রবিবার, এপ্রিল ২১

অনুব্রত, দিলীপদের সতর্ক থাকতে হবে, সুপ্রিম কোর্টের বার্তা ‘কু-কথা’-র কুশীলবদের

দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশের দুই হেভিওয়েট নেতা সাজা পেয়েছেন। সাজা অল্প হলেও গুরুত্বপূর্ণ। বহুজন সমাজবাদী পার্টির প্রধান মায়াবতী ও উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের উপরে মুখ খোলায় সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। এবার সেই নিষেধাজ্ঞায় সুপ্রিম কোর্টের সার্টিফিকেট পেল কমিশন। জাতীয় রাজনীতির দুই চেনা মুখের বিরুদ্ধে কমিশনের এই পদক্ষেপকে সমর্থন করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ বলেন, “মনে হচ্ছে এতদিনে জেগে উঠেছে নির্বাচন কমিশন। তারা বিভিন্ন রাজনীতিকের ভাষণ বন্ধ করে দিয়েছে।”

উত্তরপ্রদেশের বর্তমান ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা এমন বক্তব্য রেখেছেন যাতে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হতে পারে। দু’টি মাত্র ক্ষেত্রে কমিশন পদক্ষেপ করলেও আদতে এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি। দেশের সর্বত্র নির্বাচনী প্রচারে চলছে ‘কু-কথা’-র ফুলঝুরি। ধর্মীয় উস্কানি থেকে বিরোধী দলের কর্মীদের উপরে আক্রমণের প্ররোচনা কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ লেগেই রয়েছে রাজনীতির বড়-মেজ-ছোট নেতাদের মুখে মুখে। আর তা থেকে উত্তেজনা ছড়ানোর অভিযোগ বা নজিরও কম নেই। কিন্তু নেতাদের থামাবে কে?

রাজনৈতিক আক্রমণে সারা বছরই চলে ‘কু-কথা’ সংস্কৃতি। আটকানোর কেউ নেই। কিন্তু কমিশনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ও সুপ্রিম কোর্টের সমর্থন অন্তত নির্বাচনের সময়টার জন্য সত্যিই বার্তা দিল ‘কু-কথা’-র কুশিলবদের।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যাক্তিগত আক্রমণের নজির পুরনো। কিন্তু ইদানীং তা যেন আরও মারাত্মক আকার নিচ্ছে। ডান-বাম-গেরুয়া কোনও শিবিরই কম যায় না। আনিসুর রহমান থেকে অনুব্রত মণ্ডল কিংবা দিলীপ ঘোষ বারবার অভিযুক্ত হয়েছেন নানা অশালীন আক্রমণের জন্য।

সাম্প্রতিক কয়েকটি নজির তুলে ধরলেই বোঝা যাবে এই রাজ্য ‘কু-কথা’-য় কম যায় না। কৃষ্ণনগরের প্রাক্তন সাংসদের বক্তব্য তো জাতীয় রাজনীতিতে ঝড় তুলে দিয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিনেতা সাংসদ তাপস পাল বলেছিলেন, ‘‘একটা কোনও সিপিএম যদি আমার মা, বোন, চাচা-চাচী, কারও গায়ে হাত দেয়, এই তাপস পাল ছেড়ে কথা বলবে না। তাপস নিজের রিভলবার বের করে গুলি করে দিয়ে চলে যাবে। জেনে রাখবেন আমি চন্দননগরের মাল…..একটা যদি কোনও বিরোধী আজকে তৃণমূলের কোনও মেয়ে, কোনও বাপ, কোনও বাচ্চার গায়ে হাত দেয়, আমার ছেলেদের ঢুকিয়ে দেব। রেপ করে চলে যাবে।’’

তৃণমূল কংগ্রেসের আর এক নেতা বীরভূমের জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলের বিরুদ্ধে তো এমন অভিযোগ যে, তাঁর প্রায় সব বক্তৃতাতেই উঠে আসে নানা ‘হেট স্পিচ’। ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই
পঞ্চায়েত ভোটের মুখে পাড়ুইয়ের কসবায় সভা করে দলীয় কর্মীদের নির্দল প্রার্থীদের (মূলত বিক্ষুব্ধ তৃণমূল কর্মী) বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া এবং বোমা মারার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে অনুব্রতর বিরুদ্ধে। আর ২১ জুলাই রাতে পঞ্চায়েত ভোটের ঠিক আগে পাড়ুই থানার বাঁধনবগ্রামে দুষ্কৃতীদের গুলিতে খুন হন বিক্ষুব্ধ তৃণমূল কর্মী হৃদয় ঘোষের বাবা সাগরচন্দ্র ঘোষ। সেখানেও ওঠে অনুব্রতর নাম।

এছাড়াও বিরোধীদের উদ্দেশে কখনও গুড়-বাতাসা, কখনও নকুলদানা, কখনও পাচন দেওয়ার বার্তা দিয়েছেন এবং দিয়ে চলেছেন তিনি। গত বিধানসভা নির্বাচনের আগেই তিনি বলেছিলেন, ‘‘গুড়ের-বাতাসার রং হল একটু কালচে লাল। কালচে লাল কীসের রং জানেন?’’

বিজেপি শিবিরে আবার এই ব্যাপারে সব থেকে এগিয়ে খোদ রাজ্য সভাপতি। তাঁকেও অবশ্য বারবার সহ্য করতে হয় নানা কু-বিশেষণ। কলকাতার বর্তমান মেয়র ফিরহাদ হাকিম দিলীপ ঘোষকে ‘ছাগলের তৃতীয় সন্তান’বলেও সম্বোধন করেছিলেন। আর দিলীপ ঘোষ তো শিরোনামে চলে আসেন হুগলির চণ্ডীতলা থেকে দেওয়া হুঙ্কারে। গত ১৮ নভেম্বর তিনি বলেন, ‘‘মেরে ছ’মাস হাসপাতালে পাঠাব কেন, এখানেই দফারফা হয়ে যাক। আমরাও চাইলে পালটা মার দিতে পারি, পঞ্চায়েতের সময়ে দু-এক জায়গায় সেটা করে দেখিয়েছি। যদি মারামারি করতে চান, তাহলে হাত থাকতে মুখে কেন?’’

নোটবাতিলের পরে দিল্লিতে তৃণমূলনেত্রীর বিক্ষোভ সমাবেশ নিয়ে দিলীপ বলেছিলেন, ‘‘দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রের হাতে রয়েছে। আমরা ইচ্ছা করলেই তাঁকে চুলের মুঠি ধরে সরিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। তাই আমরা সেখানে কোনও বিরোধিতা করিনি।’’

গত কয়েক বছরে রাজ্য রাজনীতিতে যে হারে ‘কু-কথা’ বিনিময় হয়েছে তার তুলনায় এই কয়েকটি উদাহরণ সংখ্যার বিচারে একেবারেই নগন্য। উত্তরপ্রদেশে কমিশনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এবং তাতে সুপ্রিম কোর্টের সমর্থন হয়তো বঙ্গের নেতাদেরও সতর্ক করবে বলেই মনে করেছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। তাঁদের প্রশ্ন, নির্বাচনী বিধি ভঙ্গের ভয়ে বড় নেতারা হয়তো কিছুটা হলেও লাগাম টানবেন মুখে, কিন্তু সারাটা বছর কী হবে?

ওই মহলের বক্তব্য, সারা বছর তো আর নির্বাচন কমিশন থাকে না। রাজনৈতিক নেতারা নিজেরাই নিজেদের মুখের রাশ না টানলে রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবেশ যে আরও কলঙ্কিত হবে। আর ‘কু-কথা’-র জবাবে ‘কু-কথা’ কালচার যদি চলতেই থাকে, চলতেই থাকে, তবে, এমন দিন দূরে নয় যখন, রাজনীতেতে ‘কু’ভাষণটাই সুভাষিত (হিতকথা) হয়ে উঠবে।

আরও পড়ুন

এতদিনে জেগে উঠেছে নির্বাচন কমিশন, মায়ার আর্জি খারিজ করে বলল সুপ্রিম কোর্ট

Shares

Comments are closed.