শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

অকপট অনুষ্কা: জরায়ু বাদ দিয়েছি, ১৩টা টিউমারও ছিল, ভয় পেয়েছিলাম নারীত্ব হারাব

চৈতালী চক্রবর্তী

‘‘জরায়ু বাদ দিতে হবে জানলে মেয়েদের যে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, সেটা অনুভব করেছি গত মাসেই,’’ শুরুটা ঠিক এই ভাবেই করেছিলেন সেতারশিল্পী, রবি-কন্যা অনুষ্কা শঙ্কর। জরায়ুর টিউমার তাঁকে ক্ষতবিক্ষত করেছে সেই কিশোরীবেলা থেকেই। ঋতুস্রাবের সময় মাত্রাতিরিক্ত রক্তপাত তাঁকে বহুবার লজ্জায় ফেলেছে। বয়ঃসন্ধিকালে শারীরিক বদল, হরমোনের সমস্যা ভুগিয়েছে আরও পাঁচটা মেয়ের মতোই। পেটের ১৩টি টিউমার বাদ দিতে গিয়ে, আজ তাঁর জরায়ুই বাদ পড়েছে। এক জন নারীর কাছে তাঁর জরায়ুর গুরুত্ব কতটা সেটা বোঝাতেই নিজের যন্ত্রণার দিনের প্রতিটা মুহূর্ত টুইটারে তুলে ধরেছেন অনুষ্কা। জানিয়েছেন, কঠিন লড়াইয়ের সে দিনগুলো ছিল অন্ধকারময়। তবে তারই মাঝে বেঁচে থাকার সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছেন তিনি।

একবার নয়, দু-দু’বার হিস্ট্রেকটমি সার্জারির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। হিস্ট্রেকটমির মাধ্যমে ইউটেরাস বা জরায়ু শরীর থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। যার ফল হয় বহুবিধ। যেমন রোগীর ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায়, গর্ভধারণ করার ক্ষমতা থাকে না। অনেকের ক্ষেত্রে হিস্ট্রেকটমি সার্জারির সময় ওভারি ও ফ্যালোপিয়ন টিউবও বাদ দেওয়া হয়। বিনাইন (ক্যান্সার নয়) ফাইব্রয়েড টিউমারের কারণে জরায়ু বাদ দিতে হয়েছে অনুষ্কাকে। তিনি বলেন, ‘‘গত মাসেই ফাইব্রয়েড টিউমারের কারণে জরায়ু বাদ গেছে আমার। স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ এবং অনকোলজিস্টরা হিস্ট্রেকটমি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমার জরায়ু বাদ দেন। একটা বিরাট আকারের টিউমার ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছিল আমার জরায়ুর মধ্যে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হত আমি ছ’মাসের অন্তঃসত্ত্বা।’’ অনুষ্কার কথায়, ‘‘আমার পেটের মধ্যে বাসা বেঁধেছিল আরও ১৩টি টিউমার। জুড়ে গিয়েছিল পেশীর সঙ্গেও। সবগুলিকেই কেটে বাদ দিয়েছেন ডাক্তাররা। সেই সঙ্গে জরায়ু হারিয়েছি আমি।’’

‘মৃত্যুভয় পেয়ে বসেছিল, ভেবেছিলাম আমার সন্তানরা অনাথ হবে’…

একজন নারীর কাছে তাঁর জরায়ুর গুরুত্ব অনেক। মা হওয়ার চাবিকাঠি, নারীত্বের পরিচায়ক, বলেছেন অনুষ্কা। তাই অস্ত্রোপচারের আগের প্রতিটা মুহূর্ত তাঁর কাছে যতটা ছিল যন্ত্রণার, ততটাই আতঙ্কের। রবি-কন্যার কথায়, ‘‘কয়েকমাস আগে যখন প্রথম শুনি আমার জরায়ু বাদ দিতে হবে, একটা অবসাদ আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছিল। ভেঙে পড়েছিলাম। ভয়ও হয়েছিল আমার নারীত্ব হারাব, ভবিষ্যতে মা হওয়ার আর কোনও উপায় থাকবে না। আর আমার যৌন জীবন! তাতেও বাধা আসতে পারে নানা ভাবে। ’’ মৃত্যুভয়ও জর্জরিত করেছিল একই সময়ে, জানিয়েছেন অনুষ্কা। বলেছেন, ‘‘একটা সময় ভেবেছিলাম যদি অস্ত্রোপচারের সময় আমার মৃত্যু হয়, তাহলে সন্তানরা অনাথ হয়ে যাবে। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছিলাম, মহিলাদের এই সমস্যা নতুন নয়। বরং অসংখ্য মহিলাকে এই ভয়ানক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।’’

‘স্মৃতি ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল কিশোরীবেলায়, সে দিন গুলোও ছিল যন্ত্রণার, লজ্জার’…

ঋতুস্রাব প্রথম শুরু হয় বয়স যখন ১১ বছর। স্মৃতির পথে হেঁটে অনুষ্কা বললেন, প্রতি ২০-২৫ দিন অন্তর ঋতুস্রাব হত। মাত্রাতিরিক্ত রক্তপাত, সঙ্গে যন্ত্রণা থাকত লাগাতর ১০ দিন ধরে। ডাক্তাররা পরামর্শ দিয়েছিলেন পিল নেওয়ার। তাতেও সুরাহা মেলেনি। কারণ মাইগ্রেনের সমস্যাও ছিল সাঙ্ঘাতিক ভাবে।

‘‘যখন ২৬ বছর বয়স, জানতে পারি আমার জরায়ুতে বিনাইন অর্থাৎ ফাইব্রয়েড টিউমার জাতীয় কিছু একটা হয়েছে। সার্জারি করে সেই ফাইব্রয়েড বাদ দেন ডাক্তাররা। জরায়ু বেঁচে যায় সে বারের মতো। পরবর্তী কালে আমি সুস্থ দুই সন্তানের জন্ম দিয়েছি,’’ অনুষ্কা জানিয়েছেন, প্রথম সিজারের সময় তাঁকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। সেই অস্ত্রোপচার হয়েছিল জরুরি ভিত্তিতে, কারণ জরায়ু মারাত্মক ভাবে ক্ষতির মুখে ছিল। প্রথম সিজারিয়ান সার্জারির পরে রক্তাল্পতায় ভুগেছিলেন অনুষ্কা। বলেছেন, ‘‘প্রথম সন্তানের জন্ম দেওয়ার পরে খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। মনে পড়ে, ছেলেকে কোলেও নিতে পারতাম না। ছোট্ট জুবিনকে আমার শরীরের উপর রাখা হত, যাতে তাকে আমি বুকের দুধ খাওয়াতে পারি।’’ মোহানের জন্মের সময়তে শারীরিক দুর্বলতা আরও বাড়ে। ‘‘প্রতি মুহূর্তে মনে হত শরীরের ভিতরটা ক্ষয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে অসহ্য মাথার ব্যথা। ছেলেদের সঙ্গে যখন ছবি পোস্ট করেছি, কেউ কি ঘুণাক্ষরেও টের পেয়েছিল কতটা যন্ত্রণা ও কঠিন লড়াইয়ের মধ্যে দিতে যেতে হয়েছে আমাকে! আমার মতো আরও অনেক মহিলাই হয়তো এই ভাবেই যন্ত্রণার কথা চেপে রাখেন।’’

‘জরায়ু, ঋতুস্রাব নিয়ে আলোচনা এখনও কতটা সঙ্কোচের..অবাক হলাম’…

হিস্ট্রেকটমি বা এন্ডোমেট্রিওসিসের মতো সমস্যা এখন প্রায় ঘরে ঘরে। অনুষ্কার কথায়,‘‘ মহিলাদের কতটা কঠিন লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় সেটা বুঝতে পেরেছি। একই সঙ্গে আশ্চর্য হচ্ছি, এই সব নিয়ে চর্চা এতটা সঙ্কোচ বা লজ্জার কেন। নীরবে যন্ত্রণার কথা লুকিয়ে যান মহিলারা। একজন নারী তাঁর যৌন জীবন, ঋতুস্রাব নিয়ে কথা বলতে সঙ্কোচ করেন।’’ নিঃশব্দে এই লড়াই চালাচ্ছেন নারীরা, অনুষ্কার কথায়, তাঁর যন্ত্রণার কথা সামনে আনার একটাই কারণ, মহিলাদের সাহস যোগানো। লড়াই নিঃশব্দে নয়, সশব্দে সামনে আসুক।

Comments are closed.