সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৩

নর্দমার অন্ধকূপে আর মৃত্যু নয়! এ বার পাঁক তুলবে রোবট, আবিষ্কার আইআইটি মাদ্রাজের ছাত্রদের

দ্য ওয়াল ব্যুরো: খালি গায়ে ছেঁড়া হাফ প্যান্ট, কাঁধে একটা গামছা। সামান্য অন্তর্বাসটুকু গলিয়ে ভূগর্ভস্থ নিকাশি নালার অন্ধকারে নামাই অভ্যাস তাঁদের। মাস্ক, দস্তানা, গামবুট— সে সব তো বিলাসিতা। কখনও নিকাশি নালার পাঁকে কোমর অবধি ডুবে, কখনও সেপ্টিক ট্যাঙ্কে হাত ডুবিয়ে, দিনভর চলে শহরবাসীর বর্জ্য সাফাইয়ের কাজ। রোদ, ঝড়-বৃষ্টি, রোগ-দুর্গন্ধ-ঘেন্না কাজে ফাঁকি নেই এতটুকু। সে ম্যানহোলের পচা জলে জুবে মৃত্যু হলেও না, বা নিকাশির ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা ধারালো কোনও জিনিসে হাত-পা কেটে বাদ গেলেও নয়। তারা সাফাইকর্মী। শহুরে আবর্জনা ধুয়ে-মুছে সাফ করাই তাদের পেশা, কর্তব্যও বটে! এদের জীবনের মূল্য পুরসভার খাতার পাতাতেই আটকা।

নর্দমার পূতিগন্ধেই যাঁদের দিন শুরু হয় সেই মানুষগুলোর জীবনের মূল্য দিতে এগিয়ে এলেন মাদ্রাজ আইআইটির ‘সেন্টার ফর নন ডেসট্রাক্টিভ ইভ্যালুয়েশন’ বিভাগের গবেষক, অধ্যাপক ডঃ প্রভু রাজাগোপাল এবং তাঁর ছাত্রেরা। অধ্যাপকের কথায়, নিকাশি নালা, খোলা ম্যানহোল বা সেপ্টিক ট্যাঙ্কে মানুষ নামিয়ে পরিষ্কার করানোর কাজ সম্পূর্ণ বেআইনি। সংবিধানে এর বিরুদ্ধে শক্তপোক্ত আইন আছে। অথচ সেই আইন ভাঙার কাজ চলছে প্রতিনিয়ত। তারই খেসারত দিতে হচ্ছে অভাবী মানুষগুলোকে। নিজেদের জীবন দিয়ে। অধ্যাপক রাজাগোপালের কথায়, ‘‘নিকাশিতে নেমে নোংরা ঘাঁটার দিন শেষ। আমরা তৈরি করেছি এমন এক যন্ত্র, যা দিয়ে বাইরে থেকেই অনায়াসে নালা থেকে সেপ্টিক ট্যাঙ্ক সব কিছুই পরিষ্কার করতে পারবেন সাফাইকর্মীরা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতে হবে না।’’ এই যন্ত্র এক ধরনের রোবট, যার নাম ‘সেপয়ে সেপ্টিক ট্যাঙ্ক রোবট।’ এর দুরন্ত গতির প্রপেলার ও আধুনিক কলকব্জা নিমেষে সাফ করে দিতে পারে নিকাশির বর্জ্য।

প্রশ্ন হচ্ছে নিকাশি পরিষ্কারের যন্ত্র কি নেই? অধ্যাপক রাজাগোপাল জানিয়েছেন, যে কোনও মেট্রো শহরেই নিকাশি সাফ করার জন্য সাফাইকর্মীদের যন্ত্র দেওয়ার কথা। তবে সেটা কোনও কালেই হয় না। সেই যন্ত্রও উন্নতমানের নয়। ফলে নিকাশি নালা, সেপ্টিক ট্যাঙ্ক হাত দিয়ে সাফাই করতে হয় মানুষগুলোকে।  অথচ ছ’বছর আগে সংসদে পাশ হয়েছে ‘প্রহিবিশন অফ এমপ্লয়মেন্ট অ্যাজ ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জারস অ্যান্ড দেয়ার রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাক্ট ২০১৩’। এই আইন মাফিক, এই পেশার সঙ্গে নিযুক্ত সাফাইকর্মীদের বিভিন্ন প্রকল্পে পুনর্বাসন দেওয়ার কথা। কাউকে এ ধরনের কাজ করানো হচ্ছে কি না, রাজ্য জেলা স্তরে তার নজরদারি থাকার কথা। কিন্তু আইন আর প্রশাসনের নিয়ম ভেঙেই, গোটা দেশে প্রায় ৮ লক্ষ সাফাইকর্মী ফি দিন নোংরা নর্দমা সাফ করে যাচ্ছেন। জটিল রোগেরও শিকার হচ্ছেন।

কী ভাবে কাজ করবে এই রোবট?

অধ্যাপকের কথায়, শহরে সাধারণত দু’ধরনের নিকাশির লাইন থাকে। একটা, ব্যক্তিগত বাড়ি বা আবাসন বা শৌচালয়ের নিকাশি নালা যেটা বৃহত্তর নিকাশি ট্যাঙ্কের সঙ্গে মেলে। অন্যটা, সেপ্টিক ট্যাঙ্ক। যে কোনও ধরনের নিকাশির জন্যই কাজ করতে পারে তাঁদের আবিষ্কার করা এই রোবট। ৫০ কিলোগ্রাম ওজনের ‘সেপয়ে সেপ্টিক ট্যাঙ্ক রোবট’-এ ফিট করা আছে ক্যামেরা। নিকাশির নালার ভিতর অবধি পরিষ্কার ছবি তুলতে পারবে সে। ফলে বর্জ্য ঠিক কোথায় জমে আছে, কতটা গভীরে যন্ত্র ঢুকিয়ে সাফাই কাজ শুরু করতে হবে সেটা বোঝা যাবে অনায়াসেই। এর পরে আসছে, এর প্রপেলার ও রেগুলেটর। দুরন্ত গতির প্রপেলারের সঙ্গে ফিট করা হাই ভেলোসিটি-কাটার। পাঁক বা কাদা মাটি সরিয়ে ভিতর অবধি নিয়ে যেতে পারবে যন্ত্রকে। রেগুলেটর ঘুরিয়ে শুরু হবে সাকশন।

অধ্যাপক ডঃ প্রভু রাজাগোপালের ছাত্রেরা। সাফাই-রোবটের কারিগর।

দু’ভাবে কাজ করতে পারবে এই রোবট। প্রথমত, এর এক্সটারনাল পাওয়ার বাইরে আবর্জনা সাফ করবে। দ্বিতীয়ত, ইন্টারনাল পাওয়ার ভিতর অবধি ঢুকে পাম্পিং-এর মাধ্যমে বর্জ্য ছেঁকে আনবে বাইরে। সেপ্টিক ট্যাঙ্কেও কাজ করবে একই পদ্ধতিতে। এই রোবটের দাম পড়বে ৫-১০ লক্ষ টাকা।

ডঃ প্রভু রাজাগোপালের কথায়, ‘‘এই রোবটের সঙ্গে যুক্ত থাকবে ছ’টি প্রপেলার। এর রোটারি প্রপেলার কাজ করবে এয়ারক্রাফ্টের ব্লেডের মতো। সেপ্টিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কারের সময় এই প্রক্রিয়া বিশেষ করে কাজে লাগবে। ভিতরের বর্জ্য কেটে গলিয়ে বাইরে নিয়ে আসবে এর ভ্যাকুয়াম পাম্প।’’ এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আইআইটি মাদ্রাজের এনভায়রনমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ইন্দুমাথি নাম্বি বলেছেন, এই রোবটের কাজ প্রশংসা পেয়েছে নানা মহলে। তবে এটি এখনও পরীক্ষামূলক স্তরে রয়েছে। অগস্টের মধ্যে অনুমতি পত্র পেয়ে গেলে সেটা পৌঁছে দেওয়া হবে পুরসভাগুলির কাছে।

সেপয়ে সেপ্টিক ট্যাঙ্ক রোবট

সাফাইকর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট জাতীয় কমিশন ‘ন্যাশনাল কমিশন ফর সাফাই কর্মচারীজ’ (NCSK)এর আধিকারিক দীপ্তি সুকুমারের কথায়, ‘‘আইআইটির গবেষকদের এই কাজের জবাব নেই। স্বচ্ছ ভারত অভিযানের আওতায় প্রত্যন্ত এলাকায় অনেক শৌচাগার তৈরি হয়েছে, যেগুলির নিকাশি নালা সরু রাস্তায় এসে মিশেছে। সেখানে বড় পাম্প ঢুকিয়ে পরিষ্কার করা যায় না। এই রোবট সে ক্ষেত্রে খুবই কাজে আসবে।’’

পাঁক ঘেঁটেই জীবন কাটে যাঁদের….

সমীক্ষা বলছে, ১৯৯৩ সাল থেকে দেশে ৬২০ জনেরও বেশি সাফাইকর্মীর প্রাণ গেছে ম্যানহোল বা নর্দমা পরিষ্কার করতে গিয়ে। গত তিন বছরে গভীর অন্ধকার নালায় নেমে বিষাক্ত গ্যাসে দমবন্ধ হয়ে প্রাণ গেছে অন্তত ৮৮ জনের। যে কোনও শহরের ওয়ার্ডগুলিতে নিকাশি নালার পরিস্থিতি খুবই খারাপ। অল্প বৃষ্টিতেই নালা উপচে নোংরা থইথই করে শহরের রাস্তায়। তার উপর প্লাস্টিক বর্জ্য তো রয়েছেই।


শহর হোক, বা আধা শহর, মফস্বল— ফি দিনের চেনা ছবি এটাই।

হাতে করে মল সাফাই নিষিদ্ধ করতে দু’বার আইন পাশ হয়েছে। একবার ১৯৯৩-এ, আর একবার ২০১৩-য়। প্রধানমন্ত্রীর গদিতে বসার পর স্বচ্ছ ভারত অভিযানে শৌচালয় তৈরির অভিযান শুরু করেন নরেন্দ্র মোদী। সাফাইকর্মীদের বক্তব্য, প্রায় ৫ কোটি শৌচালয় তৈরি হয়েছে এই প্রকল্পে। যার মানে হল ৫ কোটি সেপ্টিক ট্যাঙ্ক। কারা এ সব সাফ করবে? সরকারের একটি টাস্ক ফোর্সের সমীক্ষা, দেশে ৫৩ হাজার সাফাইকর্মী রয়েছেন, যাঁদের হাতে করে মল পরিষ্কার করতে হয়।

সাফাইকর্মীদের অনেকেই বলেন, ম্যানহোলের ঢাকনা ১০ মিনিট খুলে রাখার পরে নীচে নামতে হয়। কারণ প্রথম বিষাক্ত গ্যাসটা আচমকা নাকে গেলে দমবন্ধ হয়ে যায়। অথচ দিনের বেশিরভাগ সময়টা যায় এই নোংরা ঘেঁটেই, সেখানেই চা-পানি-নাস্তা সব। বেশিরভাগ সাফাইকর্মীই নোংরা ঘাঁটার অভিজ্ঞতা ভোলার জন্য নেশা করেন। তাঁরা অনেকেই বলেন, ‘‘গন্ধ থেকে বাঁচতে গুটখা মুখে পুরে দিই। এই যা কাজ, নেশা না করলে ঘুম আসবে না।’’ আর নর্দমা সাফ করতে করতে যদি জটিল রোগ বাসা বাঁধে শরীরে? সাফাইকর্মীদের কথায়, ‘‘সংসারের খরচ, ছেলেমেয়ের পড়াশোনার কথা ভেবে ডাক্তারের কাছে কেউ যেতে চায় না। ওই পচা জলই যে আমাদের অ্যান্টিসেপ্টিক!’’

আরও পড়ুন:

ঋতুস্রাবের রক্ত নিংড়ে বার করবে এই ডিভাইস, স্যানিটারি প্যাড আবার ব্যবহার করা যাবে, পথ দেখালেন আইআইটির দুই ছাত্রী

Comments are closed.