শুক্রবার, অক্টোবর ১৮

‘চন্দ্রযান-মিশন ১০০% সফল, হার্ড-ল্যান্ড বড় ফ্যাক্টর নয়,’ শিবনের মন্তব্যে জোর বিতর্ক বিজ্ঞানী মহলে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইসরো সরকারি ভাবে ঘোষণা না করলেও, চাঁদের দক্ষিণে পিঠে যে আছড়ে পড়েছে চন্দ্রযানের ল্যান্ডার ‘বিক্রম’ সেটা এখন স্পষ্ট। নিজেদের অফিসিয়াল টুইটার হ্যান্ডেলে ‘হার্ড-ল্যান্ডিং’ কথার উল্লেখ করে আকারে-ইঙ্গিতে সেটা বুঝিয়েও দিয়েছে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। তার পরেও ইসরো-চেয়ারম্যান কে শিবনের একের পর এক মন্তব্যে শুরু হয়েছে সমালোচনা। বিতর্ক উস্কে দ্বিধাবিভক্ত মহাকাশবিজ্ঞানী মহলও।

শিবনের কোন কোন কথায় শুরু হয়েছে সমালোচনা?

শনিবার একটি বিবৃতিতে শিবন বলেছেন, চন্দ্রযান ২-এর মিশন ৯৮ শতাংশ সফল। দিন পাঁচেকে মধ্যে পুরোপুরি ১০০ শতাংশ সফল হয়ে যাবে।

চাঁদের এক পক্ষকালের হিসেবে ১৪ দিনের সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে। এই সময়তেই চাঁদের আঁধার পিঠে দিন। সূর্যের আলো নিয়ে কাজ করার কথা ছিল চন্দ্রযানের রোভার প্রজ্ঞানের। সেটা হয়নি। তার পরেও কী ভাবে এমন কথা বলছেন শিবন, সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “চন্দ্রযান-মিশনের দুটো অংশ ছিল। একটা বিজ্ঞানভিত্তিক এবং অন্যটা প্রযুক্তিনির্ভর। বিজ্ঞানের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। চাঁদ ছুঁতে পেরেছে চন্দ্রযান। প্রযুক্তির দিকেও আমরা ৯৮ শতাংশ সফল। কাজেই ভারতের চন্দ্রযাত্রা পুরোপুরি সফল হয়েছে, এটা অস্বীকার করা যায় না।”

শিবনের মন্তব্যের পরই কার্যত দ্বিধাবিভক্ত বিজ্ঞানী মহল। অনেকেই বলছেন, ল্যান্ডারের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি ইসরোর কন্ট্রোল রুম। চাঁদের মাটিতে ক্র্যাশ ল্যান্ড মানে সোজা ভাষায় আছড়েই পড়েছে বিক্রম। ভেঙেচুরে গেছে তার অ্যান্টেনা, তাই রেডিও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। এর পরেও এই ১০০% সফল কথাটা আসছে কী ভাবে?

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মত অন্য কথা বলছে..

৬ সেপ্টেম্বর মধ্য রাতে অরবিটারের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি ছিন্ন হয়ে যায় ল্যান্ডার বিক্রমের। গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে সিগন্যাল পাঠিয়ে বিক্রমকে জাগানোর চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। চাঁদের মাটিতে বিক্রম ঠিক কী অবস্থায় থাকতে পারে, এই প্রসঙ্গে মতামত জানার জন্য কলকাতার ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্সের ডিরেক্টর, বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী সন্দীপ চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, তিনি দ্য ওয়ালকে বলেন, “ইসরো সরাসরি না বললেও তার টুইটের মধ্যেই অনেক রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। তিনটে শব্দ ইসরো ব্যবহার করেছে, ‘হার্ড ল্যান্ডিং,’’থার্মাল ইমেজ’এবং ‘যোগাযোগের চেষ্টা, ”সন্দীপ বাবুর কথায়, প্রথমত, হার্ড ল্যান্ড মানেই ক্র্যাশ ল্যান্ড করেছে বিক্রম। দ্বিতীয়ত, ইসরো একবারও দাবি করেনি বিক্রমকে খুঁজে পাওয়া গেছে। বরং বলা হয়েছে থার্মাল ইমেজে তার সম্ভাব্য অবস্থানের আন্দাজ পাওয়া গেছে। আর তৃতীয়ত, যোগাযোগের চেষ্টা তখনই হয়, যখন কোনও যানের নিজস্ব অ্যান্টেনা তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এখন দেখতে হবে কতটা প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যাতে লক্ষ্যের মুখে গিয়েও লক্ষ্যচ্যুত হতে হয়েছে বিক্রমকে।

সফট ল্যান্ডিং-এর আগে ঠিক কী কী হয়েছিল, রেখাচিত্র এঁকে বুঝিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী সন্দীপ চক্রবর্তী

সন্দীপবাবু বলেছিলেন, ৬ সেপ্টেম্বর রাতে অবতরণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর, ৩৫*১০১ কিলোমিটার কক্ষপথ ধরে সোজা চাঁদের মাটিতে নেমে আসার কথা ছিল ল্যান্ডার বিক্রমের। এই ৩৫ কিলোমিটার দূরত্ব পার করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোগ্রামিং ল্যান্ডারের মধ্যে করে রেখেছিলেন বিজ্ঞানীরা। সোজা নামতে নামতে শেষ ৫ কিলোমিটারে মুখ ৯০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে (Vertical) চাঁদের পিঠে নামার কথা ছিল বিক্রমের। এই পর্যায়ে গতি এমন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কথা যাতে ভার্টিকালি ঘুরে গিয়ে পালকের মতো চাঁদের মাটিতে নামতে পারে ল্যান্ডার। যাকে বলে সফট ল্যান্ডিং (Soft Landing)। এই ৯০ ডিগ্রি রোটেশন হয়নি। বরং ২.১ কিলোমিটার থেকে পুরোপুরি উল্টে গিয়ে সজোরে চাঁদের মাটিতে ধাক্কা খেয়েছে সে।

সন্দীপবাবু ছাড়া অন্য বিজ্ঞানীদের মতও অনেকটা একই রকম। অনেকেরই দাবি, ১৪ দিনের সময় শেষ হয়েছে। চাঁদের আঁধার পিঠে রাত নামছে। এর পরেও বিক্রমের জেগে ওঠার সম্ভাবনা আছে কি? তাহলে আরও পাঁচ দিন বলতে শিবন ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন?

পড়তে ভুলবেন না…

ব্যর্থ হয়নি ভারতের চন্দ্রযাত্রা, জোরালো দাবি ইসরোর

তর্ক-বিতর্ক যাই হোক, ভারতের চন্দ্রযাত্রা যে অসফল হয়নি সেটা একবাক্যেই মেনে নিচ্ছেন ইসরোর শীর্ষ কর্তারা। শিবনের সমর্থনে ইসরোর এক প্রাক্তন শীর্ষ কর্তা বলেছেন, পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের মায়া কাটিয়ে লুনার-সারফেসে পা রাখাটা বড় চ্যালেঞ্জ। সেটা নির্ভুল ভাবেই করেছিল চন্দ্রযান। পৃথিবীর পাঁচটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথও পেরিয়ে গিয়েছিল সে। চাঁদের চারপাশে চক্কর কেটেছে নিখুঁত ভাবে। অরবিটারের থেকে আলাদা হওয়া, ল্যান্ডারের চন্দ্রপৃষ্ঠের উপর পৌঁছনো, কোনও টাতেই ভুল ছিল না। তাহলে এত বিতর্কের প্রশ্নই আসছে না।

তাঁর আরও দাবি চন্দ্রযান ১ মিশন ৯৫ শতাংশ সফল হয়েছিল। সেখানে চন্দ্রযান ২-এর সফতার হার অনেক বেশি।

Comments are closed.