বুধবার, ডিসেম্বর ১১
TheWall
TheWall

ইউনিফর্ম পরেই ধান কাটে, ফসল তোলে অসমের এই কলেজের পড়ুয়ারা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাঠে নামার আগে লাল-কালো চেক স্কার্টটা আর একটু গুটিয়ে নিতে হয়। না হলে জলকাদায় ইউনিফর্ম নষ্ট হয়ে যাবে। কেউ আবার স্কার্টের উপর জড়িয়ে নেয় গামছা। মাথায় বেঁধে নেয় কাপড়ের ফেট্টি। ওরা পড়ুয়া। ওরা চাষ করে। ক্লাসের ফাঁকেই মাঠে নামে। বীজ বপন করে, সার দেয়, কীটনাশক ছড়ায়। আবার ফসল পাকলে সঠিক সময় ঝাড়াই বাছাই করে ঘরেও তোলে। কারও দায়িত্ব ধান চাষ, কারও গম, কেউ বা আবার চা-বাগানের দায়িত্বে। রোদ, ঝড়বৃষ্টিতে কামাই নেই। দেশের শত শত চাষি খিদের পেটে যদি মাঠে নেমে হাল ধরতে পারে, তোমরা পারবে না কেন? স্কুলের পাঠ এটাই। বাধ্যবাধকতা নয়, মনের আনন্দেই জমি চষে এই কলেজের ছাত্রছাত্রীরা।

অসমের উদলগুরি জেলার ‘অ্যাসপায়ার জুনিয়র কলেজ’।  উচ্চমাধ্যমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস এই কলেজেই হয়। ছাত্রছাত্রীদের জন্য ইউনিফর্মও নির্দিষ্ট। স্কুলের নিয়ম, এই ইউনিফর্মেই মাঠে নামতে হবে। চাষের কাজ প্রথম প্রথম দেখিয়ে দিতেন চাষিরাই। এখন ছেলেমেয়েরা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। বীজ বোনা থেকে ফসল কাটা—সবেতেই তুখোড় তারা। কী ভাবে আরও উন্নতমানের বীজ বোনা যায়, জৈব সারের প্রয়োগ করতে হয় সেটা নিজেরাই শিখে নিচ্ছে বই এবং ইন্টারনেটের পাতা ঘেঁটে।

এই স্কুলে শরীরচর্চার জন্য আলাদা ক্লাস হয় না, চাষবাসেই ছেলেমেয়েদের আগ্রহ তৈরি করা হয়, জানিয়েছেন কলেজের প্রিন্সিপাল মইহর্ষ বোরো। তাঁর কথায়,  কৃষিপ্রধান দেশের ছেলেমেয়েরা চাষ শিখবে না, সেটা কখনও হয় নাকি? সিলেবাসের পাঠে তারা ডিজিটাল যুগকে চিনবে, কিন্তু দেশকে চিনবে না! ছেলেমেয়েদের গ্রাম্য জীবনের ছোঁয়া দিতেই আমাদের এই প্রচেষ্টা।”

ধান চাষে উৎসাহ মেয়েদের, ছেলেরা ভুট্টার খেতে বেশি পারদর্শী

আকাশের দিকে অপলক চেয়ে ঈষৎ হলুদ ফুলকপি। তার কিঞ্চিৎ তফাতে হাত ধরাধরি করে আছে সবুজ, লাল ক্যাপসিকাম, কাঁচালঙ্কা। কিছুটা দূরে মাটি ফুঁড়ে মাথা তুলছে আলু। টকটকে লাল টোম্যাটোয় ভরেছে গাছ। একপাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে ছোট ছোট কলাগাছ। এ সবের ফাঁকে ইতিউতি উঁকি মারছে নানা রঙের ফুল। চাষের হাতেখড়িটা হয়েছিল উদ্যানপালন দিয়েই। জানিয়েছেন কলেজ কর্তৃপক্ষ। ধীরে ধীরে জমি চাষে আগ্রহ তৈরি হয়।

নানারকম ধানের বীজ সম্পর্কে ছাত্রীরা বেশ ওয়াকিবহাল। কী ভাবে ধান জমি চষতে হয়, মেয়েরা বিলক্ষণ জানে। এমনকি ফসল কাটার সময়ে তাদের উৎসাহ নাকি থাকে চোখে পড়ার মতো। ছেলেদের ভিড় বেশি ভুট্টা খেতগুলিতে। ক্লাসের চেয়ে বেশি মন পড়ে থাকে জমিতে। প্রিন্সিপাল বোরো বলেছেন, “পাকা ফসল দেখলে শিশুর মতো হেসে ওঠে ওরা। কোনও বয়স্ক চাষিকে জমি চষতে দেখলে, এখন ছুটে গিয়ে সাহায্যও করে পড়ুয়ারা। মানবিকতার এই পাঠই তো দিতে চেয়েছিলাম আমরা।”

নম্বরের ইঁদুর-দৌড় নেই, আছে সবুজের ছোঁয়া

এই কলেজে ভারী মজা, কিল-চড় নাই— ব্যাগের বোঝা নেই, সিলেবাস শেষ করার তাড়া নেই, শিক্ষক-শিক্ষিকার চোখ রাঙানি নেই। পড়াশোনার ধরন একেবারেই আধুনিক। শুধুমাত্র পড়ার বই নয়, পড়ুয়ারা এখানে জীবনের পাঠ নেয়।  চার দেওয়ালের নার্সারি নয়, জলকাদা ভরা জমিতে নেমে কাঁচা সবুজের ছোঁয়া পায়। এই কলেজের পড়ুয়ারা জানে, কোন সময়ে আলু চাষ করা হয়। গাছে সবুজ টম্যাটো কী ভাবে ধীরে ধীরে লাল হয়ে যায়। কোন মাটিতে বাদশাভোগ, রাঁধুনীভোগ বা গোবিন্দভোগের মতো সুগন্ধী চালের ফলন ভালো হয়। আউশ, আমন কিংবা বোরো ধানের চাষ কোন মাসে করলে লাভের অঙ্ক দ্বিগুণ হয়।

কলেজেরই এক ছাত্রীর কথায়, “আমরা এখন চাষি-বন্ধুদেরও শেখাই কী ভাবে উন্নত মানের চাষ করা যায়। সুগন্ধী ধানচাষের সময়ে কী ভাবে বীজতলা করতে হবে, কোন সার প্রয়োগ করলে লাভ হবে।” সুগন্ধী ধানের বীজ বুনতে পটু আশনা। সে জানিয়েছে, চাষিরা মাটির কলসিতে বীজ রেখে তার পরে কলসির মুখ কাদা দিয়ে আটকে রাখলে ভাল ফল মিলবে। যেখানে ধানের বীজ রাখা হবে সেখানে গোলমরিচ রাখা হলে বীজে পোকা লাগার সম্ভবনা থাকে না। টিন কিংবা প্ল্যাস্টিকের ব্যাগে ধানের বীজ রাখা উচিত নয়।

কলেজের এই উদ্যোগে খুশি অভিভাবকরাও। তাঁদের কথায়, আমাদের গ্রামে অনেকেরই জমি আছে, যেখানে ফসল ফলানো যায়। কিন্তু প্রশিক্ষণ নেই বলে সেই জমিতে পরবর্তী প্রজন্ম আর চাষ করছে না। অন্যকে দিয়ে চাষ করাতে হয়।ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক হওয়ার মতো কৃষিকাজও যে একটা ভাল পেশা আমাদের ছেলেমেয়েরা  সেটা শিখতে পারছে।

আরও পড়ুন:

অক্ষর পরিচয়ের এক আজব স্কুল অসমে, বর্জ্য প্লাস্টিক দিয়েই মাইনে দেয় কচিকাঁচারা

 

Comments are closed.