সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৩

ওরা চাষের জমির সাংবাদিক, ওরাই রোদে পোড়া চাষিদের নিয়ে সিনেমা বানায়

চৈতালী চক্রবর্তী

গোধূলির মায়াবী আলো তখন ছোট্ট গ্রামটাকে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে তুলেছে। আপ্পাপুর পেন্টা। নাল্লামালা জঙ্গল লাগোয়া অন্ধ্রপ্রদেশের এই ছোট্ট আদিবাসী গ্রাম তখন মেতে উঠেছে ফসল তোলার উৎসবে। বর্ষার আগমনে নতুন বীজ বপনের তোড়জোড়ও শুরু হয়েছে। সন্ধের অন্ধকার ঝপ করে নেমে আসে দিগন্ত বিস্তৃত খোলা প্রান্তরে। তাই গোধূলি আর বিকেলের সন্ধিক্ষণেই মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠে গান গেয়ে চাষের জমিকে নববধূর মতো বরণ করে নিচ্ছেন চেঞ্চু আদিবাসীরা।

ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে অনেকক্ষণ ধরেই চাষি বউদের নানা রকম পোজ দিতে বলছিলেন লক্ষ্মাম্মা। বীজ বপন থেকে ফসল তোলা, আদিবাসী গানের গোটাটাই নিজের ভিডিয়ো ক্যামেরায় তুলে রাখছিলেন তিনি। লক্ষাম্মার হাবভাব দেখে সকলকে মৃদু বকুনি দিয়ে ফের লেন্সে চোখ রাখলেন তাঁর দুই সঙ্গিনী মোল্লাম্মা ও চন্দ্রাম্মাও। মরসুমের ফলনের এই নতুন ভিডিয়ো দিয়েই তৈরি হবে ডকুমেন্টারি। যত তাড়াতাড়ি এডিট হবে, ততটাই জলদি পৌঁছে যাবে দক্ষিণের আরও ৭৫টি গ্রামে। তাঁদের মতোই আরও হাজার খানেক মহিলা সেখানে অপেক্ষারত। এই ডকুমেন্টারি দেখিয়েই তো হাতে কলমে পাঠ দেওয়া হবে কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রগুলিতে। চাষি মেয়ে-বউদের পড়াশোনা শেখার বড় ইচ্ছে। মহাজনদের খপ্পরে না পড়ে নিজের জমির কাজ নিজেরাই শিখে নিতে চায়।

ক্যামেরার লেন্সে চোখ লক্ষ্মাম্মা, মোল্লামাদের

হুমনাপুরের লক্ষ্মম্মার বয়স ৫০ ছুঁয়েছে। কাছাকাছি বয়স ইপ্পালাপল্লীর মোল্লাম্মা ও সঙ্গরেড্ডির চন্দ্রাম্মা মনিগরিরও। আদিবাসী দলিত সম্প্রদায়ের এই তিন প্রৌঢ়া আগে দিনমজুরি নিয়ে চাষের কাজ করতেন। এখন পেশায় সাংবাদিক, ফোটোগ্রাফার-ভিডিয়োগ্রাফার থুড়ি ফিল্মমেকারও। ‘কমিউনিটি মিডিয়া ট্রাস্ট’ নামক সংস্থার ২০ জন দলিত মহিলার মধ্যে সামনের সারির তিন মুখ। এই মিডিয়া কাজ করে দক্ষিণের অন্যতম বেসরকারি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র ‘ডেকান ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি’ (DDS)-র হয়ে। এই সংস্থার মহিলা পরিচালিত কৃষি-উন্নয়ন সংগঠন ‘দ্য ওম্যান সঙ্গম’ এর অত্যন্ত পরিচিত মুখ লক্ষ্মাম্মা, মোল্লাম্মা ও চন্দ্রাম্মা

জমির মাঝে ক্যামেরা সেট করে চাষিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন তিন প্রৌঢ়া। ঠিক যেন পাকা ফিল্মমেকার।

তিন দলিত প্রৌঢ়ার অভিনব কাজ দেখে মুগ্ধ প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢড়া। টুইট করে তিনি বলেছেন, “দেশের মেয়েদের জন্য তোমরাই অনুপ্রেরণা। লক্ষ্মাম্মা, মোল্লামা, চন্দ্রাম্মা মনিগারি, তোমাদের সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় রইলাম।”

চাষি বউ এখন লেন্সের অ্যাঙ্গেল ঠিক করে বলেন লাইট! ক্যামেরা! অ্যাকশন!

সিনেমাটোগ্রাফির কায়দা কানুন রপ্ত করতে বেশিদিন লাগেনি। আসলে মনের ইচ্ছাটাই সব, জানিয়েছেন লক্ষ্মাম্মা। আসলে এই চেষ্টাই হাজার খানেক দলিত পরিবারের পেটের ভাত যোগায়। শুরুটা হলো কী ভাবে? লক্ষ্মাম্মার কথায়, “চাষের জমিতে দিনমজুরি করে পেট ভরে না কারওর। বেসরকারি নানা প্রকল্পের খোঁজ চালিয়েছি দীর্ঘদিন ধরেই। ডেকান ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির মহিলা সংগঠন ‘সঙ্ঘম’-এ যোগ দিই আমরা কয়েকজন। জীবন বদলে যায় এর পরেই।’’এই সংগঠনের উদ্যোগেই পড়াশোনা শেখা, চাষের খুঁটিনাটিতে প্রযুক্তিভিত্তিক জ্ঞান। তাঁকে দেখেই বাকি মহিলারা যোগ দেন সংগঠনের কাজে। নাল্লামালা জঙ্গল লাগোয়া পড়ন্ত দলিত গ্রামে শিক্ষা-প্রযুক্তির আলো ছড়িয়ে পড়ে দিনের আলোর মতো।

সালটা ২০০১। লক্ষ্মাম্মা, মোল্লামার মতো কয়েকজন কমিউনিটি মিডিয়া ট্রাস্টের মাধ্যমে যোগাযোগ করে ‘সঙ্ঘম’-এর সঙ্গে। মিলিত ভাবে আর্জি জানান, ভিডিয়ো তুলে তাঁরাই সেগুলি পৌঁছে দেবেন আদিবাসী গ্রামগুলিতে। চাষের কাজ সিনেমার মতো পর্দায় ফুটে উঠলে, অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত চাষিদের বুঝতে সুবিধা হবে।

“আমাদের উদ্দেশ্য এই ছোট ছোট সিনেমা এবং ভিডিয়োর মাধ্যমে বীজ পোঁতা, ফসল তোলার কাজ শেখানো। কীটনাশকের ব্যবহার বোঝানো। দিনভর ঘর-গেরস্থআলির কাজ সেরে চাষি মেয়ে-বউরা এই ভিডিয়ো দেখে দেখেই নিজেদের কৃষিকাজে চোস্ত করে তুলবে,” লক্ষ্মাম্মার কথায় ইউটিউবে, সোশ্যাল মিডিয়াতেও এইসব ভিডিয়ো ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

চাষের জমির থেকেও জলকাদা মাখা, রোদে পোড়া চাষিদের ছবি তুলতে ভালোবাসেন মোল্লামা

কমিউনিটি মিডিয়া ট্রাস্টের ফিল্মমেকার-রিপোর্টার মোল্লামা। চন্দ্রাম্মা যখন মাঠের মাঝে ক্যামেরা বসিয়ে সকলকে নির্দেশ দেন, ফটাফট চাষিদের ছবি লেন্সে বন্দি করে ফেলেন মোল্লাম্মা। কাদা জমিতে শরীর ভাসিয়ে চাষি ভাইরা যখন রোদে পুড়ে বীজ পোঁতেন, তার খুঁটিনাটি লহমায় ফ্রেমবন্দি করে ফেলেন তিনি। “৩০ বছর আগে আমাদের জীবনটাই অন্যরকম ছিল। অক্ষর জ্ঞান ছিল না, এখন আমরা প্রশিক্ষিত ভিডিয়োগ্রাফার। আমাদের তোলা ভিডিয়ো নিয়েই ডেকান ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি তাদের ‘ভিডিয়ো ডায়ারিজ’ তৈরি করেছে। যার মাধ্যমে কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রগুলিতে চাষিদের হাতেকলমে কাজ শেখানো হয়।”

ডেকান ডেভালপমেন্ট সোসাইটির ‘সঙ্ঘম’ গ্রুপের মহিলারা। দলিত চাষি বউ এখন দিব্যি ল্যাপটপে কাজ করতে পারেন।

কমিউনিটি মিডিয়া ট্রাস্টের প্রধান পাস্তাপুরের চিন্না নারসাম্মা। বলেছেন, “আদিবাসী মহিলারাই ভিডিয়ো তোলেন, ডকুমেন্টারি বানান। সেগুলো আমরা ইউটিউবে আপলোড করি। আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী কৃষি-উৎসবও রেকর্ড করা হয় ভিডিয়োতে। অনেক অজানা তথ্য আমরা পৌঁছে দিই দেশবাসীর কাছে।”

এক অন্য লড়াই লড়ছেন ডেকান ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির কর্ণধার পিভি সতীশ

পিভি সতীশ

১৯৮৩ সাল। হায়দরাবাদ থেকে ১৩০ কিলোমিটার দূরে মেডাক জেলায় গুটিকয়েক সদস্য নিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা খোলেন পিভি সতীশ। নাম দেন ডেকান ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি। তেলঙ্গানার অনুন্নত, দলিত সম্প্রদায়ের চাষিদের কৃষি সংক্রান্ত শিক্ষা দেওয়ার জন্যই প্রাথমিক ভাবে খোলা হয় এই সংগঠন। পাশাপাশি, জোয়ার, বাজরা, মিলেট চাষে বিপ্লব আনতে নানারকম গবেষণামূলক কাজও শুরু হয় এই সংগঠনে। যোগ দেন কৃষি বিজ্ঞানী, গবেষক, অধ্যাপক থেকে সমাজসেবীরা। বর্তমানে শিশু শিক্ষা থেকে নারী নির্যাতন রোধের নানা রকম প্রকল্প ও কর্মসূচি রয়েছে এই সংগঠনের।

প্রথমে একটি, দু’টি গ্রামের মোড়লদের রাজি করিয়ে চাষিদের ধরে এনে শুরু হয় ক্লাস। বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় আদিবাসীদের মহিলাদের উপর। কুসংস্কারের ঘেরাটোপে থাকা দলিত গ্রামগুলির মহিলাদের শিক্ষার প্রসার ও প্রচারে এক নতুন লড়াই শুরু করেন পিভি সতীশ। বর্তমানে দক্ষিণের প্রায় ৭৫টি গ্রামের হাজার পাঁচেক মহিলা কাজ করেন এই সংগঠনের হয়ে। প্রাকৃতিক উপাদান বাঁচিয়ে সংরক্ষণমূলক কৃষি গবেষণার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে এই সংগঠন।

বীজ রোপণের উৎসব পথ পান্তালা পান্ডুগা

খাতায়-কলমে গবেষণার পাশাপাশি বাস্তবে তা রূপায়ণ করতে প্রকল্পের জন্য কয়েকশো বিঘে জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে উন্নতমানের বীজ দিয়ে ফসল ফলান চাষিরা। সেই ফসল তোলার পরে সংরক্ষণের জন্য শস্য-ব্যাঙ্কও রয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে কৃষিকাজে যথেচ্ছ রাসায়নিক সার ব্যবহার,কীটনাশক ও হরমোন প্রয়োগ না করেও কীভাবে ফসলের উৎপাদন বাড়ানো যায় তারই শিক্ষা দেয় ডেকান ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি। আর এই সংগঠনের একনিষ্ঠ সৈনিক হলেন এই দলিত চাষিরা।

ভিডিয়ো ডায়ারিজ থেকে গ্রিন স্কুল…

নানা রকম প্রকল্প রয়েছে ডেকান ডেভেলপমেন্টের। লক্ষ্মাম্মা, মোল্লাম্মারা কাজ করেন এই সংগঠনের ‘ভিডিয়ো ডায়ারিজ’ কর্মসূচিতে। তাঁদের কাজ চাষ নয়, বরং কৃষিকাজের ভিডিয়ো তুলে সংগঠনের হাতে পৌঁছে দেওয়া। কমিউনিটি মিডিয়া ট্রাস্টের মাধ্যমে এই ভিডিয়ো আদিবাসী রমণীদের আওয়াজ পৌঁছে দেয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে।

শিশু শিক্ষার জন্যও রয়েছে আলাদা কর্মসূচি। ছোটদের পাঠশালা বা ‘পাচা সালে’। ১০-১৬ বছর বয়সীদের কৃষি ও নানা বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয় এখানে। বর্তমানে এই সংগঠনের নিজস্ব পাঠশালায় ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে। অধিকাংশই শিশু কন্যা।

পড়াশোনার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজের জন্য রয়েছে ২৫টি ‘বালওয়াড়ি।’ কাঠের কাজ থেকে মাটির কাজ শেখে ৭০০ কিশোর-কিশোরী। ওষধি গাছের রোপন ও পরিচর্যা শেখানো হয় এখানে। একটু বড়দের জন্য রয়েছে ডেকান ডেভেলপমেন্টের কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র। গবেষণামূলক পাঠ দেওয়া হয় সেখানে। চলতি বছরে ডেকান ডেভেলপমেন্টকে ‘ইকুয়েটর প্রাইজ ২০১৯’  দিয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘ইউনাইটেড ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (UNDP)’।

Comments are closed.