মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৫

কয়েদিদের সেলে এয়ার কুলার, এফআইআর লেখাতে গেলে চা-সরবত, ভারতের সেরা এই থানা রয়েছে ধূ ধূ মরুভূমিতে

চৈতালী চক্রবর্তী

থানার বড়বাবুর সামনে বাতজোড় করে বসে রয়েছে কাল্লু মিঞা। পকেটমারির অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। ঘামে জবজবে ভিজে বীরবল রামকে থানায় ধরে এনেছেন কনস্টেবল। অভিযোগ টোল প্লাজায় নিয়ম ভেঙেছে সে। দু’জনেই গলা চড়িয়েছে, ছেড়ে দিন। কড়া ধাঁচের বড়বাবু হুকুম দিলেন, “এদের একটু চা-সরবত খাওয়াও। ভয় নেই অপরাধ না করলে কেউ ধরে রাখবে না। এই গরমে শরীর ঠাণ্ডা করে সব খুলে বলো।”

বাইরে তাপমাত্রার পারদ ছুঁয়েছে ৪৪ ডিগ্রি। কিন্তু থানার ভিতরে দিব্যি ঠাণ্ডা। গোটা থানাটাই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। কয়েদিদের সেলে ঢুঁ মারলে দেখা যাবে, খুনের আসামিও দিব্যি এয়ার কুলারের সামনে বসে হাওয়া খাচ্ছে। ঝকঝকে তকতকে থানার মেঝে, এক ফোটা ধুলোও পড়ে নেই কোথাও। এফআইআর লেখাতে গেলে, স্টেশন হাউস অফিসার হাসি মুখে বলেন, “অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছেন। একটু জিরিয়ে নিন। তারপর অভিযোগ লেখান। যাওয়ার আগে লাঞ্চটা সেরে যাবেন।”

অবাক লাগছে? অবিশ্বাস্য তাই না? এমন থানা কিন্তু রয়েছে ভারতেই। মরু শহর রাজস্থানে। দীর্ঘ সাত বছর ধরে এমন রীতিই চলে আসছে এই থানায়। অফিসারদের মুখ বদলেছে, কিন্তু মন বদলায়নি। অপরাধকে ঘৃণা করা হয় এখানে, অপরাধীকে নয়। তাই জন্তু-জানোয়ারের মতো নয়, মানুষের মতোই আচরণ করা হয় থানার ভিতরে। ছিঁচকে চোরকেও চেয়ারে বসিয়ে ‘নিম্বু পানি‘ খাওয়ান পুলিশ কর্তা। ভয়টা আগে দূর করা দরকার, বিচার তো তার পরে!

কালু পুলিশ স্টেশন। রাজস্থানের জয়পুর থেকে ৩০০ কিলোমিটার এবং বিকানীর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যে এই থানাই এখন ভারতের ‘থানা নম্বর ওয়ান।’ দেশের ১৫,৬৬৬ টি থানার মধ্যে থেকে ২০১৮ কালু থানাকে সেরা ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।

সাবসে বেস্ট থানা

কালু থানার এই নামেই ডাকতে ভালোবাসেন কনস্টেবল থেকে পুলিশের শীর্ষ কর্তারা। স্টেশন হাউস অফিসার দেবীলাল সাহারান বলেছেন, কেউ অভিযোগ লেখাতে এলে, আগে তাঁকে ঠাণ্ডা জল বা সরবত খাওয়ানো হয়। ধাতস্থ হলে তবে অভিযোগ লেখা শুরু হয়। তাঁর কথায়, “সকলেই তো মানুষ। বিপদে না পড়লে তো আর লোকে থানায় আসে না। তাদের করুণ মুখটা দেখে মায়া হয়। অনেক সময় নিজেরাই লাঞ্চের ব্যবস্থা করি। আমাদের থেকে সহযোগিতা, ভালো ব্যবহার পেলে মানুষজনও খুব খুশি হন দেখেছি।”

৩৩ বছরের সাহারান এই থানায় ছিলেন পাঁচ বছর ধরে। বলেছেন, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরম্পরা মেনে চলে এই থানা। অপরাধীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হবে, বাইরে থেকে যাঁরা এফআইআর করতে আসেন তাঁদের সঙ্গে কী ভাবে কথা বলতে হবে তার সবকিছুরই একটা গাইড লাইন আছে। নারী নির্যাতনের অভিযোগ লেখাতে আসা মহিলাদের জন্য রয়েছে আলাদা হেল্প ডেস্ক। সেখানে নিশ্চিন্তে তাঁরা নিজেদের অভিযোগ লেখাতে পারেন। শিশুদের জন্য রয়েছে পৃথক চাইল্ড কেয়ার ইউনিট।

পঞ্চায়েত কক্ষ থেকে সেলের সঙ্গে অ্যাটাচড টয়লেট, কী নেই এই থানায়

কালু থানার বর্তমান স্টেশন হাউস অফিসার ২৮ বছরের পরমেশ্বর সুথার। তাঁরই তত্ত্বাবধানে থানার উন্নতি হয়েছে অনেকটাই। পরমেশ্বরের প্রশংসা করেছে রাজস্থান পুলিশও। থানার পরিকাঠামো থেকে নিয়মকানুন, কড়া হাতে সামলান তিনি।

পঞ্চায়েত কক্ষ।

স্থানীয়রা বলেন থানা তো নয়, যেন কর্পোরেট অফিস। মরু শহরের প্রত্যন্ত গ্রামে এমন একটা থানা রয়েছে ভাবাই যায় না। এই থানার অধীনে রয়েছে ২৫টি গ্রাম। ধূ ধূ বালির প্রান্তরে দিনের বেলা তাপমাত্রা যখন ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে, তখন কয়েদিদের সেলে যত্ন করে এয়ার কুলার চালিয়ে দেওয়া হয়। এগিয়ে দেওয়া হয় ঠাণ্ডা জলের বোতল।

থানার ভেতরে রয়েছে সাজানো ওয়েটিং রুম, থকথকে লাল গুটখার ছাপহীন দেওয়াল, প্রতিটি সেলের সঙ্গে আলাদা বাথরুম। থানার ভিতরে কাঠের ছোট ছোট কুঁড়ে বানানো হয়েছে, সেগুলিই পঞ্চায়েত কক্ষ। দলবল নিয়ে গ্রামের মাথারা সেখানে বসে অভিযোগ জানান। তা ছাড়া খেলাধূলার ভরপুর বন্দোবস্ত থানার ভিতরেই। পুলিশ কর্তাদের জন্য ভলিবল, বাস্কেটবল কোর্ট। কয়েদিদের জন্য রয়েছে মেডিটেশনের আলাদা ঘর। হালে থানা ঘিরে বাগানের ব্যবস্থাও করছেন পুলিশ কর্তারা। তা ছাড়া, উন্নত অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা, অক্সিজেন সিলিন্ডার, চিকিৎসা ব্যবস্থা তো রয়েছেই।

কনস্টেবল সাহি রামের কথায়, “চারদিকে মরুভূমি। মাঝখানে এই থানা। প্রায় দিনই বালির ঝড় ওঠে। পথ চলতি মানুষও অনেক সময় বিশ্রামের জন্য এখানে চলে আসেন। সকলকে আপ্যায়ন করি আমরা।”

মেট্রো শহরগুলোর থানার তুলনায়, কালু থানা অনেক বেশি উন্নত, এমনটাই জানিয়েছেন রাজস্থান পুলিশের ডিজিপি ভূপেন্দ্র সিং। তাঁর কথায়, “এই থানা সেরা এই কারণে, কারণ এখানকার কর্মীদের ব্যবহার মার্জিত ও রুচি সম্পন্ন। কল পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হাজির হন পুলিশ কর্মীরা। অপরাধীদের সঙ্গেও সম্মানের সঙ্গে কথা বলা হয়। তাঁদের মধ্যে পরিবর্তন আনার চেষ্টা হয়।”

আরও পড়ুন:

আত্মহত্যা করেছিল ধর্ষিতা নাবালিকা, অভিযুক্তকে সৌদি থেকে ধরে আনলেন কেরলের মহিলা আইপিএস মেরিন

Comments are closed.