শনিবার, নভেম্বর ১৬

সাতদিনের ছুটি নিয়ে ঘুরে আসুন ‘ওরাং ন্যাশনাল পার্ক’

অরিত্র মন্ডল

আসামের আরণ্যক পরিবেশ সবসময়ই বাংলার অরণ্যপ্রেমী ভ্রমণপিপাসুদের হটফেভারিট । সাধারণ ট্যুরিস্টও আসামে গেলে কামাখ্যার সঙ্গে শিলং আর কাজিরাঙ্গাটা ট্যুর প্ল্যানে জুড়ে রাখেন। হার্ডকোর অরণ্যপ্রেমীরা একহাত লম্বা টেলিলেন্স নিয়ে  চলে যান মানস ন্যাশনাল পার্কে।  অতিকায় হস্তীকুল থেকে একশৃঙ্গ গন্ডার, কিংবা ডানা মেলা রঙবেরঙের পাখির দল থেকে আদিম বৃক্ষরাজির গা বেয়ে ওঠা হাজার প্রজাতির অর্কিড। ধুতরার নেশায় পেয়ে বসে যেন। বার বার ছুটে আসেন ট্যুরিস্টরা সম্মোহিত হয়ে। আজ বলব আরণ্যক আসামের অল্পচেনা  ওরাং ন্যাশনাল পার্কের কথা। চলুননা  ছুটিতে। মাইন্ডব্লোয়িং  শব্দটা মাথার ভেতর বনবনিয়ে ঘুরবে নিশ্চিত থাকুন।
ওরাং ন্যাশনাল পার্ক আসামের শোণিতপুর ও দারাং জেলার মাঝে অবস্থিত।প্রায় ঊনআশি বর্গকিমি এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে  এই  ন্যাশনাল পার্কটি। পার্কটি ১৯৮৫ সালে স্যাংচুয়ারীতে ,পরে ১৯৯৯ সালে ন্যাশনাল পার্কের মর্যাদা লাভ করে। ইন্দো-বার্মা বায়োডাইভার্সিটি হটস্পটের অন্তর্গত ওরাং ন্যাশনাল পার্কের উত্তর দিক ধরে প্রবাহিত হয়ে চলেছে ঐতিহাসিক ব্রহ্মপুত্র নদ। সীমানা বরাবর পার্কটিকে গভীর আশ্লেষে আলিঙ্গন করে আছে আরো দুটি মিষ্টি মিষ্টি কাব্যিক নদী ধানসিরি  আর বেলসিরি। আদরের শেষে তারা দুজনেই ঝাঁপ দিয়েছে ব্রহ্মপুত্রের বুকে। ওরাং ন্যাশনাল পার্কের  নৈসর্গিক দৃশ্যপটের সঙ্গে কাজিরাঙ্গা ন্যাশনাল পার্কের প্রচুর মিল থাকায় ট্যুরিস্টরা ওরাং কে আদর করে ‘মিনি কাজিরাঙ্গা’ বলেন।
ওরাং ন্যাশনাল পার্কের ভেতরে প্রচুর কৃত্রিম  জলাশয় ও খাল আছে। শোনা যায় এখানে আগে একটি উপজাতির বসবাস ছিলো। কোনো একটি মারণ রোগে সম্পূণর্ভাবে নিশ্চিন্হ হওয়ার আগে তারা তাদের সুবিধার্থে এই জলাশয় গুলি খনন করেছিল। সাবট্রপিকাল মনসুন  ক্লাইমেট ওরাং ন্যাশনাল পার্ককে সবুজে সবুজে সাজিয়ে তুলেছে। অক্টোবর থেকে মার্চ শীত ৫-১৫ ডিগ্রির মধ্যে ঘোরাফেরা করে সকাল সন্ধ্যেয়।
.পশুপাখি ও অরণ্যানী
ওরাং ন্যাশনাল পার্কে অসংখ্য প্রজাতির স্তন্যপায়ী ও অনান্য প্রাণীদের নিরাপদ  বাসভূমি। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো বিলুপ্তির খাদের কিনারায় থাকা পিগমি শুকর এবং গ্রেট ইন্ডিয়ান রাইনো। এছাড়াও আপনি দেখবেন রয়াল বেঙ্গল টাইগার, এশিয়াটিক এলিফ্যান্ট,ক্লাউডেড  লেপার্ড, স্মল ইন্ডিয়ান সিভেট ক্যাট, রেসাস ম্যাকাকে বানর, সজারু,ভাল্লুক ছাড়াও অনেক বন্যপ্রাণী যেমন ইন্ডিয়ান প্যাঙ্গোলিন, হগ ডিয়ার,ইন্ডিয়ান ফক্স।
বেশকিছু বিখ্যাত সরীসৃপশ্রেণীরও বসবাস এই পার্কে। যেমন ইন্ডিয়ান রক পাইথন, কোবরা, মনিটর লিজার্ড, ব্ল্যাক ক্রেইট, সাতটি প্রজাতির কচ্ছপও ওরাং ন্যাশনাল পার্কের অন্যতম আকর্ষণ।
এছাড়াও ওরাং ন্যাশনাল পার্কের জলাশয়ে প্রায় পঞ্চাশ প্রজাতির মাছের দেখা মিলবে। রঙবেরঙের ও নানা আকৃতির। বরাত ভালো থাকলে দেখতে পাবেন ভোঁদড়ের দল। পাশেই  ব্রহ্মপুত্রে দেখা মিলবে প্রায় দুর্লভ রিভার ডলফিনের।

আরও পড়ুন : এভারেস্ট না হোক, এভারেস্ট বেসক্যাম্প তো থাকতেই পারে উইশলিস্টে!

ওরাং ন্যাশনাল পার্কে বিশাল সংখ্যক পক্ষীশ্রেণীর আবাসস্থল।প্রতিবছর  প্রচুর সংখ্যায় পরিযায়ী পাখির দল উড়ে আসে ওরাং-এ তাদের খাদ্য ও প্রজননের ভরপুর পরিবেশ থাকায়।একমাত্র এখানে এখনো আপনি দেখতে পাবেন প্রায় বিলুপ্ত বেঙ্গল ফ্লোরিক্যান। এখানের জলাশয়ে  নির্ভয়ে  ভেসে বেড়ায় রুডি শেলডাক, স্পট বিলড পেলিক্যান, ব্ল্যাক নেক স্টর্ক, গ্রেট হোয়াইট পেলিক্যান, ব্রাহ্মণী ডাক। আকাশ দাপিয়ে বেড়ায় মালার্ড, পিনটেল, হর্ণবিল, পালাস-ফিশ ঈগল। শুকনো পাতায় আপনার পদধ্বনি শুনে ডানা মেলবে শয়ে শয়ে সবুজ পায়রা।প্রায় দুশোরও  বেশী প্রজাতির পাখির কনসার্ট  আপনাকে নিমেষের জন্যও ক্লান্ত হতে দেবেনা। ওরাং ন্যাশনাল পার্কের বিস্তীর্ণ জলাভূমি, তৃণভূমি ও অরণ্যে আছে হাজার হাজার প্রজাতির জলজ ও স্থলজ উদ্ভিদ।যাদের পরিচয় এই স্বল্প পরিসরে দেওয়া সম্ভব নয়।
 
কীভাবে যাবেন এবং কখন যাবেন
ওরাং ন্যাশনাল পার্কের সেরা রূপবৈচিত্র   দেখতে গেলে আপনাকে যেতে হবে নভেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যে।তেজ্পুর ও গুয়াহাটি থেকে   ওরাং-এর দূরত্ব বেশি নয়। গুয়াহাটি থেকে ১৪০ কিমি এবং তেজপুর থেকে মাত্র ৩২ কিমি। NH-52 দুই শহরকে সরাসরি জুড়েছে  ওরাং ন্যাশনাল পার্কের সঙ্গে।আছে প্রচুর বাস,ট্যুরিস্ট ক্যাব সার্ভিসও।নিকটবর্তী রেলস্টেশন রাঙ্গাপাড়া(৪০ কিমি), গুয়াহাটি ও তেজপুর থেকে ট্রেনে আসতে পারেন। নিকটবর্তী এয়ারপোর্ট সালোনিবাড়ি (১০ কিমি,তেজপুর)।
থাকবেন কোথায়
 ওরাং ন্যাশনাল পার্কের কাছেই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের ট্যুরিস্ট লজ আছে। ডরমিটরি প্রথায় থাকা।লজটি ছোট্ট অথচ কিউট।কিন্তু  আগে থেকে বুক করে আসবেন। নয়তো তেজপুরে থাকুন, বিভিন্ন ট্যারিফের অঢেল হোটেল পাবেন। ওরাং-এ আপনার বাড়তি পাওনা এলিফ্যান্ট রাইড। ঘন অরণ্যে বা জলাভূমিতে হাতির পিঠে চেপে গৌরীপুরের মহারাজার স্টাইলে এক শৃঙ্গ গন্ডার বা রয়াল বেঙ্গল টাইগার দেখার আনন্দ কতটা তা  ইতিহাসের রাজা মহারাজারা জানেন, আর জানবেন আপনি , যদি হাতির পিঠে চেপে দশফুট দূর থেকে বাঘ কিম্বা গন্ডার দেখার সাহস থাকে।

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন 

Comments are closed.