শনিবার, মার্চ ২৩

দিদি বলছেন ৪২টায় ৪২টাই চাই, অথচ জোট নিয়ে ঘুম নেই কংগ্রেসে!

শঙ্খদীপ দাস 

একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্লোগান তুলেছিলেন, ৪২টার ৪২টাই চাই। উনিশের ভোটে বাংলায় সবকটি লোকসভা আসনে জিততে হবে তৃণমূলকে। যার মানে একটাই,- লোকসভা নির্বাচনে বাংলায় কোনওরকম জোটের পথেই হাঁটবে না তৃণমূল। একা লড়বে। ঠিক যেমন চোদ্দর ভোটে লড়েছিল।

কিন্তু দিদি এমন অবস্থান নিলে কী হবে, বাংলা কংগ্রেসের একটা বড় অংশ এখনও জোট-আলোচনায় মশগুল। মঙ্গলবার বিধান ভবনে জেলার কংগ্রেস নেতাদের সাংগঠনিক আলোচনার জন্য ডেকেছিলেন প্রদেশ কংগ্রেসের নব নিযুক্ত সভাপতি সোমেন মিত্র। সর্বভারতীয় কংগ্রেসের তরফে পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা গৌরব গগৈ উপস্থিত ছিলেন সেখানে। সূত্রের খবর সেখানেও তৃণমূলের সঙ্গে জোটের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন কেউ কেউ। তা শুনে গৌরব গগৈ বলেন, কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী দিল্লি থেকে কোনও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষে নন। আপনারা যা চাইবেন, তাই হবে। সব শুনে সোমেনবাবুও বলেন, আমরাও কেউ মন থেকে তৃণমূলের সঙ্গে যেতে চাই না। তবে এআইসিসি যা বলবে মেনে নিতে হবে।

বস্তুত এ সব কথোপকথনের সার মর্ম একটাই,- জোট নিয়ে আশা অথবা আশঙ্কা এখনও দিব্য বেঁচে রয়েছে বাংলা কংগ্রেস! কিন্তু পরক্ষণেই ফিরে আসে সেই প্রশ্নটাই। দিদি কি আদৌ জোট চান?

রাজনীতিতে অনেক সময়েই ঘটে, প্রকাশ্যে যে কথা বলা হয় সেটাই চূড়ান্ত কৌশল নয়। হাতির দাঁতের মতো। খাওয়ার জন্য এক রকম, দেখানোর জন্য অন্যরকম। হতেই পারে একুশের মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে কথা বলেছিলেন, তা শুধুই দলের কর্মীদের উজ্জীবিত করার জন্য। তা আসল কৌশল নয়।

তর্কের খাতিরে সেটাই ধরে নিলেও আনুসঙ্গিক অনেক প্রশ্ন থেকে যায়। প্রথমত, উনিশের ভোটে যদি কংগ্রেস এবং তৃণমূলের জোট হয়, তা হলে রাজ্য রাজনীতিতে কি মেরুকরণ আরও তীব্র হবে না? কারণ তখন গোটা লড়াইটাই কংগ্রেস ও তৃণমূল বনাম বিজেপি-তে পর্যবসিত হবে। দক্ষিণবঙ্গে এমনিতেই ক্ষয়িষ্ণু কংগ্রেস। ফলে জোটের জন্য কংগ্রেসের লাভ হলেও তৃণমূল কী পাবে? বরং জোট না হলে, এবং বিরোধী ভোট বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেসে ভাগাভাগি হলে তৃণমূলের লাভ নয়কি!

দ্বিতীয়ত, ইতিমধ্যে অনেক সমীক্ষা জানাতে শুরু করেছে লোকসভা ভোটে বাংলায় আসন বাড়াবে বিজেপি। বর্তমানের দু’টি আসন থেকে তা বেড়ে সাত-আটটা হতে পারে। এবং নতুন যে আসনগুলিতে বিজেপি-র জেতার ব্যাপারে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে তা এখন তৃণমূলেরই দখলে রয়েছে। যেমন, ঝাড়গ্রাম, রানাঘাট, কৃষ্ণনগর, বনগাঁ ইত্যাদি। হতেই পারে যে এই সব সমীক্ষার কোনও পূর্বাভাসই মিলল না। লোকসভা ভোটে আসন বাড়ানো দূরস্থান, আসন কমে গেলে বিজেপি-র। কিন্তু ভোটের আগে তৃণমূলের অন্দরে আসন হারানোর আশঙ্কাটা তো বাস্তব। সুতরাং সেই অবস্থায় কংগ্রেসকে কেন আসন ছাড়বে তৃণমূল? শেষ পর্যন্ত সত্যিই যদি বিজেপি সাত-আটটি আসন জিতে যায়, তা হলে লোকসভায় তৃণমূলের আসন সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় অনেক কমে যাবে। তেমন আশঙ্কা থেকে ৪২টা আসনে প্রার্থী দেওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত নয়কি! মমতার স্থানে রাহুল গান্ধী থাকলে কী করতেন?

তৃতীয়ত, তৃণমূল কংগ্রেস গঠিত হওয়ার পর থেকেই উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় জনভিত্তি দুর্বল। ২০১৬ সালে বিধানসভা ভোট পর্যন্ত তাই ছিল। ওই ভোটে মালদহে একটি আসনও জিততে পারেনি তৃণমূল। কিন্তু তার পর থেকে মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও উত্তর দিনাজপুরে রাজনৈতিক সক্রিয়তা বাড়িয়েছে তৃণমূল। যে ভাবেই এই তিন জেলায় এখন সাংগঠনিক ভাবেও সব থেকে শক্তিশালী বাংলায় শাসক দল। ফলে প্রশ্ন থেকে যায়, এত পরিশ্রম করার পরেও মালদহ, মুর্শিদাবাদ, জঙ্গিপুর বা রায়গঞ্জের মতো লোকসভা আসন কংগ্রেসকে কি ছাড়তে চাইবে তৃণমূল!

চতুর্থত, রাজনৈতিক মহলের অনেকেরই ধারণা উনিশের নির্বাচনে কোনও একটি দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। কেন্দ্রে জোট সরকার গঠনই ভবিতব্য হতে চলেছে। সেই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক দলগুলির গুরুত্ব আরও বাড়বে। যার আসন যত বেশি হবে সে তত বড় নির্ণায়ক শক্তি হিসাবে মাথা তুলবে। মূলত সেই ভাবনা থেকেই তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদেরও আগ্রহ রয়েছে, বাংলায় যত বেশি সম্ভব আসনে জেতা। যাতে ভোটের পর তৃণমূল জাতীয় স্তরে বড় শক্তি হিসাবে মাথা তুলতে পারে। তৃণমূলের মধ্যে ভাবনা যদি সত্যিই তেমন থাকে তা হলে কি কংগ্রেসের জন্য আসন ছাড়তে রাজি হবেন দিদি?

তবে এ সবের পরেও অনেকে বলছেন, জাতীয় স্তরে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির জোট মজবুত করতে তৃণমূলের উচিত কংগ্রেসকে কিছু আসন ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু এই প্রস্তাবের সপক্ষে জোরালো যুক্তি নেই। বাংলায় যথাসম্ভব বেশি আসন জিতে কেন্দ্রে মোদীবিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ জোট শক্তিশালী করায় বাধা কোথায়?

কে জানে হতে পারে কংগ্রেসের মধ্যে এর পরেও জোট নিয়ে কিছু বাস্তব বা অলীক ভাবনা রয়েছে। নইলে এতো আলোচনা কেন!

 

Shares

Comments are closed.