ঘুরে ঘুরে এইসব গহ্বরের হালহকিকত বিশ্লেষণ করা।


বাঁ দিকে, চাঁদের মাটির ভলক্যানিক ক্রেটার, ডানে, ইমপ্যাক্ট ক্রেটার

চন্দ্রযানের বিক্রমের সঙ্গে তার পেটের ভিতরে থাকা রোভারও ঘুমিয়ে আছে দক্ষিণ মেরুর কোথাও। কাজেই এইসব গহ্বরের খোঁজ চালাচ্ছে অরবিটারের সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডার। মহাকাশবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই গহ্বর তৈরি হতে পারে নানাভাবে। প্রথমত, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে। চাঁদের বুকে সব আগ্নেয়গিরিই এখন মৃত। সেইসব ক্রেটারকে বলা হয় ‘ভলক্যানিক ক্রেটার।’ দ্বিতীয়ত, উল্কাপাত বা গ্রহাণুর সংঘর্ষে। চাঁদে যেহেতু বায়ুমণ্ডল নেই। তাই চাঁদের দিকে ছুটে আসা উল্কাপিণ্ড বা গ্রহাণু প্রবল গতিতে আছড়ে পড়ে চাঁদের মাটিতে। প্রবল বিস্ফোরণে ফাটল তৈরি হয়। একে বলে ‘ইমপ্যাক্ট ক্রেটার।’

৯.৫ ডিগ্রি থেকে ৩৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে এবং ৩-৫ মিটার গভীরে রেডারের এস ও এল ব্যান্ড এইসব গহ্বরগুলিকে লেন্সবন্দি করেছে। DF-SAR দেখেছে, এইসব গহ্বরের কোনওটা কয়েক কোটি বছরের পুরনো। কিছু গহ্বর তৈরি হয়েছে সম্প্রতি। দেখা গেছে, গহ্বরের চারপাশ ঢেকে রেখেছে এর থেকে ছিটকে বেরনো পদার্থ বা Crater Ejecta । সমান্তরাল ভাবে চাঁদের ধুলো বা রেগোলিথকে আবৃত করে রেখেছে এইসব পদার্থ। ‘পিটিসকাস টি’ (Pitiscus T) ক্রেটারের দেওয়ালের গভীরতা এতই বেশি যে মনে হয় কোনও হিমবাহ গলে তৈরি হয়েছে এই গহ্বর। ইসরো জানিয়েছে, এই গহ্বরগুলির এত নিখুঁত ছবি ও তথ্য সামনে এনেছে রেডার, যে বিশদে পরীক্ষানিরীক্ষা চালালে বোঝা যাবে এই চাঁদের মাটিতে কী কী উপাদান রয়েছে, জল রয়েছে কিনা এবং থাকলেও কোথায় এবং কত পরিমাণে রয়েছে।

অরবিটারের লার্জ এরিয়া সফট এক্স-রে স্পেকট্রোমিটারে (CLASS) আগেই ধরা পড়েছে, দক্ষিণ পিঠে চাঁদের ধুলো (Lunar Dust) বা রেগোলিথের (Regolith) মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকন, টাইটানিয়াম এবং আয়রনের মতো খনিজ মৌল। তাদের অণু-পরমাণুর মধ্যে নিরন্তর ধাক্কাধাক্কি, মারামারি চলছে। উত্তেজিত হয়ে উঠছে ইলেকট্রনেরা। এক্স-রে স্পেকট্রোমিটারের চোখে ধরা পড়েছে, এই ইলেট্রনরা এতটাই উত্তেজিত, যেন মনে হচ্ছে তারা নেচে নেচে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আরও পড়ুন:

চন্দ্রযানের বড় সাফল্য! আঁধার দক্ষিণ পিঠে ‘ই-ক্রেটারের” ছবি তুলে পাঠাল অরবিটার

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More