তিন দশক ধরে হিমালয়ে হেঁটে দশ হাজার মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়েছেন তিনি! কুর্নিশ করেছে সারা দুনিয়া

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

দশ জন নয়, একশো জন নয়, দশ হাজার মানুষের জীবন বদলে দিয়েছেন তিনি! যাঁদের কাছে গোটা পৃথিবীটাই অন্ধকারে ডুবে ছিল, তাঁদের জীবনে আলো নিয়ে এসেছেন এই চিকিৎসক। তিনি নেপালের সান্দুক রুইত। বার্ধক্যের কারণে যাঁদের চোখে ছানি পড়ে যায়, বা অন্য কোনও কারণে যাঁরা চোখে ঝাপসা দেখেন— তাদের চোখে ছোট একটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কৃত্রিম লেন্স লাগিয়ে দেন সান্দুক।

চোখের আলোয় দেখেছিলেম…

এ দেশে চোখের ছানি অপারেশন খুব সহজ এবং ঘনঘন হলেও, নেপালে তা অত সুলভ নয়। বহু প্রত্যন্ত এলাকায় ন্যূনতম চিকিৎসা পরিষেবাই পৌঁছয় না, ছানির অস্ত্রোপচার দূরের কথা। সেই দেশেই মানুষের চোখের আলো ফেরানোর চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন সান্দুক। ৩০ বছর ধরে ঘুরছেন দেশের আনাচকানাচে। করছেন ছানি চিকিৎসা।

এ দেশেও সম্মানিত

সান্দুক জানালেন, এক জন মানুষের জীবন পরিবর্তন করে দিতে তার সময় লাগে মাত্র পাঁচ মিনিট। চোখের দৃষ্টি পুরোপুরি ফেরত পাওয়াটা তো জীবন বদলে যাওয়ারই সমান! নতুন রঙে-রূপে ধরা দেয় গোটা পৃথিবী। এ পর্যন্ত প্রায় দশ হাজার মানুষের চোখে দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি। সারা পৃথিবীর সামনে উপস্থাপন করেছেন নয়া দৃষ্টান্ত। এমনকি সম্প্রতি ভারত সরকারের তরফেও পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি।

সহজ অসুখের কঠিন নিরাময়

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে চোখের সমস্যা একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সমস্যা চিকিৎসা করালেই সেরে যায়। কিন্তু সচেতনতা ও টাকার অভাবের কারণে বহু মানুষ চোখে অসুখ নিয়েই দিনের পর দিন পার করে দেয়। অথচ চিকিৎসক সান্দুক রুইত বলছেন, সাধারণ মানুষের চোখে যে অসুখ হয় তা সহজেই নিরাময়যোগ্য। অপুষ্টি এবং অবহেলার কারণেই এই অসুখ ক্রমশ দানা বাঁধে। তখনই যদি চিকিৎসা করা যায়, তাহলে দীর্ঘদিন চোখ সুস্থ থাকে।

চোখের চিকিৎসা বিলাসিতা

তথ্য বলছে, নেপালের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীই এখনও দারিদ্রসীমার নীচে অবস্থান করছে। সে দেশের একমাত্র অর্থকরী শিল্প পর্যটন। ফলে তার উপরেই নির্ভর করতে হয় অধিকাংশ নেপালিকে। কিন্তু এ নির্ভরতা মরসুম কেন্দ্রিক। কোনও মরসুমে যদি পর্যটক কম আসে, তাহলে সারা বছরের জন্য অন্ন সংস্থান করাই মুশকিল হয়ে যায়।  সেখানে চোখের নিয়মিত চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার যেন একরকম বিলাসিতাই। সেই মানুষগুলির কাছেই ঈশ্বরের মতো পৌঁছে যান চিকিৎসক সান্দুক।

বিশ্বজুড়ে আলো বিলোচ্ছেন

শুধু নেপালে নয়, তার বাইরেও এশিয়া এবং আফ্রিকার বহু প্রত্যন্ত এই চিকিৎসা পরিষেবা দিয়ে থাকেন সান্দুক রুইত। এমনকি তিনি উত্তর কোরিয়াতেও গিয়েছিলেন চোখের ছানি অস্ত্রোপচারের জন্য। প্রথাগত পদ্ধতিতে যে অস্ত্রোপচার করতে অন্যান্য সার্জনদের বেশ বেগ পেতে হয়, সেই অপারেশনই অনেক সহজ ভাবে এবং দ্রুত করে ফেলেন রুইত।

দেখুন ভিডিও।

দুই মানুষের একই লক্ষ্য

১৯৮৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার ফ্রেড হলোস নামের একজন চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন সান্দুক। পরে তাঁরা দু’জনে মিলে নেপালের কাঠমাণ্ডুর কাছে তিলগাঙা নামে একটি চোখের হাসপাতাল খোলেন। উদ্দেশ্য ছিল গরিব, পাহাড়ি মানুষদের অল্পখরচে চোখের চিকিৎসা করা। এই হাসপাতাল থেকেই কৃত্রিম লেন্স তৈরি করতে শুরু করেন তাঁরা। মায়োপিয়া রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য বেশ কার্যকরী হয়ে ওঠে এই লেন্স।

পাহাড়ি পথে ঘুরে

এই হাসপাতালে কাজ করতে করতেই সান্দুক জানতে পারেন, বহু রোগী দূরত্বের কারণে এবং অভাবের কারণে হাসপাতালে আসতে পারেন না। তখনই তিনি ছোট একটি দল বানিয়ে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ঘুরে ঘুরে ছানি অস্ত্রোপচারের কাজ করতে শুরু করেন। নতুন নতুন অভিজ্ঞতাও আহরণ করতে শুরু করেন। তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘বেয়ারফুট সার্জেন’ অর্থাৎ খালিপায়ের চিকিৎসক হিসেবে।

আনন্দ, তৃপ্তি, মাইলফলক

চিকিৎসক সান্দুক একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন এক নেপালি বৃদ্ধের কথা। সেই মানুষটি জন্মান্ধ। জীবনের ৮০টি বছর চোখে দেখতে পাননি তিনি। অথচ তেমন কোনও জটিল সমস্যা ছিল না তাঁর চোখে। কেবল সচেতনতা ও উদ্যোগের অভাবে চিকিৎসা হয়নি তাঁর এত বছর। চিকিৎসক সান্দুক রুইত তাঁর চোখ ঠিক করে দেওয়ার পরে তিনি প্রথম তাঁর সন্তানকে দেখতে পান। সেই যে আনন্দ, সেই যে তৃপ্তি, তা যেন নাড়িয়ে দেয় তাঁকে। এই অভিজ্ঞতা রুইতের জীবনের এক মাইলফলক হয়ে ওঠে।

রোশনের চোখে আলোর রোশনাই

শুধু তাই নয়। গত বছরেই ছোট্ট এক বাচ্চার চোখের চিকিৎসা করে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেওয়ার পরে অনির্বচনীয় আনন্দ ও আদরের সাক্ষী হয়েছিলেন চিকিৎসক সান্দুক রুইত। তিন বছর বয়স হওয়ার আগেই চোখের জ্যোতি হারিয়েছিল নেপালি শিশু রোশন। যার নামেই রয়েছে রোশনাই, তার চোখে নেমে এসেছিল ঝাপসা অন্ধকার। তাকেই দৃষ্টি ফিরিয়ে দেন সান্দুক। তার পরেই তার দেখা হয় ডাক্তারবাবুর সঙ্গে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে অনাবিল আদরে ভরিয়ে দেয় ছোট্ট ছেলেটি। তাঁর মুখে হাত বুলিয়ে কৃতজ্ঞতা জানায় নিজের সারল্য দিয়ে। চশমা খুলে রোশনকে জড়িয়ে ধরেন সান্দুক।

দেখুন সেই ভিডিও।

হিমালয়ের মহামানব

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে পাহাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এই অনন্য পরিষেবা দিয়ে চলা মানুষটি হিমালয়ের মহামানব বলেই পরিচিত সাধারণ মানুষের কাছে। ঈশ্বরের মতো শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন তিনি। বহু বহু মানুষকে ফিরিয়ে দিয়েছেন মহামূল্যবান ইন্দ্রিয়ের কার্যক্ষমতা। তাঁদের চোখের আলোয় উজ্জ্বলতর হয়ে উঠেছেন সান্দুক রুইত।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More