বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত, তবু বন্ধ হল না বৌবাজারের বিশ্বকর্মা পুজো! ঘুড়িশূন্য আকাশ ছেয়ে রইল বিষাদে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: গত বার পর্যন্তও এই দিনটায় ঘুড়ির ঘনঘটা চলত সে-পাড়ার আকাশে। সারা শহরের ঘুড়িশিল্প ক্রমে নিভে যেতে থাকলেও, তারা কিন্তু একটুও পিছু হটেনি এ ঐতিহ্যের উড়ান থেকে। দু’দিন আগে থেকেই শুরু মাঞ্জা দেওয়ার পালা, আর এই দিন সকাল থেকেই শুরু আকাশ কাঁপানো ভোঁকাট্টা হুঙ্কার। সে-পাড়ার আকাশে আগের বছরও লড়াই করেছে পেটকাটি, বগ্গা, মোমবাতি ঘুড়ির দল। এ-ছাদ ও-ছাদ পাল্লা দিয়ে কেটেছে পরস্পরের ঘুড়ি। ঠিক এক বছর পরে, সেই পাড়াতেই যেন মৃত্যুপুরীর স্তব্ধতা।

    এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, “আমাদের জীবনের ঘুড়িই টালমাটাল হয়ে গেছে। কাল কী হবে জানি না। এখন পুজো, উৎসব, আনন্দ– এ সবের অস্তিত্বই খুঁজে পাচ্ছি না জীবনে।” অবশ্য এখন আর তাঁদের ‘এলাকার বাসিন্দা’ বলা যায় কি না, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব আছে। কারণ সে এলাকার নাম বৌবাজার। আর বাসিন্দারা জানেন না, তাঁরা আদৌ সেখানে কোনও দিন বাস করতে পারবেন কি না। বাড়িতে ফেরা তো দূরের কথা। কতক বাড়ি ধূলিস্যাৎ, আর বাকি কতক ফুটিফাটা। যে ক’টা আস্ত আছে, সে ক’টাও যে থেকেই যাবে, তা জোর দিয়ে বলা যায় না।

    ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো সম্প্রসারণের কাজ চলার সময়ে মাটির তলা দিয়ে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার জেরে ভেঙে পড়ে গিয়েছে বৌবাজারের দুর্গা পিথুরি লেন এবং স্যাকরাপাড়া লেনের একের পর এক বাড়ি। রাতারাতি গৃহহীন হয়েছে বেশ কয়েকটি পরিবার। এর পরে আগাম সতর্কতার দরুণ ওই এলাকার আরও বহু বাড়ি খালি করে দিয়েছে পুলিশ। কয়েক ঘণ্টার নোটিসে, সব কিছু ছেড়ে তাঁরা এসে উঠেছেন চাঁদনি চক-ধর্মতলা চত্বরের কয়েকটি হোটেলে। সংখ্যাটা চারশো জনেরও বেশি। এই ঘটনার পরে পেরিয়ে গিয়েছে দিন কুড়ি। বন্ধ হয়েছে মেট্রোর কাজ। কিন্তু এখনও দিশাহারা মানুষগুলি। সান্ত্বনা বলতে, রাজ্য সরকার আৎ মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষের দেওয়া কয়েক লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ। কিন্তু সব ক্ষতি কি টাকা দিয়ে পূরণ হয়?

    বিপর্যয়ের পরেও নিয়ম মেনে এসে পড়েছে উৎসবের মরসুম। আজ বিশ্বকর্মা পুজো। এ পুজোর পায়ে পায়েই এসে যাবে দুর্গাপুজো। কিন্তু ঘরহারা মানুষের কি আর পুজো হয়? সব হারানোর যন্ত্রণায় মলম লাগায় কোন উৎসব! এই প্রশ্ন বুকে নিয়েই দাঁতে দাঁত চেপে কোমর বেঁধেছিলেন এলাকার স্বর্ণকাররা। বিশ্বকর্মা পুজোর আয়োজন করতে চেয়েছিলেন, এত বড় বিপর্যয়ের পরেও।

    বৌবাজারের দুর্গ পিথুরি লেন এবং স্যাকরাপাড়া লেন এলাকার বহু বাসিন্দার পেশা কোনও না কোনও যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় সাড়ে চারশো গয়নার কারিগর, মনিকার, হলমার্ক শিল্পী ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী রয়েছেন এখানে। অনেকেরই বাড়িতে ছাপাখানা আছে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই শিল্পকলার দেবতা বিশ্বকর্মা পুজোয় এখানে মহা ধূমধাম হয় ঘরে ঘরে। আগের রাতে ঠাকুর আনা থেকে, সন্ধের খাওয়া দাওয়া পর্যন্ত উৎসবের মেজাজে মেতে ওঠেন সকলে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আকাশ জুড়ে ঘুড়ির লড়াই। এই দিনটাই তাঁদের সকলের কছে সারা বছরের ভাল কারবারের সূচক। কিন্তু এবার যেন আর কিছুই ভাল হওয়ার নেই! তবু পুজো হল।

    এত বছর প্রতিটি দোকানে, কারখানায় আলাদা করে যে পুজো হতো। এ বছরে তা না হয়ে, সকলে মিলে একটাই পুজোর আয়োজন করেছেন তাঁরা। নিজের নিজের ঘরের গণ্ডি ছাড়িয়ে এ বছরের বিশ্বকর্মা তাই সর্বজনীন। সৌজন্যে, বৌবাজারের গৌর দে লেনের বাসিন্দারা। যাঁদের অবস্থা তুলনামূলক একটু ভাল। তাঁদেরই প্রয়াসে আয়েজিত হল একটি বিশ্বকর্মা পুজো। সেখানেই আমন্ত্রিত আশপাশের বিপর্যস্ত পাড়ার সেই সব মানুষেরা, যাঁদের এবার আলাদা করে কোনও পুজো নেই।

    মলিন হাসি মুখে নিয়েই দিনটিকে উদযাপন করলেন তাঁরা। বৃষ্টি ভেজা শরৎ দিনে তাঁরা প্রার্থনা করলেন, শুধু আনন্দে নয়, বিষাদেও যেন সঙ্গে থাকেন ঈশ্বর। শুধু শিল্পের উত্তরণ নয়, ভাঙনের বন্ধুর পথও যেন তাঁরা পার করতে পারেন শিগ্গিরি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More