পর্দায় নয়, বাস্তবে ‘ছোটদের ছবি’! ওপার বাংলায় সপরিবার র‌্যাকেট হাতে ঝড় তুলছেন তাঁরা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

দরজা ঠেলে বিশাল হলঘরটায় ঢুকেই, যে কোনও কেউ-ই একটু থমকে দাঁড়াবেন। কাঠের মেঝে জুড়ে ব্যাডমিন্টন খেলছে সবাই। কী উৎসাহ, কী উদ্দীপনা গোটা হলঘর জুড়ে! এনার্জিতে যেন চনমন করছে সকলে। তাঁদের ঘামে ভেজা মুখচোখের উজ্জ্বলতাই বলে দেয়, তারা ঠিক কতটা খুশি! কিন্তু না, থমকে যাওয়ার কারণ এটা নয়। ঘর ভর্তি ব্যাডমিন্টন প্লেয়ারদের দিকে একটু চোখ মেলে তাকালেই দেখা যাবে, তাদের কারও হয়তো একটা হাত নেই, তো কারও পা নেই! কেউ আবার হুইল চেয়ারে বসেই র‌্যাকেট চালাচ্ছে!

এদের মধ্যেই আপনার আলাদা করে চোখে পড়বে একটি গোটা পরিবার। বাবা, দু’ছেলে ও এক মেয়ে– সকলের উচ্চতাই স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা কম। এক কথায় এদের বামন বলেন অনেকেই। শারীরিক প্রতিবন্ধীর আওতায় পড়েন এরা। অথচ শরীর এবং অন্যান্য সমস্ত প্রতিবন্ধকতা উড়িয়ে এঁরা সবাই মিলে খেলছেন প্যারা-ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপে!

বাংলেদেশের এই পরিবারটি মনে করে, তারা কারও থেকে কোনও অংশে কম যায় না। একটু উৎসাহ আর ভরসা পেলে, সারা দেশের গর্ব হয়ে উঠতে পারে তারা।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানার বাসিন্দা আবদুল আউয়াল। ছোটবেলা থেকেই উচ্চতা বাড়েনি তাঁর। বামন হয়ে থেকে গিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী হালিমা অবশ্য স্বাভাবিক উচ্চতার। তাঁদের বড় ছেলে আল আমিনও স্বাভাবিক। কিন্তু বাকি দুই ছেলে ও মেয়ে হয়েছে বাবার মতোই। তাঁদের উচ্চতা তিন ফুটেরও কিছু বেশি।

সমাজের ঠিক করে দেওয়া ‘স্বাভাবিক’ কাঠামোয় খাপ খায়নি পরিবারটি। অবহেলা ও ব্যঙ্গের শিকার হয়ে থেকে গিয়েছে। স্কুলেও অন্য ছাত্রছাত্রীদের অবজ্ঞায়, ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা এগোয়নি বেশি দূর। মেয়ে পঞ্চম শ্রেণী, মেজো ছেলে ইয়ামিন হোসেন সপ্তম শ্রেণী এবং ছোট ছেলে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। কিন্তু তার পরও দমে যায়নি তারা।

পরিবারের মা বাদে সবাই  হাতে তুলে নিয়েছেন ব্যাডমিন্টনের র‌্যাকেট। হয়ে উঠেছেন পেশাদার  খেলোয়াড়। প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্যারা ব্যাডমিন্টনের অলিম্পিক্সে যোগ দেওয়ারও। চিটাগাং রোডে চায়ের দোকান করেই সংসার চলে আবদুল আউয়ালের।

আবদুলের কথায়, “আমার ছেলেমেয়েরা যদি খেলতে চায়, কখনও কোনও বাধা দেব না আমি। মাঝে মাঝে মনে হয়, ছেলেরা যদি স্বাভাবিক হতো তা হলে হয়তো আরও ভালো খেলতে পারত। তার পরে আবার ভাবি, স্বাভাবিক হলে হয়তো লেখাপড়া করে চাকরিই করতো। খেলত না। আল্লা যা করেন, ভালর জন্যই করেন।”

তবে স্বামী এবং সন্তানদের নিয়ে কোনো আফসোস নেই সুস্থ সবল হালিমার। তিনি মনে করেন, সৃষ্টিকর্তা কাকে কখন কী ভাবে রাখবেন তা তিনিই জানেন। তাঁর কথায়, “ওদের চেহারায় তো কারও হাত নেই, তাই ও নিয়ে আর ভাবি না আমি। আমি শুধু চাই, ছেলেমেয়েরা দুর্দান্ত ব্যাডমিন্টন খেলুক। চমকে নিক সবাইকে। ওরা যাতে ভাল ভাবে অনুশীলন করতে পারে, সে জন্য সব সময় চেষ্টা করি আমি।”

বাংলাদেশ প্যারা-ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের সভাপতি ও জাতীয় ব্যাডমিন্টন কোচ এনায়েত উল্লা খান বলেন, “ঢাকায় আয়োজিত এই ইনডোর প্রতিযোগিতায় সারা দেশের আটটি জেলার ৩৫ জন শারীরিক প্রতিবন্ধী (প্যারা) ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় চারটি ইভেন্টে অংশ নিচ্ছেন। ইভেন্টগুলো হলো- এসএস সিক্স (শর্ট স্ট্যাচার), এসইউ ফাইভ (স্ট্যান্ডিং আপার), এসএল থ্রি (স্ট্যান্ডিং লোয়ার) ও হুইলচেয়ার। আমি নিশ্চিত, ভবিষ্যতে এরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকেও পদক জিতে আনবে। অলিম্পিক্সের দরবারে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More