শুক্রবার, এপ্রিল ২৬

শিং দু’টিতে আগুন ধরিয়ে দিল মানুষের দল, আতঙ্কে নিজেকেই মেরে ফেলল ষাঁড়, দেখুন ভিডিও

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সম্প্রতি এই মর্মান্তিক ঘটনাটির সাক্ষী হলো স্পেন। এবং যা নিয়ে আপাতত উত্তাল স্পেনের সংসদ। ক্ষুব্ধ পশুপ্রেমী থেকে সাধারণ মানুষ। ষাঁড়ের দৌড় বা running of the bull নামের এক নৃশংস খেলার আধুনিক রূপ  ‘Bulls in the Street  উৎসবে এই ঘটনাটি ঘটেছে।

স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ার ফইয়স শহরের ফাঁকা এক মাঠে মানুষের তৈরি এক একটি বিশাল বৃত্ত। সেই বৃত্তের মাঝখানের জমিতে লম্বা ও মোটা দড়িতে বেঁধে দেওয়া হয়েছে একটা প্রকাণ্ড ষাঁড়কে। ষাঁড়ের শিং দু’টিতে পেট্রল ঢেলে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে আগুন। ভীত সন্ত্রস্ত প্রাণীটি প্রাণ ভয়ে দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করে। কিন্তু গলা যে দড়িতে বাঁধা। মাথায় লাগছে প্রচন্ড উত্তাপ। যন্ত্রণায় চেঁচাতে থাকে ষাঁড়। সেই চিৎকার শুনে,  উন্মত্ত জনতার উল্লাস বাড়তে থাকে। ষাঁড়টির সামনের  মাটিতে বিশেষ উদ্দেশ্যে পোঁতা আছে ছয় ফুট লম্বা ও বেশ মোটা অনেকগুলি শক্ত কাঠের বিম।  যন্ত্রণায় কাতর ষাঁড়টি গুঁড়িকেই শত্রু ভেবে ছুটে এসে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করে । মুহূর্তেই  চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় তার মাথার খুলি। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ষাঁড়টি। ষাঁড়টি জীবিত কিনা জানতে উড়ে আসে জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরো। এবং এসবই ঘটে সমবেত হাজার হাজার জনতার সামনে। তাদের মধ্যে ছিল অনেক শিশুও।

ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে। স্পেনের পশুপ্রেমীরা বিশ্বজুড়ে ভিডিওটি শেয়ার করছেন। অবিলম্বে তাঁরা এই ধরণের নিষ্ঠুর খেলা বন্ধ করতে চান। কিন্তু স্প্যানিশ সরকারের  অনেক মন্ত্রীই মনে করেন বুলফাইটিং এবং ষাঁড়কে নিয়ে এইসব  খেলা স্পেনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এবং  এই ঐতিহ্য ধরে রাখা উচিত।

প্রাচীন কাল থেকেই  স্পেনের মানুষদের জীবনযাত্রার অঙ্গ ‘কোরিদা‘ বা  বুলফাইটিং। পৃথিবীর যে যে অঞ্চল স্প্যানিশরা দখল করেছিলো, সেই সেই জায়গাগুলিতে জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল বুলফাইটিং এবং ষাঁড়কে নিয়ে অনান্য খেলা। যেমন পর্তুগাল, দক্ষিণ ফ্রান্স, মেক্সিকো, কলম্বিয়া ও ইকুয়েডর, ভেনিজুয়েলা ও পেরু। কিন্তু প্রায় সব দেশে নিষিদ্ধ হলেও  স্পেনে এখনও নিষিদ্ধ হয়নি ষাঁড়কে নিয়ে নৃশংস খেলা। তবে আজ স্পেনের বেশিরভাগ মানুষই  আনন্দের জন্য নিষ্ঠুরভাবে পশু হত্যা করা মেনে নিতে পারেন না। স্পেনের মাত্র ১৯ শতাংশ মানুষ বুলফাইটিংকে সমর্থন করেন। বারবার এই খেলা বন্ধ করার জন্য আন্দোলন চালিয়েছেন বাকিরা । ২০১২ সালে স্পেনের কিছু কিছু জায়গায় স্থানীয় বুলফাইটিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু পুরোদমে চলছে  running of the bull এবং ‘Bulls in the Street নামে নিষ্ঠুর খেলা দুটি।

কিন্তু ২০১৩ সালে স্পেনের কংগ্রেস বুলফাইটিংকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্থান দেয়। এবং running of the bull এবং ‘Bulls in the Street নামের মারণ খেলা দুটিকে আইনের রক্ষাকবচ দিয়ে সুরক্ষিত করে দেয়। স্পেনের কোনও প্রদেশ বুলফাইটিংকে স্থানীয়ভাবে বন্ধ করতে পারবে না বলে জানিয়ে দেয়। সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা করে, পশু অধিকার নিয়ে সরব সংগঠনগুলি জানায়, “এই সিদ্ধান্ত মৃত বুলফাইটিং ইন্ডাস্ট্রিকে জাগিয়ে তোলার কৌশল‘। PETA, Humane Society International, এবং the World Society for the Protection of Animals  প্রভৃতি সংগঠন একযোগে এক বিবৃতিতে বলেছিল,বুলফাইটিং একটি নিষ্ঠুর ও প্রাচীন খেলা,  এই যুগে যেটির কোনও স্থান নেই। এবং সংস্কৃতির সেখানেই মৃত্যু ঘটে যেখানে নিষ্ঠুরতা জম্ম নেয়”

সেই মর্মান্তিক ভিডিও

The Humane Society-র দেওয়া এক তথ্য থেকে জানা গেছে, স্পেনে এই তিনটি খেলায় বছরে ২,৫০,০০০ ষাঁড়কে হত্যা করা হয়। সুখের কথা, স্পেনের অনেক সংসদ সদস্য সাম্প্রতিক ঘটনাটি নিয়ে বিচলিত এবং এই ধরণের প্রথা নিষিদ্ধ করার পক্ষে l কিন্তু যে শহরে ঘটনাটি ঘটেছে তার  মেয়র জোসেবা আসিরন উলটো পথে হেঁটে বললেন, ” প্রতিদিনের সন্ধ্যে বেলার বুলফাইটিং শো বন্ধ করা হলেও running of the bull এবং ‘Bulls in the Street প্রথা চালু থাকবে।”

এর মধ্যে, গত বছরই রাষ্ট্রসংঘ স্পেনকে নির্দেশ দিয়েছিল, বুলফাইটিং এরিনায় বা গ্যালারিতে ১৮ বছরের কম বয়সের কাউকে ঢুকতে দেওয়া যাবে না।  কারণ স্পেনের শিশুমনে এই নৃশংসতার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। শিশুরা কেউ কেউ অজান্তেই ঘটিয়ে ফেলছে নৃশংস ঘটনা। কেউ আবার এতো নিষ্ঠুরতা দেখে ট্রমায় ভুগছে। একটি ষাঁড়ের মৃত্যু, হঠাৎই স্পেনকে নৈতিকতার প্রশ্নে দ্বিখন্ডিত করে দিয়েছে। এখন দেখা যাক জয় কার হয়। নিষ্ঠুরতার নাকি শুভবুদ্ধির।

Shares

Comments are closed.