শনিবার, নভেম্বর ১৬

‘জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড লজ্জাজনক, ব্রিটিশ ভারতের কলঙ্কিত অধ্যায়’, মাটিতে লুটিয়ে ক্ষমা চাইলেন আর্চবিশপ

দ্য ওয়াল ব্যুরো: জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ডকে ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে এক ‘লজ্জাকর দাগ’ বলেছিলেন ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে। তবে তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমা চাননি। জালিয়ানওয়ালাবার ১০০ বছর উপলক্ষে ওই হত্যাকাণ্ডের জায়গায় গিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর হয়ে ফুল রেখেছিলেন রাষ্ট্রদূত ডমিনিক অ্যাস্কউইথ। ব্রিটিশ ভারতের সেই নৃশংস অধ্যায়ের জন্য কিন্তু প্রকাশ্যেই ক্ষমা চাইতে দেখা গেল ইংল্যান্ডের প্রসিদ্ধ ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ জাস্টিন ওয়েলবিকে। শুধু মুখেই ক্ষমা চাইলেন না বর্ষীয়ান আর্চবিশপ, মাথা নোয়ালেন শত শত শহিদের স্মৃতিচারণে। ইতিহাসের সেই মর্মান্তিক অধ্যায়ের জন্য মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অনুশোচনা জানালেন।

দু’দিনের সফরে সস্ত্রীক অমৃতসরে এসেছিলেন আর্চবিশপ জাস্টিন ওয়েলবি। মঙ্গলবার জালিয়ানওয়ালাবাগের স্মৃতি উদ্যানে গিয়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইতে দেখা যায় তাঁকে। মাটিতে সাষ্টাঙ্গে শুয়ে নৃশংস ওই ঘটনার জন্য তীব্র অনুশোচনাও প্রকাশ করেন তিনি। আর্চবিশপ বলেন, “ইতিহাসের ওই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের জন্য আমি অত্যন্ত লজ্জিত ও দুঃখিত। আমি ব্রিটিশ সরকারের কোনও প্রতিনিধি হিসেবে আসিনি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও আমার নেই। একজন ধর্মীয় নেতা হিসেবে বলছি, এই কলঙ্কের জন্য আমি শোকস্তব্ধ।”

জালিয়ানওয়ালাবাগ স্মৃতি উদ্যানের ভিজিটর বুকেও ক্ষমা চেয়ে আর্চবিশপ লেখেন, আজ থেকে একশো বছর আগে যে জঘন্য অপরাধ এই উদ্যানে ঘটানো হয়েছিল তা খুবই লজ্জাকর। মৃতদের পরিবার সেই ক্ষত কাটিয়ে উঠতে পারবেন না কোনও দিনই। প্রার্থনা করছি, এই হিংসার শিকড় উপড়ে ফেলে ক্ষমা ও সমন্বয়ের বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বে।

গত একশো বছরের ইতিহাস চর্চায় জালিয়ানওয়ালা বাগ গণহত্যাকে সাধারণ ভাবে চিহ্নিত করা হয় ‘শেষের শুরু’ বলে। জালিয়ানওয়ালা বাগ সংক্রান্ত বইপত্রে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ, দেশবিদেশের প্রতিক্রিয়া এবং রাজনীতির টানাপড়েন। জালিয়ানওয়ালা বাগে সে দিন ঠিক কী ঘটেছিল, সে নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে ইতিহাসবিদদের মধ্যেও। সরকারি ‘ডিসর্ডার্স এনকোয়্যারি কমিটি’ (হান্টার কমিটি) এবং বেসরকারি ‘কংগ্রেস পঞ্জাব এনকোয়্যারি’, এই দুটি তথ্যসূত্রই যাবতীয় আলোচনা ও সমালোচনার ভিত্তি।

১৯১৯ সালের ৩০ মার্চ সমগ্র ভারতব্যাপী সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু হবে বলে স্থির করা হল। পরে অবশ্য ৩০ মার্চের পরিবর্তে ৬ এপ্রিল আন্দোলন শুরু হল। এই আইন অমান্যের বিরুদ্ধে জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী কিছু নেতা, যেমন, অ্যানি বেসান্ত, খাপার্ডে, ওয়াচা, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়রা আপত্তি জানিয়েছিলেন।  কিন্তু আন্দোলন শুরু হল। দিল্লিতে গুলি চলল এবং দিল্লি আসার পথে গাঁধীজিকে ৯ এপ্রিল ট্রেনের মধ্যে গ্রেফতার করা হল। অমৃতসরে ডঃ কিচলু ও ডঃ সত্যপালকে পুলিশ গ্রেফতার করায় তুমুল বিক্ষোভ শুরু হয়। এরই পরিণতি বিনা প্ররোচনায় জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ড। পাঁচিলঘেরা এক ছোট্ট বাগিচায় জড়ো হওয়া এক জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য জেনারেল ডায়ার গুলি চালানোর হুকুম দিল, জনতার অপরাধ, তারা ১৮৮ ধারা ভেঙে বেআইনি সমাবেশ ঘটিয়েছে— সে সমাবেশ রাজনৈতিক হোক বা না হোক। দশ থেকে কুড়ি হাজার লোকের জমায়েতে দশ মিনিটে ১৬৫০ রাউন্ড বুলেটে সরকারি হিসেবে ৩৭৯ জন নিহত (এই সংখ্যা নিয়ে যদিও মতভেদ আছে)। নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের সমাবেশে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সেনা জেনারেল রেজিনাড ডায়ার পদ খুইয়েছিল ১৯২০-র জুলাইয়ে।

ব্রিটিশ শাসিত ভারতের এই ভয়ঙ্করতম অধ্যায়ের জন্য ব্রিটিশ সরকারের তরফে ইতিমধ্যেই দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। ভারত সফরে এসে আর্চবিশপ জাস্টিন ওয়েলবিও জানিয়েছেন, ক্ষমা ও সমন্বয়ের এই বার্তা তাঁরই মাধ্যমে ইংল্যান্ডের আনাচ কানাচেও ছড়িয়ে পড়বে।

Comments are closed.