বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৯

সুন্দরবনে সাড়ে তিনশ বাঘ কমেছে পনেরো বছরে, লাফিয়ে বেড়েছে মধ্যপ্রদেশ-কর্নাটকে

চৈতালী চক্রবর্তী

ভারতে বাঘের সংখ্যা কত? বাঘ সুমারির হিসেব বলবে ২০১৪ সালে যেখানে দেশ জুড়ে মোট বাঘের সংখ্যা ছিল ২,২২৬টি, সেখানে ২০১৮ সালে পৌঁছে সংখ্যাটা বেড়েছে বইকি। নয় নয় করেও দেশে এখন বাঘের সংখ্যা ২,৬০৩ থেকে ৩,৩৪৬-র মধ্যে। সংখ্যাটা শুধু পূর্ণবয়স্কের হিসেবে নয়, বাঘ-বাঘিনী-শাবক মিলিয়েই। কিন্তু বাংলায় বাঘ বেড়েছে ক’টি? এই প্রশ্ন সামনে আসলেই কিঞ্চিত মাথা চুলকাবেন জাতীয় বাঘ সংরক্ষণ কেন্দ্রের হর্তাকর্তারা। উত্তরবঙ্গ যদি বাদই দিই, তাহলে ডোরাকাটা দক্ষিণ রায়দের জন্য বিখ্যাত আমাদের সুন্দরবনেই বাঘ বেড়েছে সাকুল্যে ১২টি। ছিল ৭৬, হয়েছে ৮৮। অন্যদিকে, কালিম্পঙের পর্বত্য এলাকায় নেওড়া ভ্যালিতে গত বছর ৩টি বাঘ দেখা গেছে দাবি করা হলেও, বর্তমানে সেখানে ক’টি বাঘ রয়েছে সেই সংখ্যা স্পষ্ট নয়।

আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস উপলক্ষে দেশজুড়ে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে হই হই রব। ‘গ্লোবাল টাইগার রিকভারি’ প্ল্যান মাফিক বাঘ-সংরক্ষণ ও গণনায় পিছিয়ে পড়া ভারত এখন বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে গত চার-পাঁচ বছরে দেশে বাঘ বেড়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী খোদ বলেছেন, ২০২২ সালের মধ্যে দেশে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, সেই পথে অনেকটাই অগ্রসর হওয়া গেছে। বলিউড সিনেমার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন ‘এক থা টাইগার’ থেকে এখন ‘টাইগার জিন্দা হ্যায়।’ অর্থাৎ দেশবাসীর কাছে এটা সুখবর বলাই বাহুল্য।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাঘের গণনা কতটা নির্ভুল ভাবে হয় এবং বাঘেদের নিরাপত্তা ঠিক কতটা?

ন্যাশনাল টাইগার কনজ়ারভেশন অথরিটি (এনটিসিএ) বা জাতীয় বাঘ সংরক্ষণ কেন্দ্রের গণনা বলছে, ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে মোট ৫৬০টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে ৪০৮টি মৃত্যুকে রহস্যজনক আখ্যা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় বাঘ সংরক্ষণ কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞদের মতে অন্তত ৯৮টি মৃত্যু ধরা যেতে পারে চোরাশিকারের জন্য। তা ছাড়াও সংক্রামিত রোগ, এলাকা দখলের লড়াই, জঙ্গল লাগোয়া গ্রামগুলিতে বাঘ পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা তো রয়েছেই। ২০১৭ সালেই মধ্যপ্রদেশে ২৮টি বাঘের মৃত্যু হয়েছিল, মহারাষ্ট্রে ২১টি, অসমে ১৬টি।

২০১৮ সালে ১৩টি চোরাশিকারের ঘটনা ঘটলেও সন্দেহজনক মৃত্যুর সংখ্যা ৫১। তার মধ্যেই লালগড়ে একটি বাঘকে নৃশংস ভাবে বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল। আর দিন কয়েক আগেই উত্তরপ্রদেশের পিলিভিট জেলায় একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনীকে পিটিয়ে মারে গ্রামবাসীরা। শুধু তাই নয়, সেই ঘটনা তারা নিজেরাই ভিডিয়ো করেছিল। এনটিসিএ-র হিসেব বলছে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই মৃত্যুমিছিল ছুঁয়েছে ৫১। যার একটা সিংহভাগ কারণ চোরাশিকার ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু। তা ছাড়া কোর এলাকায় শিকারের অভাবে অনাহারে মৃত্যুর ঘটনাও কম নয়।

উত্তরপ্রদেশের পিলভিটে পিটিয়ে মারা হচ্ছে বাঘিনীকে

চমকে দেওয়ার মতো তথ্য বলছে, পশ্চিমবঙ্গের বক্সা, মিজোরামের ডাম্পা এবং ঝড়খণ্ডের পালামৌ প্রায় বাঘ শূন্য।

আরও পড়ুন: এক বছর চার মাসের মাথায় লালগড়ের বাঘ মৃত্যুর তদন্তে কেন্দ্রীয় দল


সুন্দরবনে কেমন আছে হলদে-কালো ডোরাকাটারা
?

বাংলায় টাইগার রিজার্ভ বলতে উত্তরের বক্সা এবং দক্ষিণের সুন্দরবন। বক্সায় ক’টা বাঘ টিকে রয়েছে বা আদৌ আছে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ম্যানগ্রোভের সুন্দরবনের হালও বেহাল। ‘বেঙ্গল টাইগার কনজ়ারভেশন অ্যাকটিভিটি প্রজেক্ট’ যে সমীক্ষা সামনে এনেছে সেটা দেখে বন বিভাগের কর্তাদের মুখ বেজার করা ছাড়া উপায় নেই। ২০০৪ সালে সুন্দরবনে বাঘ ছিল নয় নয় করেও ৪৪০টি। তার আগে ১৯৮২ সালে ৪৫৩টি।

কালিম্পঙের পার্বত্য এলাকায় প্রায় ১৬০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত নেওড়া ভ্য়ালি জাতীয় উদ্যানে বাঘের সংখ্যা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সেখানকার ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার নিশা গোস্বামী গত বছর জানিয়েছিলেন, এই জাতীয় উদ্যানে তিনটি পূর্ণবয়স্ক রয়্যাল বেঙ্গল চিহ্নিত করা গেছে। ভুটান ও ভারতের সীমান্তবর্তী নেওড়া ভ্যালির জঙ্গল খুবই ঘন। দিনের বেলাতেই সেখানে সূর্যের আলো ঠিকমতো প্রবেশ করে না। এই দুর্ভেদ্য জঙ্গলে পায়ের ছাপ দেখে গণনা করাটা দুঃসাধ্য। বর্তমানে এই এলাকায় নানা রকম অসুবিধা, আন্দোলন চলার কারণে সঠিক ভাবে বাঘের গুনতি করা যায়নি।

ভেজা মাটিতে পায়ের ছাপ (পাগ মার্ক), মল, শিকার সুলভতা ইত্যাদির নিরিখে এমনটাই জানানো হয়েছিল। বাংলাদেশ থেকেও দক্ষিণ রায়েরা সুন্দরবনে বেড়াতে চলে আসত। দুর্ভেদ্য ম্যানগ্রোভের বনে বাঘের মাথা গুনতে আগে পায়ের ছাপ ও মলের বিশ্লেষণ—এই দুই সাবেক পদ্ধতির উপরই ভরসা রাখত বনদফতর। তা ছাড়া গায়ের ডোরা দাগ বা ‘স্ট্রাইপ মার্ক’-এর পার্থক্য বিশ্লেষণ করেও বাঘ সুমারি হত সুন্দরবনে। এখন অবশ্য এই পদ্ধতি অনেক উন্নত। ক্যামেরা ট্র্যাকিং-এর মাধ্যমে বাঘ গণনা অনেক সহজ।

রাজ্যের মুখ্য বনপাল (বন্যপ্রাণ) রবিকান্ত সিনহার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি বলেন, “৭৬ থেকে সংখ্যাটা ৮৮ তে এসে দাঁড়িয়েছে। বাঘের সংখ্যা বাড়ছে এটা মানতেই হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আগে শুধুমাত্র পায়ের ছাপ (পাগ মার্ক) দেখে বাঘের গুনতি হতো। পরে ন্যাশনাল টাইগার কনজ়ারভেশন অথরিটি এই পদ্ধতিতে বদল আনে। এখন ক্যামেরা ট্যাকিংয়ে বাঘের ছবি তুলে সেগুলো সফটওয়্যারে ফেলে গোনার কাজ হয়। সুন্দরবন শুধু নয়, সারা ভারতেই এই পদ্ধতি এখন চলছে।”

২০১৫ সালের হিসেব বলছে সুন্দরবনে পূর্ণবয়স্ক রয়্যাল বেঙ্গল বেঁচে রয়েছে ১০৬টি। শিকারের অভাবে বাংলাদেশ থেকেও বাঘেদের অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়েছে। ম্যানগ্রোভ বনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে শুরু করে খুলনা, শারাঙ্খোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ এখন বলতে গেলে প্রায় বাঘ শূন্য। বাঘেদের পছন্দের ৪০২টি এলাকায় আটশোরও বেশি ক্যামেরা লাগিয়ে প্রতি ৫-১০ সেকেন্ড অন্তর ফটাফট ছবি তুলেও ৮০টির বেশি বাঘ দেখা যায়নি সুন্দরবনে।

যদিও এনটিসিএ-র তথ্যে দাবি করা হয়েছিল, সুন্দরবনে বাঘ বেড়েছে ১২টি। তবে অনেকেরই প্রশ্ন, বাঘ বাড়লেও নিরাপত্তা বেড়েছে কি? তা ছাড়া সব বাঘই যে ক্যামেরার সামনে আসবে সেটা নাও হতে পারে।  চোরাশিকারিদের নজর এড়িয়ে এই অতিরিক্ত ১২টি কতদিন টিকে থাকে সেটাও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সুন্দরবন এলাকা


বাংলাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মধ্যপ্রদেশে ৫২৬, কর্নাটকে ৫২৪

বাঘের সংখ্যাই শুধু বাড়েনি, বেড়েছে তাদের বিচরণ ক্ষেত্রও, অন্তত জাতীয় বাঘ সংরক্ষণ কেন্দ্রের দাবি এমনটাই। ১৯৭৩ সালে শুরু হওয়া ‘দ্য প্রজেক্ট টাইগার’ প্রকল্পে বাঘেদের চলাফেরার এলাকা ১৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ৭২ হাজার বর্গ কিলোমিটার। বাঘেদের বসতি এলাকাকে মোটামুটি পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়— শিবালিক-গাঙ্গেয় সমতল, মধ্য ভারত ও পূর্ব ঘাট, পশ্চিমঘাট, উত্তর-পূর্ব পার্বত্য এলাকা, ব্রহ্মপুত্রের বন্যা কবলিত এলাকা ও সুন্দরবন। এর ভিতরে মধ্য ভারতে বাঘ বেড়েছে অনেকটাই।

ন্যাশনাল টাইগার কনজ়ারভেশন অথরিটি (এনটিসিএ)এবং ডব্লুআইআই (ওয়াইল্ড লাইফ ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়া)-র বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাঘ সুমারির পদ্ধতিও এখন অনেক বেশি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত। কাজেই বাঘের সংখ্যা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠছে সেটা সত্যি নয়।

প্রথমত, এখন ইনফ্রারেড রশ্মিচালিত স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরার মাধ্যমে চলে নজরদারি। ডিজিটাল ডেটা ফরম্যাট (M-STrIPES) মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে তথ্য চলে আসে বন বিভাগের কাছে।

ক্যামেরা কার রোবটে কৌতুহলী চোখ

দ্বিতীয়ত, ক্যামেরার মাধ্যমে বাঘেদের ফটো তোলার পদ্ধতি চলে CaTRAT ক্যামেরা ট্র্যাপ ডেটা রিপোসিটরি অ্যান্ড অ্যানালিসিস টুলের মাধ্যমে। তা ছাড়া পায়ের ছাপ দেখেও ফিঙ্গারপ্রিন্ট অ্যানালিসিস করে প্রোগ্রাম এক্সট্র্যাক্ট-কমপেয়ার।

তৃতীয়ত, জেনেটিক স্যাম্পলিংও একটা আধুনিক পদ্ধতি। বাঘের মল, গায়ের লোম থেকে জিনোমিক ডিএনএ এক্সট্র্যাক্ট করে সাইটোক্রোম-বি মার্কারের মাধ্যমে তার গবেষণা চলে।

চতুর্থত, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের ইঞ্জিনিয়ারদের বানানো ক্যামেরা-কার রোবট ইতিমধ্যেই ভারতের হাতে চলে এসেছে। রিমোট চালিত এই চার চাকার যানের হাই পাওয়ারের লেন্সের ক্যামেরা খুব কাছ থেকে বাঘের ছবি তুলতে পারে।

আরও পড়ুন:

বাঘের সংখ্যা গুনবে-ছবি তুলবে ক্যামেরা কার রোবট, ভারতে পাঠালেন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের ইঞ্জিনিয়াররা

Comments are closed.