সোমবার, অক্টোবর ১৪

বন্ধ আউটডোর, ধর্না-বিক্ষোভে জেরবার রোগীদের ঠাঁই রাস্তায়, জুনিয়র ডাক্তারদের বিরুদ্ধে দায়ের তিন জোড়া মামলা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বুধবার সকালেই কলকাতার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের সামনে ধর্না, বিক্ষোভ ও রোগীদের চূড়ান্ত হয়রানির ছবিটা স্পষ্ট ছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয়নি। এনআরএস তো বটেই, আউটডোর বন্ধ এসএসকেএম, মেডিক্যাল কলেজ, আর জি করেও। ফলে বাড়ছে রোগী হয়রানি। হাসপাতালে বাইরে রাস্তায় রোগীদের নিয়ে অনন্ত অপেক্ষায় তাঁদের পরিবারের লোকজন। সেই সঙ্গে পথ অবরোধের জেরে পরিবহনের অবস্থাও তথৈবচ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও জুনিযর ডাক্তারদের কথায়, সরকারি হাসপাতালগুলির ইমার্জেন্সি বিভাগ বন্ধ না হলেও আউটডোর পরিষেবা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ। বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে সরাসরি কিছু বলা হয়নি। অন্যদিকে, শহর ছেড়ে জেলা– সর্বত্র ‘শাটডাউন’-এর ডাক দিয়েছেন জুনিয়র ও সিনিয়র চিকিৎসকেরা। ফলে স্বভাবতই সমস্য়ায় পড়েছেন দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাঁদের পরিবারের লোকজন। প্রশ্ন উঠেছে, জরুরি পরিষেবা বলতে ডাক্তারটা ঠিক গুরুত্ব দিয়ে বোঝাতে চাইছেন? এমনিতেই চিকিৎসা পরিষেবা পর্যাপ্ত নয় এ রাজ্যে, তার উপরে যদি চিকিৎসকেরা কাজই না করেন, তা হলে বহু আশঙ্কাজনক রোগীর জন্য তা নিশ্চিত মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।

পিজি হাসপাতালের বাইরে চলছে ধর্না

এ দিকে আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্য়েই তিন জোড়া মামলা দায়ের হয়েছে। মহম্মদ সায়েদ নামে যে ব্যক্তির মারা যাওয়ার খবর মিলেছে তাঁর পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে জুনিয়র ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৪এ ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে।  অন্য দিকে, মামলা করেছেন মৃতের প্রতিবেশীরা। তাঁদের দাবি বিক্ষোভের মুখে জুনিয়র ডাক্তাররা চড়াও হয়েছিলেন তাঁদের উপর। মৃতের পরিবার আলাদা করে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৪১, ৩২৩, ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় মামলা দায়ের করেছে। এ দিকে জুনিয়র ডাক্তারদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন আনন্দবাজার পত্রিকার এক চিত্র সাংবাদিক। অভিযোগ, ছবি তুলতে যাওয়ার সময় তাঁর ক্যামেরা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, গায়েও হাত তোলা হয়েছে। চিত্র সাংবাদিকের অভিযোগের ভিত্তিতে জুনিয়র ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৪১, ৩২৩, ৪২৭ ও ৩৪ ধারায় মামলা করা হয়েছে।

এনআরএসে হামলা ও চিকিৎসক নিগ্রহের ঘটনায় রাজ্যের সমস্ত মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে বারো ঘণ্টার কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে চিকিৎসকদের একাধিক সংগঠন। দূরদূরান্ত থেকে কলকাতায় আসা রোগী ও তাঁদের বাড়ির লোকেরা আউটডোর ও ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনে ভিড় করলেও কোনও দরজা তাঁদের জন্য খোলেনি। ফলে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন রোগীর পরিবারের লোকজন। রাস্তার মাঝেই শুয়ে বা বসে ক্ষোভ দেখাতে থাকেন তাঁরা।

পিজি ইমার্জেন্সি বিভাগের বাইরে

সোমবার রাতে এনআরএস হাসপাতালে এক বৃদ্ধের মৃত্যুতে তার পরিবারের লোকজন চড়াও হয় চিকিৎসকদের উপর। এর জেরে ২০০ গুন্ডা এসে বেধড়ক মারধর করে হাসপাতালের জুনিয়র চিকিৎসকদের। মাথার খুলির সামনের অংশ তুবড়ে গিয়েছে ২৪ বছরের সদ্য চিকিৎসক পরিবহ মুখোপাধ্যায়ের। হাসপাতালে মৃত্য়ুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন তিনি। বুধবার তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। এ দিন সকালে পরিবহর সিটি স্ক্য়ান করা হয়। তবে শঙ্কার মেঘ এখনও কাটেনি। পরিবহর পরিবারের কথায়, “আমরা তো রোগী বা তাঁর পরিবারের কোনও ক্ষতি চাইনি। তাহলে এমন কেন হলো।”

এনআরএস কাণ্ডের জেরে কলকাতার মতো জেলার সামগ্রিক ছবিটাও একই রকম। জেলার মেডিক্যাল কলেজগুলিতেও অশান্তির আঁচ মঙ্গলবার রাত থেকেই ছড়িয়ে পড়েছে। বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে ইন্টার্ন ও পুলিশের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। হাতাহাতিও বেধে যায়। অভিযোগ, পুলিশের হাতে ইন্টার্নরা মার খেয়েছেন। অন্য দিকে, পুলিশের অভিযোগ, তাঁদের মেরেছেন জুনিয়র ডাক্তারেরা। হাসপাতাল চত্বর থেকে পুলিশ ক্যাম্প তুলে নেওয়া হয়েছে।

বর্ধমান, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ সর্বত্রই চলছে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। বুধবার সকাল থেকে নতুন করে কর্মবিরতির ডাক দিয়েছেন মেদিনীপুর মেডিক্য়াল কলেজের জুনিয়র ডাক্তাররা। বন্ধ বর্হিবিভাগ পরিষেবা, এমনকি ইন্ডোরেও পরিষেবা মিলছে না বলে খবর। সকাল থেকে লাঠি নিয়ে হাসপাতালের গেটে চড়াও হয়েছেন রোগীর পরিবারের লোকজন।

বর্ধমান ও মুর্শিদাবাদ মেডিক্য়ালের ছবিটাও একই রকম। কোথাও কোথাও ইমার্জেন্সি খোলার থাকার খবর মিললেও আউটডোর পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ। মেডিক্য়াল কলেজ চত্বরে চলছে অবস্থান।

বাগনান গ্রামীণ হাসপাতালে রোগী দেখছেন ডাক্তারবাবুরা

বেশিরভাগ জেলাতে চিকিৎসা পরিষেবা যখন মুখ থুবড়ে পড়েছে তখন মানবিক রূপ দেখিয়েছে বাগনানের গ্রামীণ হাসপাতাল। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ওপিডি বন্ধ থাকলেও, গাছ তলাতেই রোগীদের জরুরি পরিষেবা দিচ্ছেন ডাক্তাররা। একদিকে চলছে অবস্থান, অন্য়দিকে রোগী দেখছেন ডাক্তারবাবুরা।

 

আরও পড়ুন:

এসএসকেএম, এনআরএসের সামনে পথ অবরোধ রোগীর পরিজনদের, মুখ্যমন্ত্রী দেখুন, বলছেন তাঁরা

Comments are closed.