মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১
TheWall
TheWall

উল্কায় ‘সুগার’! আছড়ে পড়েছে পৃথিবীতেই, প্রাণ খুঁজতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন বিজ্ঞানীরা

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

দ্য ওয়াল ব্যুরো: উল্কাপিণ্ডে চিনি? না ঠিক চিনি নয় যা আমরা খাই। তবে ‘সুগার’ গোত্রের যৌগের সন্ধান মিলল পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়া তিনটি উল্কাপিণ্ডে। লক্ষ কোটি বছর আগে পৃথিবীর সঙ্গে এদের সংঘাত হয়েছিল। জ্বলন্ত আগুনের শিখার মতো বায়ুমণ্ডল কাঁপিয়ে আছড়ে পড়েছিল পৃথিবীর মাটিতে। এখন সে তেজ নিভে গেছে। তবে প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে সেই উল্কাপিণ্ডগুলো পৃথিবীর তাবড় মহাকাশবিজ্ঞানীদের নাড়িয়ে দিয়েছে।

উল্কাপিণ্ডে রয়েছে ‘বায়ো-এসেন্সিয়াল’ সুগার, এমন খবর প্রথম সামনে আনে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। বিজ্ঞানীরা বলেন, শুধু সুগার নয়, প্রাণ তৈরি করতে পারে এমন অনেক ‘বায়োলজিক্যাল কম্পাউন্ড’ রয়েছে এই উল্কাপিণ্ডগুলোর মধ্যে। নাসার এই খোঁজ প্রকাশিত হয় ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’ নামে বিজ্ঞান পত্রিকায়।

উল্কা মূলত গ্রহাণু বা অ্যাস্টরয়েড অথবা ধূমকেতুর অংশ। মহাজাগতিক বস্তুর সংঘর্ষের ফলে ছিটকে যাওয়া পাথর বা ধাতব খণ্ড থেকেও উল্কার জন্ম হয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কোনওভাবে এই মহাজাগতিক বস্তুরা ঢুকে পড়লে বায়ুর সঙ্গে সংঘাতে আগুন জ্বলে ওঠে। প্রবল বেগে আছড়ে পড়ে পৃথিবীর মাটিতে। লক্ষ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে আছড়ে পড়া এমনই তিনটি উল্কাপিণ্ড নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। তার মধ্যে একটি আছড়ে পড়েছিল অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৬৯ সালে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন এই উল্কাপিণ্ডগুলোর রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এদের মধ্যে রাইবোজ (Ribose) গোত্রের বায়ো-এসেন্সিয়াল সুগার রয়েছে। তা ছাড়া রয়েছে আরাবিনোজ (arabinose)জাইলোজ (xylose) সুগার গোত্রের দু’টি যৌগ।

তিনটি উল্কাপিণ্ডেই রয়েছে কার্বন যা প্রাণ তৈরির উৎস। NWA 801 (টাইপ সিআর২) এবং মুর্চিসন (Murchison)টাইপ সিএম২) এই দু’রকম কার্বনের হদিস পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

পৃথিবী ছাড়াও ব্রহ্মাণ্ডের অন্যত্র যে প্রাণ রয়েছে এমন সম্ভাবনার কথা আগেই জানিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি এই তিনটি উল্কাপিণ্ডে যে সুগার গোত্রের যৌগের হদিশ মিলেছে তার থেকেও এই সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে রাইবোজ যা রাইবো-নিউক্লিক অ্যাসিড বা RNA তৈরির জন্য সিঁড়ির প্রথম ধাপ। আমরা যে চিনি খাই সেটা হল সুক্রোজ। যার একটি অণুতে থাকে ১২টি কার্বন, ২২টি হাইড্রোজেন ও ১১টি অক্সিজেন পরমাণু। এর মানে খাবার চিনি বানানোর একেবারে প্রথম ধাপটাই হল গ্লাইকোঅ্যালডিহাইড। এটাকে বলা হয়, ‘Simplest Sugar’। এই গ্লাইকোঅ্যালডিহাইডই ধাপে ধাপে বিক্রিয়া করে জন্ম দেয় রাইবোজের। যার একটি অণুতে থাকে ৫ কার্বন, ১০টি হাইড্রোজেন আর ৫টি অক্সিজেন পরমাণু। এটাকে পেন্টোজ বা ‘Simple Sugar’ বলা হয়। এই রাইবোজই হল RNA গড়ে ওঠার অন্যতম মূল উপাদান। এই DNA আর RNA অণু দিয়েই একটা কোষ গড়ে ওঠে।

জাপানের তোহোকু ইউনিভার্সিটির গবেষক ইয়োশিহিরো ফুরুকাওয়া বলেছেন, এই উল্কাপিণ্ডগুলোর মধ্যে মিলেছে অ্যামাইনো অ্যাসিড (amino acids) যা প্রোটিন তৈরির অন্যতম উপাদান এবং নিউক্সিওবেসেস (nucleobases ) যা ডিএনএ ও আরএনএ-র উপাদান। কাজেই মহাজাগতিক এই বস্তুগুলোর মধ্যে প্রাণ তৈরির সম্ভাবনা যে নিছক গল্পকথা নয় সেটা আরও একবার প্রমাণিত হচ্ছে।

মেরিল্যান্ডে নাসার ‘গড্ডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার’-এর গবেষক জেসন ডোরকিনের কথায়, ‘‘লক্ষ কোটি বছরের পুরনো উল্কাপিণ্ডে রাইবোজের খোঁজ পাওয়াটা মহাকাশবিজ্ঞানের ইতিহাসের বড় মাইলফলক। এখনও অবধি যে যে উল্কাপিণ্ডের খোঁজ মিলেছে সেগুলিও বিশ্লেষণ করে দেখতে আমাদের গবেষকদের সুবিধা হবে। ’’

২০১৩ সালে গ্লাইকোঅ্যালডিহাইডের হদিশ মিলেছিল সূর্যেরই মতো আর একটি নক্ষত্রে। যা আদতে দু’টি নক্ষত্রের বাইনারি সিস্টেম। যাদের নাম- ‘IRAS-16293-2422’। চিলির আটাকামা লার্জ মিলিমিটার অ্যারে (ALMA) টেলিস্কোপের মাধ্যমে মহাকাশে ওই জৈব অণুর অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছিল।

ছবি সৌজন্যে: নাসা

Share.

Comments are closed.