স্মৃতি হারিয়ে স্বামীকে বলেছিলেন, ‘জানি না তুমি কে, তবু তোমাকেই ভালবাসি’! তা নিয়েই বই

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভালবাসার মানুষ যদি আমাদের ভুলে যায়, তবে কত না কষ্ট পাই আমরা। অভিমান করি। কিন্তু যদি এমন হয়, আপনার জীবনের প্রিয়তম মানুষটি বাধ্য হয়ে আপনাকে ভুলে গেছে? স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে তার? চাইলেও কিছু মনে করতে পারছে না পুরনো কথা, চিনতেও পারছে না আপনাকে? কী করবেন আপনি?

এমনটাই হয়েছিল আমেরিকার মিশিগানের বাসিন্দা স্টিভ কুর্তোর সঙ্গে। স্ত্রী ক্যামার কুর্তোর স্মৃতি থেকে মুছে গিয়েছিল সব। মুছে গিয়েছিলেন স্টিভও। স্মৃতি ফেরানোর জন্য, নিজেদের জীবনের কাহিনি লিখলেন স্টিভ। প্রকাশ করলেন বই। ক্যামার জানলেন, অসামান্য সে প্রেমের কাহিনিই তাঁর ভুলে যাওয়া জীবন।

ঘটনার কথা জানতে পেরে ধন্য ধন্য করছেন নেটিজেনরা। বলছেন, ভালবাসার এমন দৃষ্টান্ত বিরল!

বছর সাতেক আগের কথা। দীর্ঘদিনের প্রেমিকা ক্যামার কুর্তো অন্তঃসত্ত্বা। খুশি আর ধরে না দু’জনেরই। ক্যামারের প্রতি স্টিভের যত্নের অন্ত নেই। অন্ত নেই ভালবাসারও। কিন্তু সব হিসেব ওলোটপালোট হয়ে গেল হঠাৎ এক দিন।

ক্যামারের যখন অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ৩৩ সপ্তাহ চলছে, হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। দিশাহারা স্টিভ প্রেমিকাকে নিয়ে ছোটেন হাসপাতাল। চিকিৎসকরা জানান, এখুনি প্রসব করাতে হবে ক্যামারের। কিন্তু মা, সন্তান দু’জনেরই জীবন বিপন্ন। সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে স্ট্রোক হয় ক্যামারের। সেই স্ট্রোকের ধাক্কা সামলাতে, বিশেষ পদ্ধতিতে ওষুধ দিয়ে কোমায় পাঠানো হয় তাঁকে। এই অবস্থায় সিজার করে সুস্থ সন্তান প্রসব করান চিকিৎসকরা।

কিন্তু সমস্যা হয় এর পরে। নির্দিষ্ট সময় পার করে যখন কোমা থেকে ফেরত আসেন ক্যামার, তখন তাঁর মাথা থেকে হারিয়ে গিয়েছে পুরনো সব স্মৃতি। তিনি কে, স্টিভ তাঁর কে হন, কেন তিনি হাসপাতালে– সব কিছুই অন্ধকার। এমনকি নিজের সন্তানকেও প্রথমে নিতে চাননি ক্যামার। বিশ্বাসই করেননি, তিনি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। করবেন কী করে, তাঁর তো কিছু মনেই নেই আগের কথা!

সন্তানের জন্মের পরে  হাসপাতালেই ছিলেন স্টিভ। সময়ে সময়ে খাওয়াতেন সদ্যোজাত সন্তানকে। একইসঙ্গে খেয়াল রাখতেন ক্যামারেরও। কয়েক দিন এভাবেই কাটে। কিন্তু সন্তানের প্রতি কোনও আগ্রহ জন্মায় না ক্যামারের। একসময়ে হাসপাতাল থেকে ছুটি হয়ে যায় তাঁদের।

বাড়ি এসেও অথৈ জলে পড়েন স্টিভ। বহু চেষ্টা করেন ক্যামারের স্মৃতি ফেরানোর। ছোট-বড় নানা ঘটনার কথা বলতে থাকেন। মজার মজার কথা বলেন। গত কয়েক বছরের দুঃখের অনুভূতিগুলোও ভাগ করে নেন। কিন্তু বৃথা চেষ্টা। কিছুই মনে করতে পারেন না ক্যামার। চিকিৎসকরাও বলেন, সময়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া অন্য উপায় নেই। এটা বিরল একটা সঙ্কট। চিকিৎসা পরিভাষায় এর নাম প্রিকল্যাম্পশিয়া। সংখ্যায় খুব কম হলেও, প্রেগন্যান্সিতে স্ট্রোকের কারণে স্মৃতি লোপ পায় কারও কারও।

হাল ছাড়েননি স্টিভ। প্রতি মুহূর্ত সঙ্গ দিয়েছেন ক্যামারকে। একইসঙ্গে বড় করেছেন তাঁদের সন্তান গেভিনকে। ক্যামারও গেভিনকে খুব ভালবাসতেন, কিন্তু মাতৃত্বের কোনও আলাদা বোধ বা অনুভূতি ছিল না তাঁর। ছিল না স্টিভের প্রতি কোনও আবেগও। তবে এটা হয়তো ক্যামার বুঝতে পারছিলেন, স্টিভ তাঁকে কতটা ভালবাসেন।

স্টিভ জানান, “এরকম ভাবেই কেটে যায় দু’বছর। আমি হাল ছাড়িনি। আমার বিশ্বাস ছিল, একদিন না একদিন ওর সব মনে পড়বেই। তার আগে পর্যন্ত আমার আর কিছুই করার ছিল না ওকে ভালবাসা ছাড়া। পরিচয়হীন একটা মানুষ হিসেবে ভালবেসে যাচ্ছিলাম ক্যামারকে। এক দিন আমরা সোফায় বসে আছি, ও হঠাৎ আমায় বলল, ‘আমি জানি না তুমি কে, কিন্তু আমি তোমায় ভালবাসি।’ এই বাক্যটাই আমায় স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। আমি এই বাক্যটাকেই আঁকড়ে ধরেছিলাম নতুন করে। আর এই বাক্য থেকেই জন্ম নেয় বই লেখার পরিকল্পনা। ঠিক করি, আমাদের ভালবাসার কথা লিখে ফেলব বই আকারে। সেটা পড়ে যদি ওর কিছু মনে পড়ে!”

লিখতে শুরু করেন স্টিভ। জড়ো করেন এত বছর ধরে দু’জনের জমা করা মুহূর্তদের। তাঁদের দেখা হওয়ার প্রথম দিন, প্রথম প্রেমে পড়া, ডেটিং, চুমু খাওয়া, ঝগড়া, ভালবাসা, ক্যামারের অন্তঃসত্ত্বা হওয়া– সবটুকু পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে গল্পের আকারে কাগজে-কলমে বন্দি করেন স্টিভ। ছাপান সেই বই।

বইয়ের নাম, ‘বাট আই নো আই লাভ ইউ’। এই কথাটাই ক্যামার বলেছিলেন স্টিভকে। এই কথাটাই নাড়িয়ে দিয়েছিল স্টিভের ভালবাসা। বইয়ের লেখক হিসেবে লেখা থাকে দু’জনের নাম। স্টিভ এবং ক্যামার কুর্তো। তাঁদের চতুর্থ বিবাহবার্ষিকীতে সেই বই ক্যামারকে উপহার দেন স্টিভ।

তিনি বলেন, “এ বই আমি লিখলেও, বইয়ের প্রতিটা মুহূর্ত আমাদের দু’জনের রচনা করা। ওকে ছাড়া এই বইয়ের একটা পাতাও সত্যি নয়। তাই এ বইয়ের লেখক আমরা দু’জনেই। দেখা যাক, নিজের কথা নিজে পড়ার পরে ক্যামারের কিছু মনে পড়ে কি না!”

এখন ৩৮ বছর বয়স ক্যামারের। স্বামী স্টিভ ও সন্তান গেভিনের সঙ্গে সুখী দাম্পত্য জীবন কাটাচ্ছেন, তাঁদের পরিচয় না জেনেই। অর্থাৎ না মনে করতে পেরেই। স্টিভ বলছেন, “আমি যে শুধু আমাদের এই প্রেমের গল্পটা দুনিয়াকে জানাতে চাই তাই নয়, আমি চাই এই বইটা পড়ে সব মনে পড়ুক ক্যামারের।”

প্রকাশিত হওয়ার পরেই হটকেকের মতো বিকোচ্ছে সেই বই। বইটির নামে একটি পেজও খোলা হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সে পেজে দেখা গেছে, স্টিভ-ক্যামারের সন্তান গেভিন হাসিমুখে নিজের নাম লিখেছে বইয়ের প্রথম কপিতে। এই বইয়ের অধিকার যে তারই সবচেয়ে বেশি!

বই পড়ে ক্যামারের স্মৃতি ফিরবে কিনা, সেটা সময় বলবে। কিন্তু আপাতত নেটিজেনরা বলছেন, এমন ভালবাসার কাছে সব বাধাই হেরে যায়। আর যদি না-ও ফেরে, তা হলেও, স্টিভ যে একজন অপরিচিত মানুষ হিসেবেও স্মৃতিভ্রষ্ট প্রেমিকার এতটা ভালবাসা, বিশ্বাস, ভরসা অর্জন করতে পেরেছেন, সেটাই অনেক বড় একটা প্রাপ্তি।

আরও পড়ুন…

মৃত বাবার নম্বরে রোজ মেসেজ করতেন মেয়ে, চার বছর পরে এল রিপ্লাই! চোখের জলে ভাসছে নেট-দুনিয়া

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More