ডাল লেক ঢেকেছে পানায়, আলো জ্বলে না হাউসবোটে, নির্জনতায় ভাসে শুধু আজানের সুর

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    কাশ্মীর থেকে তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

    দিনের আলো নিভে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ঝলমলিয়ে তারা জ্বলে ওঠে তারার মতো। আকাশে নয়, জলে। কাঠের খাঁজকাটা কারুকার্য দিয়ে উপচে আসা আলোর প্রতিচ্ছবি সেই জলের বুকে ভেঙে ভেঙে যায় আলগা স্রোতে। ঠিক সেই সময়েই হয়তো ভেসে আসে বিকেলের উদাত্ত আজান। কোনও ধর্মের উপর বিশ্বাস থাক বা না থাক, এ সমারোহ মন ছুঁয়ে যাবেই পর্যটকদের।

    না, এখন আর যাবেই কিনা নিশ্চিত করতে পারছেন না কেউ। কারণ বহুদিন এই অলৌকিক অনুভূতির সাক্ষী হয়নি কাশ্মীরের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র ডাল লেক। অপূর্ব কাঠের কাজ করা লক্ষাধিক টাকার হাউসবোটগুলো শূন্য পড়ে রয়েছে প্রায় তিন মাস। সন্ধে হলে আলো জ্বলে না হাউসবোটের ঝুলবারান্দায়। লেক জুড়ে প্রজাপতির মতো ছুটে বেড়ানো রংচঙে শিকারারা যেন শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে ঘাটে ঘাটে। কয়েক জন ব্যবসায়ী তবু ম্লান মুখে ঘুরে বেড়ান কেশর আর শালের পসরা নিয়ে। আজান শোনা যায় আগের মতোই। তবে অন্ধকার, খাঁ খাঁ, ডাল লেকের শীতল কালো জলে তার প্রতিধ্বনি যেন প্রেতপুরীর হাহাকার।

    ঘটনাচক্রে, ঠিক এক বছর আগেই অগাস্ট মাসে শ্রীনগরের এই ডাল লেকে এসে থেকেছিলাম দিন কয়েক। গমগমে বিকেলগুলোর সাক্ষী ছিলাম। তাই এ বছর যেন ফারাকটা আরও বেশি করে চোখে পড়ছে। সবই আছে। শিকারা, হাউসবোট, আলো, জল– সব। নেই শুধু মানুষ। নেই অতিথির ভিড়। আর তাতেই যেন বেশি করে প্রমাণ হচ্ছে, উপত্যকায় পর্যটনের গুরুত্ব ঠিক কতটা!

    শ্রীনগরের মোট আয়তন ২৯৪ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে ২২ বর্গকিলোমিটার জুড়ে ডাল লেক। শুধু এই লেককে কেন্দ্র করে জীবনধারণ করেন কয়েক হাজার পরিবার। ডাল লেকের বুকে ভাসছে অন্তত দেড় হাজার হাউসবোট। এক একটি হাউসবোট বানানোর খরচ কয়েক লক্ষ টাকা। বংশপরম্পরায় সেগুলির দেখভাল করছেন ডাললেকবাসী পরিবারগুলি। শুধু বাসিন্দারাই নয়, স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও জমজমাট দোকান লাগান ডাল লেকের ভাসমান বাজারে। রাত দশটা পর্যন্ত সেখানে দরদাম করে কাঠের শো-পিস থেকে শুরু করে পশমিনা শাল কেনেন মানুষজন। সে বাজারও স্তব্ধ এখন।

    একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, তার জেরে অবরোধ, তার জেরে অশান্তি– এ সব মিলিয়ে যেন রাতারাতি ম্রিয়মাণ হয়ে গিয়েছে উপত্যকার এই জল-সাম্রাজ্য। সবুজ পানায় ভরে রয়েছে চার পাশ। শিকারার মাঝি আশিক ভাইকে জিজ্ঞেস করি, আদরের এই ডাল লেককে পরিষ্কার করবেন না? আশিক জানালেন, অন্য বার সকলে মিলে পয়সা দিয়ে মেশিন ভাড়া করে এনে পরিষ্কার করা হয় এই পানা। কিন্তু অন্য বার যেখানে দিনে ৮০০-১০০০ করে রোজগার করতেন এক এক জন মাঝি, এখন সেটা গত তিন মাসে এক হাজার ছুঁয়েছে কিনা সন্দেহ। তাই যন্ত্র আসেনি। অপেক্ষা করা হচ্ছে, শীতের। বরফ পড়লেই আপনিই নষ্ট হয়ে যাবে এই পানার ঝাঁক। তার আগে করেই বা কি হবে, কে দেখবে ডাল লেকের সৌন্দর্য?

    পানকৌড়ি আর হাঁসের দল অবশ্য এত খবর রাখে না। লেকের জলে লুকোচুরি খেলে দিব্যি দিন কাটে তাদের, আগেও যেমন কাটত। কেবল তাদের দিকে ক্যামেরার টেলিলেন্স তাক করে রেখে শাটার টেপার মানুষগুলো কমে গেছে রাতারাতি।

    আখরোট কাঠ দিয়ে ঘর সাজানোর নানা রকম জিনিস বানানোর ব্যবসা রয়েছে জামাল ইউসুফের। ডাল লেকের উপরেই ছোট্ট দোকান। মূল দরজা খোলেননি আজ আড়াই মাসের ওপর। পেছন দিয়ে গোডাউনে ঢুকে দেখলাম, ধুলো জমেছে অপরূপ কারুকার্যের খাঁজে খাঁজে। বহু দিন কেউ মুগ্ধতার আঙুল রাখেনি তাদের গায়ে।

    জামাল বলছিলেন, “অনেক হয়ে গেছে। যাই হয়ে যাক না কেন, এবার স্বাভাবিক হোক পরিস্থিতি। কাশ্মীর কোনও দিন শান্ত নয়। লড়াই, আক্রমণ, অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়েই চিরকাল থেকেছে কাশ্মীর। কিন্তু সে সবের মধ্যেও নিজের গুণে মানুষকে টেনেছে এ রাজ্য। এই তীব্র বিচ্ছিন্নতা আর সহ্য হচ্ছে না। এত মানুষের পেটে টান পড়েছে, এবার তো ঠিক হোক পরিস্থিতি!”

    সরকার বলছে, পর্যটকদের উপরে কোনও বিধিনিষেধ নেই আর। বিধিনিষেধ নেই যানবাহন চলাচলেও। চালু হয়ে গিয়েছে সমস্ত পোস্টপেড মোবাইল কানেকশন, আর কয়েক দিনের মধ্যে চালু হয়ে যাবে ইন্টারনেট পরিষেবাও। পরিস্থিতি ‘স্বাভাবিক’ বলেই দাবি করছে সরকার। কিন্তু বাস্তবে সে স্বাভাবিকতার মুখ চেয়ে বসে আছেন হাজার হাজার কাশ্মীরবাসী। যে কাশ্মীরে বারবার অভিযোগ উঠেছে বিচ্ছিন্নতার, যে কাশ্মীরে বারবার থাবা বসিয়েছে সন্ত্রাসবাদ, যে কাশ্মীর বারবার মুখর হয়েছে ‘আজাদি’র দাবিতে, সেই কাশ্মীরের খেটে খাওয়া মানুষজন আজ গলা তুলছেন স্বাভাবিকতার দাবিতে।

    পেশায় শিক্ষক, মহম্মদ কায়ুম কুপওয়ারার বাসিন্দা। সেই কুপওয়ারা, যে কুপওয়ারার নাম প্রায়ই সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসে ‘সেনা-জঙ্গি সংঘর্ষ’-এর কারণে। মাস্টারমশাই বলছিলেন, “সব কিছুর পরে রুটিরুজি সত্য। সব কিছুর পরে আজও কাশ্মীরের একটা বড় অংশের মানুষ চান গুলির শব্দ ছাড়া একটা গোটা দিন। বাইরে থেকে যে অশান্তি দেখা যায়, তার জন্য কিন্তু সাধারণ মানুষ মোটেও দায়ী নয়। যারা দায়ী, তারা হয়তো কোনও দিন কাশ্মীরকে ভালই বাসেননি।”

    আরও পড়ুন:

    রাষ্ট্র শব্দের অর্থ খুঁজছে যোগাযোগ হারানো কাশ্মীর

    পড়ুন, দ্য ওয়ালের পুজোসংখ্যার বিশেষ লেখা…

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More