বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৯

কালনাগিনী ‘ঝাঁকলাই’ এখানে ঘরের লোক, সাপের ছোবল ‘প্রসাদ’, জেনে নিন বর্ধমানের এই চার গ্রামের নাগ-রহস্য

চৈতালী চক্রবর্তী

বাড়ির দাওয়ায় বসে বৃদ্ধ মোড়ল। সাপ শব্দটা তাঁর সামনে উচ্চারণ করতেই লম্বা জিভ কেটে, দু’কানে হাত দিলেন। সাপ নয়, ‘ঝাঁকলাই।’ কেউ বলেন কেউটে, কারো দাবি গোখরো। গ্রামের বুড়োরা বলেন ‘কালনাগিনী। ওই যে মনসামঙ্গল কাব্যে লখিন্দরকে বাসর ঘরে কেটেছিল যে!’ ঘোর কৃষ্ণবর্ণের এই সাপ এখানে ঘরের লোক। কাছের আত্মীয়। বিষধর জীব নয়, বরং দেবতা। সাপের সঙ্গে দিব্যি খেলে কচিকাঁচারা। প্রতি ঘরে সাপের বিশ্রামের জন্য বিছিয়ে রাখা হয় খড়ের গাদা। সাপে-মানুষে দিব্যি সহাবস্থান এখানে।

সাপকে বলা হয় ‘ঝাঁকলাই’, সাপের ছোবল এখানে ‘প্রসাদ’

পূর্ব বর্ধমানের ভাতার থানার চারটে গ্রাম। মুসুরি (কেউ বলেন মুশারু), মঙ্গলকোট থানার ছোটপোষলা, পলসোনা ও বড়পোষলা, মূলত এই চার গ্রামেই দেখা মেলে কেউটে বা গোখরো প্রজাতির এই সাপ ‘ঝাঁকলাই’-এর। সাপ এখানে দেবী। কাজেই সাপের ‘ছোবল’ বলতে নারাজ গ্রামবাসীরা। সাপের কামড়কে এখানে বলা হয় ‘প্রসাদ।’ চার গ্রামেই বেদেদের আধিক্য। তা ছাড়াও যাঁরা রয়েছেন তাঁরাও সাপ-প্রেমী। এখানে ঘরে ঘরে সাপের বাস।  বাড়ির উঠোনে তার অবাধ বিচরণ।  শিশুর কান্না থামাতে খেলনা নয়, বরং হাতে তুলে দেওয়া হয়  ‘ঝাঁকলাই।’ সাপের হিসহিস শব্দে কান্না থামিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে শিশু।

বর্ধমান-কাটোয়া রাস্তা ধরে বলগোনা পেরিয়ে নিগনের ঠিক আগে বাস থামে মুসুরিতে৷ এখান থেকে ভ্যান রিকসা বা ই-রিকসা চেপে যাওয়া যায় গ্রামের ভিতরে। পলসোনাতে যাওয়ার পথও এখান থেকেই। মহারাষ্ট্রের কেউটে গ্রাম শেতপালের মতো বাংলার ‘Snake Village’ পূর্ব বর্ধমানের এই চারটে গ্রাম। গ্রামবাসীদের কথায়, ‘‘ঝাঁকলাই কামড়ায় না। পরোপকারী বন্ধু। বংশপরম্পরায় সাপের পুজো করি আমরা। গ্রামে যে দেবীর নাম ঝঙ্কেশ্বরী দেবী।’’ পূর্ব বর্ধমান জেলায় যা ‘ঝাংলাই পুজো’ নামে খ্যাত। প্রায় ৯০০ বঙ্গাব্দ থেকে শুরু হয়েছে এই পুজো। হালে যা সাপ-প্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।

সাপের দেবী ঝঙ্কেশ্বরীর সঙ্গে জড়িয়ে বৌদ্ধযুগের ইতিহাস…

গ্রাম-বুড়োরা বলেন, আগে আষাঢ় মাসে ভাতারের শিকোত্তর, মুকুন্দপুর এবং মঙ্গলকোটের ছোটপোষলা, পলসোনা, মুশারু এবং নিগন মিলে সাতটি গ্রামে ঝাঁকলাই পুজো হত। এখন চার গ্রামেই উৎসব বাঁধাধরা। গ্রামবাসী ও সর্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝঙ্কেশ্বরী দেবী ও সাপ পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৌদ্ধযুগের ইতিহাস। পূর্ব বর্ধমানে সাপ নিয়ে গবেষণা করছেন হুগলি জেলার বাসিন্দা বিশাল সাঁতরা। তাঁরও মত এমনটাই। ‘ঝাঁকলাই’ শব্দটা এসেছে ‘জাঙ্গুলি’ শব্দ থেকে। জাঙ্গুলি একপ্রকারের ক্যাকটাস জাতীয় গাছ। বাংলায় যাকে শিষ গাছও বলেন অনেকে। নাগ-পঞ্চমীর দিন এই শিষ গাছ লাগিয়ে গ্রামে পুজো হয়। লোককথা, বলে জাঙ্গুলি বৌদ্ধ দেবী। উচ্চবর্ণের মানুষজন এই দেবীর পুজো করেন। তবে পূর্ব বর্ধমানের গ্রামগুলিতে বেদেদের মধ্যেই এই জাঙ্গুলি দেবী বা ঝঙ্কেশ্বরী দেবীর পুজোর প্রচলন রয়েছে।

নারায়ণ দেবের ‘পদ্মাপুরাণ’ প্রকাশকাল ১৯৪২, আর বিনয়তোষ ভট্টাচার্যের ‘দি ইন্ডিয়ান বুদ্ধিস্ট আইকনগ্রাফি’ গ্রন্থের প্রথম প্রকাশ ১৯২৪ সালে। সেখানে শ্রীভট্টাচার্য বৌদ্ধ দেবী জাঙ্গুলি থেকে মনসার উৎপত্তির কথা বলেছেন। বলা হয়ে থাকে জাঙ্গুলি বুদ্ধের মতোই প্রাচীন। পূর্ব বর্ধমানের মুসুরিতে সবচেয়ে বড় ঝঙ্কেশ্বরী দেবীর মন্দির রয়েছে। সাপ পুজোকে কেন্দ্র করে ফি বছর এখানে বড় মেলা হয়। হাজার হাজার পর্যটক ভিড় জমায়।


ঘরে ঘরে কালনাগিনী…

আগে ছিল সাত গ্রাম। এখন চার। মুসুরি, পলসোনা, বড়পোষলা ও ছোটপোষলার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে মনসামঙ্গলের বেহুলা-লখিন্দরের উপাখ্যান। গ্রামবাসীরা বলেন ‘ঝঙ্কার’ শব্দটা এসেছে বেহুলার বালার আওয়াজ থেকে। গ্রামের লোকের বিশ্বাস, লোহার বাসরে লখিন্দরকে ছোবল মারার পরে কালনাগিনীর বিষ প্রয়োগের ক্ষমতা চলে যায়। বেহুলা শর্ত দেন, নির্বিষ হয়ে তাকে সাত গ্রামে লুকিয়ে থাকতে হবে। পূর্ব বর্ধমানের এই সাত গ্রামেই নাকি এখন কালনিগীর বাস। তারই নাম ‘ঝাঁকলাই।’ তাকেই ঝঙ্কেশ্বরী দেবী রূপে পুজো করা হয় গ্রামে।

ঝঙ্কেশ্বরী দেবীর খাবার ব্যাঙ। গ্রামবাসীরা যাকে বলে ‘নাড়ু।’ দেবীর রোষ থেকে বাঁচতে এই চার গ্রামে সাপ ধরা নিষেধ। বরং রাস্তা থেকে সাপ কুড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে আসে শিশুরাও। বর্ধমানের এই সাপ-গ্রাম নিয়ে তথ্যচিত্র বানিয়েছেন অনির্বাণ চক্রবর্তী— ‘ঝাঁকলাই দ্য মিস্ট্রি।’ এই তথ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে কী ভাবে সাপের সঙ্গে পাশাপাশি, কাছাকাছি বছরের পর বছর ধরে ঘর করে আসছেন পূর্ব বর্ধমানের এই চার গ্রামের বাসিন্দারা।

বিশ্বাসের সঙ্গে জুড়ে গেছে কুসংস্কার..‘ঝাঁকলাই’ নিয়ে গবেষণায় নিউ ইয়র্কের বিজ্ঞানী

‘‘বিষধর সাপ নিয়ে এখানে মানুষজন ওঠাবসা করেন। বিশ্বাসের সঙ্গে নিরাপদেই বেঁচে থাকেন। কী ভাবে বছরের পর বছর এই অসম্ভব ঘটনা ঘটে চলেছে গ্রামে সেই নিয়েই আমার মূল গবেষণা,’’ বলেছেন খ্যাতনামা সরীসৃপ বিশেষজ্ঞ রমুলাস আর্ল হুইটেকর। নিউ ইয়র্কের জন্ম হলেও বর্তমানে সাপ ও সরীসৃপ নিয়ে গবেষণায় তিনি ভারতের বাসিন্দা।  মাদ্রাজ স্নেক পার্ক ও মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাঙ্ক তাঁরই তৈরি। আন্দামান ও নিকোবরেও সাপ নিয়ে গবেষণা করেছেন তিনি।

সাপ নিয়ে গবেষণায় রমুলাস হুইটেকার।

রমুলাসের সঙ্গেই ‘ঝাঁকলাই’ নিয়ে গবেষণা করছেন হুগলির বিশাল সাঁতরা ও ভাতারের সাপ বিশেষজ্ঞ ধীমান ভট্টাচার্য। বেশ কয়েকবছর ধরে ‘ঝাঁকলাই’ সাপ নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন ধীমানবাবু। বলেছেন, ‘‘রমুলাস হুইটেকারের মতো একজন সর্ব বিশারদ আমাদের গ্রামে গবেষণা করতে এসেছেন, এটা আমাদের কাছে গর্বের। অনেক নতুন তথ্য বেরিয়ে আসবে আশা করছি। গ্রামবাসীদের চালচলন এখানে অনেক স্বতন্ত্র। তাঁদের ভাবনাচিন্তার সঙ্গেও পরিচিত হতে পারব।’’

তবে সাপ নিয়ে কুসংস্কার যে এই গ্রামগুলিতে চেপে বসেছে সেটা একবাক্যে স্বীকার করেছেন সর্ব বিশেষজ্ঞের অনেকেই। তাঁদের মতে, সাপে কাটলে হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়াই দস্তুর। তবে এই গ্রামের বাসিন্দারা সাপের ছোবলকে ‘প্রসাদ’ বলে মনে করছেন। সাপে ছোবল দিলে, ক্ষতস্থানে মন্দিরের মাটি লেপে মন্ত্র আওড়ান পুরোহিতরা। মন্ত্রপূত তেল দিয়ে চিকিৎসা হয়। ফলে সাপে কাটা রোগীদের সঠিক চিকিৎসা হয় না। বেশিরভাগই বিনা চিকিৎসায় মারা যান।

তবে এলাকার বাসিন্দা বলাই রায়, স্বপন রায়দের ভিন্ন ভাবনা। তাঁদের কথায়, ‘‘সাপ আমাদের পরম আত্মীয়। বিষধরেরা এখানে ক্ষতি করে না। আমরা সাপ ধরে এনে যত্ন করি, চিকিৎসা করি। আধুনিক বিজ্ঞান নিয়ে সবকিছু ব্যাখ্যা করা যাবে না।’’

বর্ধমানের প্রত্যন্ত এই চার গ্রামে সাপে-মানুষে প্রেমের প্রশংসা আন্তর্জাতিক স্তরেও। তবে সর্প বিশেষজ্ঞদের একটাই আর্জি, সাপে কাটলে তেল-মাটি নয়, বরং চিকিৎসা চলুক সঠিক পদ্ধতিতে। কুসংস্কারের বেড়াজাল ভেঙে বেরিয়ে আসুক মানুষজন।

আরও পড়ুন:

সাপ সেখানে ঘরের লোক, বাচ্চাদের খেলনা! আপনি গেলে হাড়হিম হবে শোলাপুরের শেতপালে

Comments are closed.